মনিরাজ শাহ
প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:০৩ পিএম
বাড়ির চারপাশে ছয় মাস থইথই করছে হাওরের পানি। পানির নিচে রয়েছে মাঠ-ঘাটসহ বাড়ির রাস্তা। চারপাশে পানি থাকার কারণে চলাচলের একমাত্র বাহন ছোট ছোট ডিঙি নৌকা। যুগযুগ ধরে হাওর এলাকার মানুষ এভাবেই বসবাস করছেন। তবে কোনো কোনো পরিবারের বিশুদ্ধ ও নিরাপদ খাবার পানির সংকট রয়েছে।
‘বর্ষায় নাও, হেমন্তে পাও’ এই প্রবাদ বাক্যে সুনামগঞ্জের পবিবেশগত বৈচিত্র্য ফুটে উঠেছে। হাওর জনপদের জেলা সুনামগঞ্জের বর্ষায় চারদিকে থই থই পানি থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে চিত্র ব্যতিক্রম। বর্ষায় পানিতে টইটম্বুর আর শুষ্ক মৌসুমে হাওর শুকিয়ে পানির নিদান (সংকট) অবস্থা তৈরি হয়। এই অঞ্চলের মানুষের শতাব্দির পর শতাব্দি প্রকৃতির এমন বৈরী পরিবেশে বেড়ে উঠতে হয়েছে। বর্ষায় হাওরের আফালের (ঢেউ) হাত থেকে ভিটে মাটি রক্ষায় প্রকৃতির নল-খাগড়া, ঝাউবন মানুষের প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করছে। কখনও ভিটে মাটি ভেসে গেছে, কখনও কোনো মতে টিকে থাকতে হয়েছে। তবুও দমে যাননি হাওর পাড়ের সংগ্রামী মানুষ। প্রকৃতির এমন বৈরিতাকে মিতালি করে হয়েছে হাওরের ক্রমবিকাশ।
তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের উমেদপুর গ্রামের পাশে একটি ঘরে বসবাস করছেন সাগর মিয়া ও তার স্ত্রী পপি বেগম। বাড়ির চারপাশে পানি। অন্যগ্রাম বা বাজারে যেতে নৌকা ছাড়া উপায় নেই। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেক বছর হলো গ্রামের পাশে ঘর বানিয়ে বসবাস করছেন তারা। দুই মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে তাদের সংসার। দুই মেয়ে উমেদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। বড় মেয়ে সাঁতার জানলেও বাকি দুই সন্তান সাঁতার এখনও শিখছে। এজন্য সব সময় চোখে চোখে রাখতে হয় তাদের। সাগর মিয়া বলেন, ‘অভাব-অনটন আর টাকার সংকটের কারণে ভালো জায়গায় ঘর তুলতে পারিনি। এই জায়গায় নিজেরা মাটি কেটে কষ্টে করে কুঁড়েঘর বানিয়েছি। আর শুকনা মৌসুমে হাওরে ধান চাষ করি। বর্ষায় হাওরে ডিঙি নৌকা দিয়ে মাছ ধরি। এভাবেই দিন যাচ্ছে, চলছে সংসার। পাতাবুকা গ্রামের বাসিন্দা হৃদয় মিয়া বললেন, আমরা হাওরপাড়ের মানুষ ছয় মাস পানির সঙ্গে বসবাস করেই অভ্যস্ত। এই সময় ছোট ছোট শিশুরা ডিঙি নৌকায় করেই স্কুলে যায়। অল্প বয়সেই তারা সাঁতার শিখে ফেলে, তাই পানির ভয় তেমন কাজ করে না। তবে অসচেতনতার কারণে অনেক সময় ঘরে বা আশপাশে দুর্ঘটনার শিকার হয় শিশুরা। ছয় মাস পানি থাকাকালীন আমরা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করি, আর শুকনা মৌসুমে হাওরে ধান চাষ করি। বৈশাখ মাসে জমি কেটে ধান ঘরে তুলি। নোয়াগাঁও গ্রামের লুৎফুর রহমান সোহাগ বলেন, বাড়ির চারপাশের পানির মধ্যেই আমাদের জীবনযাত্রা কাটে, হাতে ডিঙ্গি নৌকা অথবা ইঞ্জিনচালিত ছোট নৌকাই আমাদের একমাত্র যাতায়তের মাধ্যম। অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নিতে গেলে নানারকম সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এতে অসুস্থ মানুষ নিয়ে পরিবারকে সব সময় দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। চারদিক ডুবে থাকায় শিশুরা খেলাধুলা করতে পারে না, ফলে তাদের সঠিকভাবে বিকাশ হয় না।
উমেদপুর গ্রামের ইউপি সদস্য ডালিম মিয়া জানান, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আনা-নেওয়ার জন্য বাজারে যেতে নৌকার ওপর ভরসা করতে হচ্ছে। বর্ষায় গ্রামের চারপাশে পানি থাকে। রাস্তাঘাট পানির নিচে ডুবে থাকে। ঘর থেকে বের হলেই চোখে পড়ে শুধু পানি আর পানি। এভাবে বসবাস করে আমরা অভ্যস্ত।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মেহেদী হাসান বলেন, হাওরের গ্রামগুলো জনবিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে চারপাশে পানি থাকায় এসব পরিবার নৌকা দিয়ে চলাচল করে। যুগযুগ ধরে হাওরের মানুষ এভাবেই বসবাস করছেন। কিছু পরিবার জনবিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে চারপাশে পানি থাকায় এসব পরিবারে নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকে। এই পরিবারগুলোর দিকে আমাদের সব সময় বিশেষ নজর দেওয়া হয়।