বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে মানসিক চাপ
নুসরাত মুনা
প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:৫৭ পিএম
ঢাকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সারা (ছদ্মনাম) পরীক্ষায় আশানুরূপ রেজাল্ট না করায় মনে করেছিল, জীবন শেষ হয়ে গেছে। বন্ধুদের সবার ক্যারিয়ার প্ল্যান তৈরি, কেউ চাকরির ট্রেনিং নিচ্ছেন, কেউ আবার ইউটিউব-ফেসবুকে ঝলমল করছেন। অথচ তার কাছে প্রতিদিন মনে হয় সে কিছুই পারছেন না। হতাশায় এক দিন নিজের জীবন শেষ করার কথাও মাথায় এসেছিল সারার।
এ ঘটনা শুধু সারার নয়। দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থা প্রায় একই রকম। পড়াশোনার চাপ, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, পারিবারিক প্রত্যাশা আর সামাজিক তুলনা সব মিলিয়ে আজকের তরুণ প্রজন্ম যেন এক অদৃশ্য যুদ্ধে লড়ছে প্রতিদিন। মানসিক হতাশা যেন এক গোপন মহামারির নাম। এ ধরনের গল্পগুলো একক কাহিনী নয়, এগুলো উন্মোচন করছে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশে ছড়িয়ে থাকা এক নীরব, কিন্তু তীব্র মানসিক সংকট। সাম্প্রতিক গবেষণা ও মিডিয়াভিত্তিক তালিকা বলছে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীর মধ্যে বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও আত্মহত্যার ঝুঁকি উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এ সংকট শুধু ব্যক্তির জীবন নয় দেশের মানবসম্পদ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার উওপর গভীর প্রভাব ফেলছে।

কী বলছে গবেষণা
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া অন্তত ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত চাপ ও উদ্বেগে ভোগেন। প্রায় এক-পঞ্চমাংশ শিক্ষার্থী তীব্র ডিপ্রেশনে থাকেন, যাদের চিকিৎসার দরকার।
এই গবেষণার সংখ্যায় আসলে পুরো ছবিটা বোঝায় না, কারণ অনেক ঘটনাই প্রকাশ্যে আসে না। অনেকেই নিজের ডিপ্রেশনের কথা কাউকে জানাতে চান না। কিন্তু যেটুকু জানা যায়, তাতেই স্পষ্ট সমস্যা বেশ ভয়াবহ। সংখ্যাগুলোই যেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ। ২০২৩ সালে আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসা মিলিয়ে অন্তত ৫১৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। আরেকটি গবেষণা বলছে, শুধু ২০২২-২৩ এই দুই বছরে মিডিয়ায় প্রকাশিত আত্মহত্যার খবরের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৯৮৪ জন। বলাই বাহুল্য, এই আত্মহত্যা দীর্ঘদিনের হতাশারই ফল।
এখানেই শেষ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু কিংবা ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে থাকা তরুণদের ওপর করা সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৫০ শতাংশ থেকে ৭৪ শতাংশ শিক্ষার্থী বিষণ্নতা ও উদ্বেগে ভুগছেন। এই হার সাধারণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় অনেক বেশি। মানে যারা জীবনের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় বয়সেই মানুষ মানসিকভাবে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত। এই পরিস্থিতিতে জীবনের মোড় বদলে যেতে পারে অবিশ্বাস্যভাবে। নানান সম্ভাবনার দরজা বন্ধ হয়ে যেতে পারে হতাশার কবলে।
সংক্ষেপে বললে সংখ্যা আমাদের সতর্ক করছে শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ, হতাশা ও আত্মহননের প্রবণতা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি গুরুতর ঝুঁকির স্তরে পৌঁছে গেছে। অথচ এখানেও পুরো চিত্র ধরা পড়ে না। কারণ অনেক পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমনকি সংবাদমাধ্যমও প্রায়ই এই ঘটনাগুলো লুকিয়ে রাখে। তাই আসল সংখ্যাটা যে আরও বেশি ভয়াবহ হতে পারে, সে ব্যাপারে আর সন্দেহ নেই।
কী প্রভাব পড়ছে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপে
