অবমাননাকর বৈবাহিক সম্পর্ক
মেরিলিন আহমেদ
প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:৩১ পিএম
বাংলাদেশের সমাজে, বিয়েটা টিকিয়ে রাখা যেন নারীর একমাত্র দায়িত্ব। সম্পর্ক যতই বিষাক্ত হোক না কেন, ত্যাগ স্বীকার আর মানিয়ে নেওয়াটাই যেন স্বাভাবিক। অনেক নারী মৌখিক, অর্থনৈতিক, মানসিক, শারীরিক, এমনকি যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েও সম্পর্ক থেকে বের হতে পারেন না। প্রশ্ন ওঠে, কেন?
ঢাকার মিরপুরে বসবাসরত ৩৫ বছর বয়সি শারমিন (ছদ্মনাম) বলেন, ‘আমার স্বামী আমাকে প্রতিদিন গালাগাল করে, মাঝেমধ্যে মারেও। কিন্তু আমি কোথায় যাব? আমার কোনো অর্থনৈতিক অবলম্বন নেই। দুইটা বাচ্চা আছে, বাবা-মা বেঁচে নেই। সমাজ বলবে, স্বামীকে ছেড়ে এসেছে।’
শারমিনের মতো হাজারো নারী আছেন, যারা সম্পর্কের মধ্যে থেকেই প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তাদের অধিকাংশই নিজের কথা বলার সুযোগ পান না, বা ভয় পান। পরিবারের আপত্তি, আর্থিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক কলঙ্ক, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা, সব মিলিয়ে সিস্টেমটাই যেন নারীদের চুপ করিয়ে রাখে।
আজকাল অনেক নারী, ‘আমি নারী, আমি সব পারি’, এই ‘পারফেকশনিজম’ বা ‘পরিপূর্ণতাবাদ’-এর মতাদর্শে, নিজেকে সমাজের চোখে সফল দেখাতে একটি এবিউসিভ ম্যারেজ বা অবমাননাকর বিবাহে আটকা পড়ে থাকেন।
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে যেখানে মেয়েদের বিয়ের সময় জানিয়ে দেওয়া হয়, ‘বিয়ের লাল শাড়ি পরে যাচ্ছিস, কাফনের কাপড়ে বের হবি’, সেখানে নারী বিয়ের পরপরই, বাবার বাড়ি থেকে যেমন পর হয়ে যায়, তেমনি নিজের সংসারেও সারা জীবন পর হয়েই কাটিয়ে দেয়। সত্যিকারের ঘর করা হয়ে ওঠে না।

এদেশের অধিকাংশ নারীই স্বামীর ওপর আর্থিকভাবে নির্ভরশীল। নিজের উপার্জনের উৎস না থাকায় পরিবার থেকে বেরিয়ে আসা শুধু কঠিনই নয়, প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত বলে, আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন করাও কঠিন হয়ে যায়।
অশান্তিপূর্ণ বিবাহ
বৈবাহিক নিগ্রহ ও পারিবারিক সহিংসতার ব্যাপারে সামাজিক অসচেতনতাও নারীদের এই অসহায়ত্বের কারণ। যে সমাজ ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে’ বলে, এই গুরুভার শুধু নারীদের ওপরেই ছেড়ে দেয় অথবা পরিবারের বয়োজেষ্ঠ্য নারীরাই যখন ‘পুরুষ মানুষ একটু আধটু মুখ খারাপ করবে’ কিংবা ‘গায়ে একটু হাত তোলা কোনো বিষয় না’ ধরনের ভ্রান্ত বুলি আউড়াবে, সেই পরিবারে নিগৃহীত নারীর যেমন মুক্তি নেই, তেমনি মুক্তি নেই সেই মেয়ে বা ছেলে শিশুটির, যে এই জেনে বড় হবে যে, এই সবই স্বাভাবিক।
একটি অশান্তিপূর্ণ বিবাহের নানা দিক থাকে। যেমনÑ গালাগাল, শারীরিক অত্যাচার, যৌন হিংস্রতা, তাচ্ছিল্য ও অসম্মানসূচক আচরণ করা। অনেকে স্ত্রীদের পরিবার ও সমাজ হতে বিচ্ছিন্ন করার হুমকি, ভরণপোষণের খোঁটা অথবা ভরণপোষণ না দেওয়ার ভয় দেখিয়ে থাকে। আজকাল অনেকে ঘরের মধ্যে সিসিটিভি কিংবা জিপিএস ট্র্যাকারের মাধ্যমে স্ত্রীদের প্রতি পদক্ষেপের ওপর নজরদারি করে মানসিকভাবে নাজেহাল করে। এমন অপ্রীতিকর বৈবাহিক সম্পর্কে, প্রায় ক্ষেত্রেই পুরুষরা গ্যাসলাইটিংয়ের মতো ভয়াবহ মানসিক কৌশল অবলম্বন করে। এই কৌশলের অপব্যবহারকারী পুরুষরা তাদের নিজস্ব আচরণগত দোষ কিংবা দুর্বলতা ঢাকতে, বাস্তব ঘটনাকে বিকৃত করে স্ত্রীর ওপর ত্রুটি চাপিয়ে, তাকেই দায়ী করে, দায় স্বীকারে বাধ্য করে মানসিক দাসে পরিণত করা।
