দীপু মাহমুদ
প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৫:৪৩ পিএম
অলংকরণ : মিথিলা ভৌমিক নবম শ্রেণি, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ঢাকা
ঘুম থেকে উঠে রাফিদা চমকে উঠেছে। সে দাঁড়িয়ে আছে আয়নার সামনে। চুল আঁচড়াতে গিয়ে দেখে তার মুখে হাসি নেই। এ রকম হওয়ার কথা নয়। রাফিদার মুখে সবসময় হাসি থাকে। সে আনন্দে থাকতে ভালোবাসে। আনন্দে থাকে বলে তার মুখ থেকে কখনও হাসি হারিয়ে যায় না। এখন তার মুখ থেকে হাসি হারিয়ে গেছে।
রাফিদার মন খারাপ হয়েছে। সে মন খারাপ করে ঘর থেকে বের হয়ে এলো। ঘরের বাইরে এসে দেখা হয়েছে মায়ের সঙ্গে। রাফিদার মতো মাও চমকে উঠেছেন। অবাক গলায় বললেন, ‘কী হয়েছে তোমার! মুখের হাসি কোথায় গেল!’
কষ্ট হচ্ছে রাফিদার। কষ্টে গলা বুজে আসছে। সে কান্না জড়ানো গলায় বলল, ‘মা আমার হাসি হারিয়ে গেছে।’
মাথায় আলতো আদর দিয়ে মা বললেন, ‘হাসি কখনও হারায় না। শুধু কোথাও লুকিয়ে থাকে। নিশ্চয় আজ তুমি তাকে খুঁজে পাবে।’
হাঁটতে হাঁটতে রাফিদা বাগানে গেল। বাগানে অনেক ফুল ফুটে আছে। হলুদকাঞ্চন, রক্তকরবী, জবা, সোনাপাতিসহ আরও কত যে ফুল! ফুলের সঙ্গে রাফিদার বেশ ভাব। সে প্রতিদিন বাগানে এসে ফুলের সঙ্গে কথা বলে। তাদের ছড়া শোনায়। গান শোনায়। আরও কত গল্প করে। হাসিখুশি মনে ফুলদের আদর করে দেয়। তাতে বাগানের ফুলগুলো খুশি হয়।
আজ রাফিদাকে দেখে বাগানের ফুলগুলো আশ্চর্য হয়েছে। লতার ভেতর থেকে ঝুঁকে অলোকানন্দা ফুলের দল বলল, ‘তোমার মুখে হাসি নেই কেন আজ?’
মন খারাপ করে রাফিদা বলল, ‘আমার হাসি হারিয়ে গেছে। হাসি খুঁজতেই বাগানে এসেছি।’।
পুরো বাগানের এখানে-ওখানে সবখানে খুঁজেছে রাফিদা। কোথাও তার হাসি খুঁজে পেল না।
রাফিদা মন খারাপ করে গেল নদীর ধারে। শান্ত নদীর পানিতে বাতাস বইছে। বাতাসের ছোঁয়ায় তিরতির করছে ঢেউ। এমন সুন্দর কিছু দেখে রাফিদার আনন্দে হেসে ওঠার কথা। রাফিদার মুখে হাসি নেই। সে উবু হয়ে পানির দিকে তাকাল। নদীর টলটলে পানিতে তার মুখ দেখা যাচ্ছে। বিষণ্ন হয়ে আছে মুখ। যেন কতদিন সেই মুখে হাসি নেই। শুধু আজ সকালে রাফিদার মুখের হাসি হারিয়ে গেছে। তাও মনে হচ্ছে সে অনেক দিন হাসে না।
নদী বলল, ‘কী হয়েছে তোমার? মুখ গোমড়া করে আছ! এর আগে যতবার তুমি আমার কাছে এসেছ সবসময় তোমার মুখে হাসি দেখেছি। তুমি হাসিমুখে আমার পানি নিয়ে মুখে দিয়েছ। আজ তোমার মুখে হাসি নেই। কোথায় গেল তোমার হাসি?’
রাফিদা করুণ গলায় বলল, ‘আমার হাসি হারিয়ে গেছে।’
নদী জিজ্ঞেস করল, ‘কেন তোমার হাসি হারিয়ে গেছে?’
রাফিদা বলল, ‘জানি না কেন আমার হাসি হারিয়ে গেছে। কোথায় হারিয়ে গেছে তাও জানি না।’
সেখানে এক মাছ ভেসে ছিল। সে নদী আর রাফিদার কথা শুনেছে। মাছ বলল, ‘তুমি নদীর পাড়ে এলে আমি ভেসে উঠি। তোমাকে দেখতে ভালো লাগে। তোমার মুখে সবসময় হাসি থাকে। তাই তোমাকে মুগ্ধ হয়ে দেখি। আজ তোমার মুখে হাসি নেই।’
রাফিদা বলল, ‘তুমি কি খুঁজে দেখবে কোথায় গেল আমার হাসি?’
মাছ ডুব দিয়ে নদীর নিচে চলে গেল। এদিকে-ওদিকে গিয়ে কোথাও রাফিদার হাসি খুঁজে পেল না।
রাফিদা এসে দিঘির পাড়ে গাছের নিচে মন খারাপ করে চুপচাপ বসে থাকল। তখন হালকা হলুদ রঙের এক অদ্ভুত পাখি এসে বসল রাফিদার সামনে। মাথায় তার হলুদ ঝুঁটি। সে ঝুঁটি নাড়িয়ে বলল, ‘আমি জানি কোথায় আছে তোমার হাসি।’
অমনি ঝলমলে চোখে রাফিদা বলল, ‘কোথায় আছে আমার হাসি?’
হলুদঝুঁটি পাখি বলল, ‘হাসি থাকে ভালো কাজে। সে কাজ যত ছোটই হোক। আর হাসি লুকিয়ে থাকে ভালোবাসায়।’
রাফিদার মনে পড়ল গতকাল নেহার সঙ্গে সে ঝগড়া করেছে। আর তাতে তার হাসি লুকিয়ে পড়েছে। রাফিদা তখনই নেহার বাড়িতে রওনা হলো। পথে দেখে একজন বুড়ো মানুষ মাথায় বোঝা তুলতে পারছেন না। রাফিদা তার মাথায় বোঝা তুলতে সাহায্য করল। অমনি রাফিদার মুখ হাসি হাসি হয়ে গেল। বুড়ো মানুষটি বললেন, ‘তোমার হাসি খুব সুন্দর। তাকে কখনো হারিয়ে যেতে দিও না।’
নেহাকে ডেকে রাফিদা সরি বলল। রাফিদা বলল, ‘তোমার সঙ্গে ঝগড়া করা আমার ভুল হয়েছে। তোমাকে আমি ভীষণ ভালোবাসি।’
বলে রাফিদা হাসিমুখে নেহাকে জড়িয়ে ধরল। রাফিদাকে জড়িয়ে ধরে নেহা বলল, ‘আমিও কখনও কারও সঙ্গে ঝগড়া করব না। তোমাকেও আমি খুব ভালোবাসি।’
হাসতে হাসতে রাফিদা বাড়ি ফিরে এলো। মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘মা, আমার লুকানো হাসি খুঁজে পেয়েছি। তাকে আর কখনও হারাতে দেব না।’
রাফিদাকে বুকের ভেতর জড়িয়ে ধরে মা আদর করে দিলেন।