শিক্ষার্থীরা যখন মানসিক চাপে ভেঙে পড়েন, তখন তাদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা আসল সম্ভাবনাগুলো অকালেই নিভে যায়। মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে, পড়াশোনা হয়ে ওঠে দায়সারা, সৃজনশীলতা থমকে যায়। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের যে সময়টা হওয়ার কথা নতুন চিন্তা, নতুন গবেষণা আর নতুন স্বপ্নের জন্মক্ষেত্র; তা পরিণত হয় হতাশা আর ক্লান্তির অন্ধকার স্থান।
সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, অনেক তরুণ এই চাপ সহ্য করতে না পেরে বেছে নেন চরম অন্ধকার পথÑ আত্মহত্যা। আর তখন শুধু একটি জীবনই নয়, একটি পরিবার, একটি সম্প্রদায় এমনকি পুরো জাতি হারায় তার সম্ভাবনা। একজন তরুণের অসমাপ্ত গল্প মানে হলো তার পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়া, সমাজের একটি দিক নিভে যাওয়া, আর দেশের ভবিষ্যতের শক্তি আরও কিছুটা ক্ষয় হয়ে যাওয়া।
বাংলাদেশের উন্নতির সবচেয়ে বড় ভরসা হলো তরুণ প্রজন্ম। যদি তারাই এভাবে ভেঙে পড়ে, যদি তারা পড়াশোনা শেষ করেও জীবনের প্রতি আস্থা হারায়, তাহলে তা সরাসরি প্রভাব ফেলবে জাতির সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা ও অগ্রগতির ওপর। আমরা শুধু আজকের এক একজন তরুণকে হারাচ্ছি না, আমরা হারাচ্ছি আগামী দিনের শিক্ষক, বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা, কবি কিংবা নেতা।
ইডেন মহিলা কলেজে ইতিহাসে চতুর্থ বর্ষে পড়ছেন আফসানা মিমি। সময়মতো পড়ালেখা শেষ না হওয়ায় তিনি বেশ হতাশই হয়ে যাচ্ছেন। অনার্সে অধ্যয়নরত অবস্থায় মানসিক চাপ ও হতাশা কীভাবে বাড়ছে, সে সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার শিক্ষাজীবন যেন শেষই হচ্ছে না। একের পর এক সেশনজট, পরীক্ষা পিছিয়ে যাওয়া আর ফলাফলের দেরিতে সময় যেন জমাট বেঁধে গেছে। বয়স বাড়ছে অথচ আমি এখনও নির্ভরশীল নই। চারপাশে সমবয়সিরা চাকরি করছেন, সংসার শুরু করছেন অথচ আমি বই-খাতা নিয়ে পড়ে আছি। এই তুলনা আমাকে ভেতরে ভেতরে ভেঙে দেয়। বাস্তবে প্রতিদিন নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। কখনও পরীক্ষা ঠিক সময়ে হয় না, কখনও রেজাল্ট আটকে যায়। একবার ইন্টার্নশিপের সুযোগ পেয়েও হারাতে হয়েছে শুধু প্রয়োজনীয় কোর্স শেষ না করতে পারায়। টিউশনের টাকা দিয়েই পড়াশোনার খরচ চালাই, কিন্তু সব সময় সেই অর্থ যথেষ্ট হয় না। পরিবারের চাপ, আত্মীয়স্বজনের প্রশ্নÑ ‘কবে পড়া শেষ হবে, কবে কাজ শুরু করবে’Ñ এসব শুনতে শুনতে মাথা আরও ভারী হয়ে ওঠে। মাঝেমধ্যে সত্যিই হতাশ হয়ে পড়ি, রাত জেগে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে ভাবতে ঘুম হারাম হয়। তবু চেষ্টা করি আশা ধরে রাখতে। বিশ্বাস করি, এই দীর্ঘ সংগ্রাম এক দিন আমার সাফল্যের শক্ত ভিত্তি হয়ে উঠবে।’
করণীয় কী
মানসিক চাপকে অবহেলা করার মানে হলো অকালে নষ্ট হয়ে যাওয়া শত শত প্রাণ, হারিয়ে যাওয়া অসংখ্য প্রতিভা। তাই পরিবার, বন্ধু, শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
প্রথমেই পরিবারকে বদলাতে হবে মানসিকতা। সন্তানের ওপর অযথা ক্যারিয়ার চাপ না দিয়ে তার ইচ্ছা ও সামর্থ্য অনুযায়ী পথ বেছে নিতে দিতে হবে। পরিবারই যেন হয়ে উঠে শিক্ষার্থীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে হবে কার্যকর, সহজপ্রাপ্য ও গোপনীয় কাউন্সেলিং সেন্টার, যেখানে শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে সেবা নিতে পারবে। শুধু চিকিৎসা নয় অনেক সময় একজন সহানুভূতিশীল শ্রোতার দরকার হয়, যেখানে সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করা যায়। উন্নত বিশ্বে স্কুল, কলেজ থেকেই রয়েছে কাউন্সিলিংয়ের সুব্যবস্থা। দেরি হওয়ার আগেই আমাদেরও এই সুযোগ শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরি করা প্রয়োজন। পাশাপাশি উন্নত বিশ্বের মতোই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চালু করা যেতে পারে ‘পিয়ার সাপোর্ট গ্রুপ’ বা সমবয়সি সহায়তা কেন্দ্র, যেখানে প্রশিক্ষিত শিক্ষার্থীরাই তাদের সহপাঠীর পাশে দাঁড়াবে। এ ধরনের উদ্যোগ বিদেশি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে সফলভাবে চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাবগুলোতে রাখতে হবে সুস্থ সৃজনশীল প্রতিযোগিতা।