এ ছাড়া সন্তান ও প্রিয়জনদের ক্ষতি করা বা ক্ষতি করার ভয় দেখানো, কথায় কথায় বিচ্ছেদের হুমকি দিয়েও বিচ্ছেদে রাজি না হওয়া, এই সব ও একটি অশান্তিপূর্ণ বিবাহের সংকেত।
অনেক নারীই বলেন, ‘আমি লাথি ঝাঁটা যাই খাই, ছেলেমেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে, সংসার কামড়ে পড়ে আছি।’ অথচ তারা এই বিষয়ে নির্বিকার যে, একটি বিষাক্ত সম্পর্ক, শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশে এখনও এটাই বিশ্বাস করা হয় যে, বিবাহবিচ্ছেদ মানেই ব্যর্থতা। বিশেষ করে, নারীদেরই এই অপবাদটুকু দিতে যেন সমাজ সবচেয়ে বেশি স্বস্তি বোধ করে! নারী যদি স্বামীকে ছেড়ে যায়, তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, তাকে একঘরে করে দেওয়া হয়, পরিবারও অনেক সময় সমর্থন করে না। আমাদের দেশে, বিচ্ছেদের পর একজন পুরুষ যত সহজে, নতুন একজন সঙ্গিনী খুঁজে পেতে পারেন, একজন নারী কিন্তু তত সহজে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারেন না।
আবার কোনো নারী যদি সাহস করে, বিচ্ছেদ বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা চিন্তা করেন, তাহলেও আইনি সহায়তার দুর্বোধ্যতা, আদালতের জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা ও হয়রানিÑ এসব অনেক নারীকেই সামনে এগোতে দেয় না। এই দৃশ্যপট গ্রামাঞ্চলে আরও অভাবনীয়। বাংলাদেশে নারী নির্যাতন দমন আইন-২০০০ অনুযায়ী, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই সচেতনতারই অভাব সর্বত্র।
তা ছাড়া দীর্ঘদিনের মানসিক নির্যাতনের ফলে নারীরা এক ধরনের ট্রমা বন্ডিংয়ে আটক পড়েন। সম্পর্ক ভেঙে বেরিয়ে আসা মানেই পরিচিত জগতটা হারিয়ে ফেলা, এই ভয়টাই বড় হয়ে ওঠে। এ ছাড়া আমাদের সমাজে নারীদের ছোটবেলা থেকেই, নিজের আত্মসম্মানবোধকে বলি দিয়ে হলেও আত্মত্যাগের দীক্ষায় বড় করা হয়। নারী তাই সংসারে ঢুকে যেন নিজের চাওয়াটাও বলতে ভুলেই যায়। অপমান সহ্য করে, নিগৃহীত বৈবাহিক জীবনেই আটকে থাকতে হয়।
পরিসংখ্যান কী বলছে
২০১৫ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) নারী নির্যাতনের চিত্র নিয়ে যে জরিপ প্রকাশ করে সেখানে দেখা যায় বাংলাদেশে ৭২.৬ শতাংশ বিবাহিত নারীই কোনো না কোনোভাবে স্বামীর দ্বারা নির্যাতনের শিকার হন। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনের হার ৪৯.৬ শতাংশ। জরিপে দেখা যায়, যারা নির্যাতনের শিকার হয় তাদের ৭২.৭ শতাংশই নির্যাতনের ঘটনা বাইরের কাউকে বলেন না। আর থানা-পুলিশ পর্যন্ত অভিযোগ পৌঁছান মাত্র ১.১ শতাংশ নির্যাতিত নারী। অর্থাৎ বেশিরভাগই মুখ বুজে অত্যাচার সহ্য করে যাচ্ছেন। (তথ্যসূত্র-বিবিসি)
