সুজিত সজীব
প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৫:০৫ পিএম
সেদিন সকালটা নিস্তব্ধ ছিল। জানালা দিয়ে সোনালি আলো ভেঙে পড়ছিল রোলে শহরের শান্ত ঘরে, যেখানে স্তূপে স্তূপে পড়ে আছে পুরনো ফিল্ম স্ট্রিপ আর বই। হ্রদের ধারে শরতের বাতাস ধীরে ধীরে পাতাগুলো নড়াচড়া করছিল, যেন নীরব কোনো ক্যামেরা সবকিছু রেকর্ড করছে।
চলচ্চিত্র আকাশের মহা নক্ষত্র জ্যাঁ-লুক গদার নিভে গিয়েছিল এই ঘরেই। পাশে ছিলেন তাঁর দীর্ঘদিনের সঙ্গী অ্যান-মারি মিয়েভিল।
কোনো নাটক নেই, কোনো আড়ম্বর নেই, কোনো ধর্মীয় আয়োজন নেই। তাঁর মৃত্যু ছিল নিঃশব্দ, ব্যক্তিগত, অথচ গভীর—ঠিক যেমন ছিল তাঁর জীবন।
গদারের নাম উচ্চারিত হলেই মনে ভেসে ওঠে Breathless (À bout de souffle, 1960)। সেদিন ওই সিনেমার মাধ্যমে নতুন চলচ্চিত্র ভাষার জন্ম হয়েছিল। প্রচলিত নিয়ম ভেঙে গদার বেরিয়ে পড়লেন শহরের রাস্তায়। হাতে ক্যামেরা, হঠাৎ কাট, চরিত্রের সরাসরি দর্শকের দিকে তাকানো—সব মিলিয়ে চলচ্চিত্র ভাষাকে নতুন রূপে রাঙিয়ে দিলেন। পুররোনো সবকিছু ভেঙে দিল গদারের নতুন চিন্তা আর ক্যামেরা।
এরপর এলো Contempt, Pierrot le Fou, Alphaville—যেখানে প্রেম, রাজনীতি ও দার্শনিকতা এক হয়ে গেল এক অনন্য শিল্পে।
১৯৬০-এর দশকে শুরু হওয়া ফরাসি নিউ ওয়েভ আন্দোলনের প্রাণপুরুষ বলা চলে গদারকে। ওই আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি বিশ্ব চলচ্চিত্রের ভাষাকে দিলেন নতুন সংজ্ঞা। তাঁর সিনেমা অনেক সময় জটিল, ভাঙাচোরা, টুকরো টুকরো; তবু সেই খণ্ডিত ঘটনাপ্রবাহ থেকেই জন্ম নিত এক নতুন সুর।
সমালোচকেরা তাই বলেন— ‘Cinema before Godard and after Godard’। মোদ্দা কথা, বিশ্ব চলচ্চিত্রকে তিনি ভাগ করে দিয়েছেন দুই যুগে। গদার শুধু সিনেমা নির্মাতা নন, তিনি ছিলেন বিদ্রোহী চিন্তার এক ইস্পাতের মতো কঠিন এক ভাস্কর।
গদারের ছবিতে রাজনীতি সর্বদা উপস্থিত। কখনও সরাসরি, কখনও ব্যঙ্গাত্মক ইঙ্গিতে। La Chinoise কিংবা Weekend-এ তিনি দেখিয়েছেন ফরাসি সমাজের অস্থিরতা, তরুণদের বিপ্লবী উন্মাদনা।
জীবনের শেষ দিকে তিনি নির্মাণ করেন Goodbye to Language (২০১৪) ও The Image Book (২০১৮), যেখানে ভাষা, চিত্র ও দর্শকের সম্পর্ক নিয়েই নতুন প্রশ্ন তুলেছিলেন।
তাঁর মৃত্যুদিনে রোলে শহরের আকাশে এক টুকরো মেঘ ভর করেছিল। তার প্রভাবে সূর্যের আলো হঠাৎ ঢাকা পড়েছিল। তখন হয়তো বিশ্বজুড়ে সিনেমাপ্রেমীরা অনুভব করল—একটি যুগের সমাপ্তি ঘটল। কেউ লিখলেন, ‘গদার না থাকলে সিনেমা হতো কেবল বিনোদন, শিল্প নয়।’ আবার কেউ বললেন, ‘তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, ছবি মানে শুধু গল্প নয়—ছবি মানে চিন্তার ধারাবাহিকতা।’
তবে যে যাই বলুক, এটা চির সত্য যে, তিনি বিশ্ব সিনেমাকে শিখিয়েছেন—সিনেমা কোনো সীমানায় বাঁধা নয়; এটি প্রশ্ন করার শিল্প, বিদ্রোহের শিল্প এবং শেষ পর্যন্ত বাস্তবতার শিল্প, জীবনের শিল্প।
গদারের ছবির জাম্প-কাট, অর্ধেক বলা সংলাপ কিংবা চরিত্রের হঠাৎ থেমে যাওয়া দর্শককে ভাবায়। আর তার এই অদ্ভুত, খেয়ালি ও সৃজনশীল চিন্তাগুলো বারবার মনে করিয়ে দেয়—চলচ্চিত্র কেবল বিনোদন নয়, এটি এক অমর প্রতিবাদের-প্রতিরোধের ভাষা।
আমি বারবার চিন্তা করি, আমার পছন্দের বিষয়গুলো নিয়ে নিয়মিত লিখবো, কিন্তু পারি না... কেন পারি না তা জানি না। হয়তো আমি সময়ের নিদারুণ অপচয় করে চলেছি।