ইকবাল খন্দকার
প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:৪২ পিএম
অলংকরণ: জয়ন্ত সরকার
অনেক দিন পর লম্বা ছুটি পেয়েছেন তরু কাকা। তাই তিনি সোজা চলে এসেছেন গ্রামে। তাকে পেয়ে পেয়ে আনন্দের সীমা থাকে না মিশুকের। সে কত চেয়েছে তিনি যেন একটু লম্বা সময় নিয়ে গ্রামে আসেন! যাতে তার ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছেটা পূরণ হয়। তরু কাকা এখন শুয়ে আছেন দখিন ঘরের খাটে। আর মিশুক বসে আছে পাশেই। নানা রকম প্রশ্ন করছে ঢাকা শহর নিয়ে। কাকা উত্তর দিতে দিতে একসময় জানতে চান তার পড়াশোনা কেমন চলছে, সে নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছে কি না। মিশুকের মুখ কালো হয়ে যায়। সে নীরব থাকে। তরু কাকা জানতে চান কী হয়েছে। কোনো সমস্যা কি না। মিশুক আরও কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলেÑ আমার স্কুলে যেতে ভালো লাগে না। আপনি তো জানেন, আমাদের বাড়ি থেকে স্কুলটা কত দূর। এত দূরে রোজ রোজ হেঁটে যেতে মন চায়? আব্বুকে আমি অনেকবার বলেছি যেন একটা সাইকেল কিনে দেন। কিন্তু আব্বু আমার কথা শুনছেনই না।
রাতে মিশুকের বাবার ঘরে ঢোকেন তরু কাকা। কথায় কথায় তিনি মিশুকের প্রসঙ্গ তোলেন। বিশেষ করে হেঁটে স্কুলে যেতে তার যে কত কষ্ট হচ্ছে, তা বুঝিয়ে বলেন তাকে। শুনে বাবা হাসেন। বলেন, স্কুলে যেতে ওর কোনো কষ্টই হয় না। কারণ ওর বড়ভাই রোজ ওকে মোটরসাইকেলে করে স্কুলে দিয়ে আসে। ও তোকে এইসব শুনিয়েছে, যেন তুই সাইকেল কিনে দিস। খবরদার, কিনে দিবি না। কারণ সাইকেল পেলে সে সারাদিন ঘুরে বেড়াবে। পড়াশোনার ক্ষতি করবে।
পরদিন মিশুককে একটা সুসংবাদ দেন তরু কাকা। জানান, তাকে তিনি সাইকেল কিনে দেবেন। তবে শর্ত হচ্ছে, শুধু শুধু ঘুরে বেড়ানো যাবে না। পড়াশোনার ক্ষতি করা যাবে না। সুসংবাদটা শুনে খুশিতে তরু কাকাকে জাপটে ধরে মিশুক। আর জানায়, সব শর্তে সে রাজি। এর পরদিন চকচকে একটা সাইকেল কিনে নিয়ে আসেন তরু কাকা, যা দেখে খুশিতে চিৎকার করে ওঠে মিশুক। সে আবারও জাপটে ধরে তরু কাকাকে।
পনেরো দিন পর। ছুটি কাটিয়ে ইতোমধ্যে ঢাকায় ফিরে এসেছেন তরু কাকা। অফিসও করতে শুরু করেছেন। সেদিন নিজের টেবিলে বসে ফাইল সই করছিলেন তিনি। এমন সময় মিশুকের বাবা ফোন করেন। জানান, সে শর্তের কথা ভুলে গেছে। সারাদিন সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। বইয়ের ধারেকাছেও যায় না। তরু কাকা বাবাকে চিন্তা করতে নিষেধ করেন। তারপর চমৎকার একটা বুদ্ধি দেন তাকে। বাবা খুশি হয়ে ফোন রাখেন।
এক সপ্তাহ পর। মিশুক ফোন করে তরু কাকাকে। কেঁদে কেঁদে জানায়, গত পাঁচ দিন ধরে সে সাইকেলের চাবি খুঁজে পাচ্ছে না। তরু কাকা তাকে শর্তের কথা মনে করিয়ে দেন। আর জানান, শর্ত না মানলে এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। মিশুক বলেÑ আমি শর্ত মেনে চলছি তো! সারাদিনই পড়াশোনা করছি। আর আপনি আমাকে ইংরেজির ওপর জোর দিতে বলেছিলেন না? এজন্য ইংরেজিটা বেশি বেশি পড়ছি।
তরু কাকা হাসেন। আর বলেনÑ তুই ইংরেজিটা বেশি বেশি পড়ছিস, তাই না? কেন চালাকি করিস, বল তো? একদম চালাকি করবি না। মিথ্যা বলবি না। সত্য হচ্ছে, তুই যতদিন ধরে সাইকেলের চাবি খুঁজে পাচ্ছিস না, ততদিন ধরে ইংরেজি বইটা ছুঁয়েও দেখছিস না। তার মানে কমপক্ষে পাঁচ দিন ধরে। আরও বেশিও হতে পারে। কী, আমি ঠিক বললাম?
তরু কাকার কথা শুনে থতমত খেয়ে যায় মিশুক। সে ভয়ে ভয়ে জানায়, তিনি যা বলেছেন, ঠিক বলেছেন। তরু কাকা আবার হাসেন। বলেনÑ তুই হয়তো ভাবছিস বিষয়টা আমি জানলাম কীভাবে। শোন, তোর যেমন চালাকি করার অভ্যাস আছে, আমিও কিন্তু কম চালাক না। ওইদিন তোর বাবাকে একটা বুদ্ধি দিয়েছিলাম। বলেছিলাম সাইকেলের চাবিটা যেন তোর ইংরেজি বইয়ের ভেতরে রেখে দেন। তিনি আমার কথামতো কাজ করেছিলেন। তুই যদি এই কয়দিনের মধ্যে ইংরেজি বইটা হাতে নিতি, চাবিটা না পাওয়ার কথা ছিল না।
মিশুক দৌড়ে পড়ার টেবিলের কাছে যায়। দেখে ঠিকই ইংরেজি বইয়ের ভেতরে রাখা আছে চাবিটা। লজ্জায় সে কোনো কথা বলতে পারে না। তরু কাকা গলা ছেড়ে হাসেন। জানতে চান আর কোনোদিন চালাকি করবে কি না। মিশুক ঢোক গেলে। তারপর অপরাধীর মতো মিনমিনে গলায় বলেÑ জি না।