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) বাংলাদেশের সমন্বয়ে প্রকাশিত নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ-২০২৪ অনুযায়ী, নারী আয় করলেও সেই টাকায় কর্তৃত্ব থাকে পুরুষের। গ্রামের সঙ্গে এক ধরনের পাল্লা দিয়ে শহরেও বেড়ে চলেছে নারী নির্যাতনের হার। দেশে জাতীয়ভাবে জীবনে একবার হলেও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন দেশের ৭৫ দশমিক ৯ শতাংশ নারী। এই হার শহরে ৭৫ দশমিক ৬ শতাংশ ও গ্রামে ৭৬ শতাংশ। ফিজিক্যাল, সেক্সুয়াল, ইমোশনাল, কন্ট্রোলিং বিহ্যাভিয়ার, ইকনোমিক ভায়োলেন্স মিলিয়ে দেশে ৭৫ দশমিক ৯ শতাংশ নারী নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
জরিপ বলছে, প্রযুক্তির সহায়তায় নারী নির্যাতন বাড়ছে। নানা ডিভাইসের মাধ্যমে সংবেদনশীল ব্যক্তিগত ছবি বা অযাচিত অন্তরঙ্গ মেসেজের মাধ্যমে বাড়ছে নারী নির্যাতন। অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবেও নারী নির্যাতন করা হচ্ছে। দরিদ্রতাসহ নানা কারণে সব সময় শহরের চেয়ে নারী নির্যাতনের হার বেশি থাকে গ্রামে। কিন্তু সেই চিত্রেরও পরিবর্তন হয়েছে। আর্থিকভাবে সচ্ছলতা এলেও কমেনি নারী নির্যাতন।
শহর ও গ্রামে যৌন নির্যাতনের হারে খুব বেশি পার্থক্য নেই। শহরে যৌন নির্যাতনের হার ৩১ দশমিক ১ এবং গ্রামে ২৮ শতাংশ। গত ১২ মাসেও যৌন নির্যাতন বেশি হয়েছে বরিশালে। এ সময় জাতীয় পর্যায়ে দেশে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৯ দশমিক ৪ শতাংশ নারী। সেখানে বরিশালে এর হার ১৩ দশমিক ২ শতাংশ। এর পরেই চট্টগ্রামে ১১ দশমিক ২ শতাংশ।
এ ছাড়া ঢাকায় ৮ দশমিক ৭ শতাংশ, খুলনায় ৯ দশমিক ১ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ, রাজশাহীতে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ, রংপুরে ৯ দশমিক ১ শতাংশ এবং সিলেটে ১০ দশমিক ৭ শতাংশ নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। গত ১২ মাসে গ্রামে ৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং শহরে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
নারীদের সহায়তায় হেল্পলাইন
বর্তমানে বাংলাদেশে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান ও হেল্পলাইন আছে, যারা এই ধরনের পরিস্থিতিতে থাকা নারীদের সহায়তা দিতে কাজ করছে। যেমনÑ ন্যাশনাল হেল্পলাইন ১০৯, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, জেলা লিগ্যাল এইড অফিস, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রসমূহ। শোনো-তে এমন অনেক ক্লায়েন্ট আসেন, যারা প্রথমে শুধু মানসিক সহায়তা নিতে আসেন। ধীরে ধীরে তাদের আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে সাহায্য করা হয়, যেন তারা নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, বৈবাহিক সম্পর্কটিকে কীভাবে উন্নত করা যায় অথবা বিচ্ছেদই কি সঠিক পথ কি নাÑ তা ভেবে নিতে।
একটি মেয়েকে যখন প্রশ্ন করা হয়, ‘তুমি কেন এই সংসারে আছো?’, তখন উত্তরটা অনেক জটিল। সমাজ, পরিবার, অর্থনীতি, সন্তান, মনস্তত্ত্ব, অনেক কিছুই তাকে আটকে রাখে। কিন্তু প্রশ্নটা হওয়া উচিত, ‘এই নারীকে কেন একা লড়তে হচ্ছে?’ সমাজ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব, এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে কোনো নারীকে ‘ভয় কিংবা সহ্য করে থাকা’ নয়, নিজের মতো করে বাঁচার সুযোগ দেওয়া হয়।
লেখক : কো-ফাউন্ডার ও সিইও, শোনো