শিক্ষকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ জরুরি কীভাবে শিক্ষার্থীর চাপ বোঝা যায়, কীভাবে উদ্বেগের প্রাথমিক লক্ষণ চিহ্নিত করা যায়। শিক্ষকের বন্ধুসুলভ ব্যবহারই হতে পারে শিক্ষার্থীর প্রথম অনুপ্রেরণা।
শিক্ষার্থীদের হতাশা থেকে স্বাভাবিক জীবন নির্বিঘ্নে কাটানো নিয়ে শোনো’র সহ-প্রতিষ্ঠাতা মেরিলিন আহমেদ বলেন, ‘আত্মহত্যার বিষয়টা যতখানি মনস্তাত্ত্বিক, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে তা অনেকখানি আর্থসামাজিক অবস্থার পরিণতিও বটে। সম্প্রতি আমরা ‘শোনো’ থেকে দেশের কিছু স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম, মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কার্যক্রমে অংশ নিতে। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-শিক্ষকদের থেকে জানতে পেরেছি, ছাত্রদের মধ্যে হতাশা ও মাদকাসক্তি এখন জনস্বাস্থ্য সংকটে দাঁড়িয়েছে। ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতামূলক সামাজিক পরিস্থিতি, আর্থিক অসঙ্গতি, চাকরির বাজারের দুরাবস্থা, সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি, রাত জাগার অভ্যাস, পারিবারিকভাবে বাবা-মায়ের সঙ্গ কম পাওয়া, অল্প বয়সে সম্পর্কে জড়ানো ও বয়সানুপাতিক পরিপক্বতার অভাবে আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার কমতি ইত্যাদি কারণে ছাত্ররা আত্মহত্যার দিকে ঝুঁকছে। আমাদের উচিত জরুরি ভিত্তিতে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেওয়া এবং তা যদি সম্ভব নাও হয়, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করা ও শারীরিক যত্নের পাশাপাশি মনের যত্নের ব্যাপারেও সচেষ্ট করা।’
সোশ্যাল মিডিয়া এখন শিক্ষার্থীর জীবনের বড় অংশ। তাই বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারের পক্ষ থেকে ডিজিটাল ওয়েলবিয়িং প্রোগ্রাম চালু করা দরকার, যেখানে শেখানো হবে কীভাবে নেতিবাচক কনটেন্ট এড়িয়ে ইতিবাচক ব্যবহার গড়ে তোলা যায়। একই সঙ্গে, অনলাইনে হয়রানি ও অযাচিত মন্তব্য ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক বাধা বা সমালোচনা দূর করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার, বিশ্ববিদ্যালয় ও গণমাধ্যমকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে যাতে একজন শিক্ষার্থী সাহায্য চাইতে গেলে লজ্জা বা ভয় না পায়। নিয়মিত ক্যাম্পেইন, টক শো এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
সবশেষে, সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ হলো তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। ভবিষ্যৎ নিয়ে নিরাপত্তাহীনতাই মানসিক চাপের মূল উৎস। দক্ষতা উন্নয়ন, ইন্টার্নশিপ, উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য বিশেষ সহায়তা এসবই তরুণদের সামনে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। আজকের তরুণ প্রজন্ম হতাশাগ্রস্ত। কারণ তারা যেন এক অনন্ত দৌড়ে আটকে গেছে যেখানে সামনে গন্তব্য নেই, আছে শুধু চাপ আর তুলনা। কিন্তু শিক্ষা যদি কেবল নম্বর আর চাকরির জন্য হয়, তাহলে মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠার জায়গা কোথায়? যদি আমরা এখনই শিক্ষার্থীদের পাশে না দাঁড়াই, তবে প্রতিটি হারানো তরুণ শুধু একটি পরিবার নয়, গোটা জাতির সম্ভাবনাকে অপূর্ণ করে যাবে।