লেইসফিতার বাক্স
লাবিবা ইরম
প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৪:১৭ পিএম
আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৪:১৮ পিএম
ছবিতে - নন্দিতা জ্যোতি
ফেলে আসা দিনগুলোতে মেয়েদের সাজের অনুষঙ্গ বলতে ছিল হাত ভরা কাঁচের চুড়ি, পায়ে আলতা, চুলে রঙিন ফিতা, কপালে ছোট্ট টিপ। সময় গড়ালে এসব সাজের অনুষঙ্গ বদলে আধুনিকতা জায়গা করে নেয়। তবে ওই যে কথায় বলে না ‘পুরনোকে আমি বেসেছি ভালো’ ঠিক এভাবেই আবারও পুরনো দিনের সাজের অনুষঙ্গগুলো জায়গা করে নিচ্ছে মেয়েদের লেইস ফিতার বাক্সে।
‘লেইইইসস-ফিতা-লেইইইস-’ সুরেলা এই একটি ডাক ৮০ ও ৯০ দশকের হাজার মেয়েদের মনের কোণে এক মধুর স্মৃতির দোলা দিয়ে যায়। আজকাল এ ডাক আর খুঁজে না পাওয়া গেলেও ৮০-৯০ দশকে এই ডাকটি ছিল বেশ পরিচিত। বিশেষত গ্রাম এবং শহরতলির দিকে মেয়ে ও মহিলাদের জন্য ছিল এক রঙিন আনন্দের পসরা। কাঠ এবং কাচের তৈরি চারকোণা এক বাক্সে ছিল কত শত রঙিন সব শখের জিনিস। কোনো এক বাড়ির উঠানে বা রাস্তার পাশে বসে সেই বাক্স খোলা হতো আর আশপাশে জমতো মেয়েদের ভিড়। কেউ চায় আলতা, কেউ চায় টিপ, কারও লাগবে রঙিন ফিতা, কারও লাগবে ক্লিপ। সবার শখের জিনিসে ভর্তি ছিল ছোট্ট এই বাক্সটা।

সময় গড়িয়েছে, সবকিছুতে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক কিছু। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে ফ্যাশনে আর সাজগোজে বারবার ফিরে এসেছে এই লেইস ফিতার সমাহার। আজকে আমরা একটু ঘুরে আসব সেই স্মৃতির বাক্স থেকে, যার জিনিসগুলো আবারও আমাদের সাজগোজের বাক্সে উঠে এসেছে।
আলতা
আলতা আবহমান বাংলার নারীদের সাজের এক চিরন্তন প্রিয় অনুষঙ্গ। যখন সাজের এত রকম জিনিস পাওয়া যেত না, তখন থেকেই গ্রামের বধূর সাজে আলতা ছিল অন্যতম। হাতে, পায়ে লাল টকটকে রঙের আলতা দেওয়া বধূ যখন পালকি থেকে নামত, সবার মাঝে খুশির রেশ ছড়িয়ে পড়ত। অর্জুন বা পলাশ গাছের ক্ষত থেকে তৈরি করা এই রঞ্জক তরলটি লেইস ফিতার কাচের বাক্সে কাচের শিশিতে থাকত। যেকোনো অনুষ্ঠান উপলক্ষে বা শখের বশেই সাজগোজের বাক্সে আলতা একটা থাকতই। তবে আলতা শুকোতে বেশ সময় লাগত, আর শুকানোর পরও অনেক সময়ই লেগে যেত কাপড়ে। আবার ওঠানোর পর দুই-তিন দিন হালকা একটা রঙ হয়ে থাকত, যা ছিল অস্বস্তিকর। এরকম বেশকিছু সমস্যার কারণে আলতার ব্যবহার আস্তে আস্তে উঠে গিয়েছিল। তবে পুরনো স্মৃতিকে ঘিরে আবারও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে আলতা। মায়েদের সাজগোজের প্রিয় আলতা মেয়েরাও খুঁজে ফিরছে এখন। প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে নানারকম আধুনিক ফর্মুলায় বর্তমানে তৈরি হচ্ছে আলতা, যা দ্রুত শুকিয়ে যায়, কাপড়ে লাগার অসুবিধাও নেই। পানি দিয়েই ভালোভাবে পরিষ্কার করে ফেলা যায়। তাই বর্তমানে তরুণীদের মাঝে আবারও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে আলতার চল। আগে শুধুই আলতা দিয়ে রঙ করে রাখা হতো, নানারকম নকশার চল ছিল না। বর্তমানে অনেকেই আলতার ওপর সাদা রঙ দিয়ে আলপনা, কল্কা ইত্যাদি করে আলতার ব্যবহারে বৈচিত্র্যও আনছেন।
‘আলতার রঙ যত গাঢ়, বৈবাহিক জীবন তত সুন্দর হবে’Ñ এমন বিশ্বাসই ছিল আগের দিনে। তাই বাজারের সেরা আলতা পরানো হতো বিয়ের কনেকে। কনের গায়ে গয়না থাক বা না থাক, লাল টুকটুকে বউয়ের সাজ আলতা ছাড়া অসম্পূর্ণ মনে করা হতো। হাতে মেহেদি আর পায়ে আলতারঙা না হলে কনের সাজকে পূর্ণ ধরা হতো না। এমনকি আলতার উজ্জ্বল লাল রঙ বিবাহিত নারীর প্রতীক বলেও বিবেচিত হতো। ‘কল্যাণী’ আর ‘রক্তরেখা’ ছিল তখনকার সবচেয়ে জনপ্রিয় নাম। তবে কালের পরিক্রমায় রক্তরেখা আলতার বাজার থেকে হারিয়ে গেলেও ‘কল্যাণী’ এখনও টিকে আছে। তবে সময় বদলের সঙ্গে সঙ্গে আলতার আবেদন অনেকটাই ম্লান হয়েছে। এখন বাঙালি নারীরা আলতা পরেন নববর্ষে, পুজোর দিনে কিংবা বিশেষ কোনো উপলক্ষে। সেটিও খুব একটা নিয়মিত নয়। অনেকটা অগোচরেই বেঁচে আছে বাংলার এই ঐতিহ্য। পুরান ঢাকার শাঁখারী বাজারে গেলেই চোখে পড়বে নয়-দশ রকম আলতার নাম। অলিগলি ঘুরে মিলবে ইন্দিরা, খুকুমণি, সতী, সোহাগান, ভাগ্যশ্রী, কেয়াশেঠ, সোহাগ, কাবেরি আর কল্যাণীর মতো আলতা।
বর্তমানে আলতা নিয়ে কাজ করছেন জনপ্রিয় অনলাইন উদ্যোগ ‘সরলা’র উদ্যোক্তা মানসুরা ইয়াসমিন স্পৃহা। আলতার প্রতি ভালো লাগা থেকে তারা এনেছেন সরলা আলতা। কেন আলতা নিয়ে কাজ করছেন জানতে চাইলে মানসুরা বলেন, আলতা যুগ যুগ ধরে আমাদের এই উপমহাদেশে ব্যবহার হয়ে আসছে। সাবেকি ব্যাপারটা আমার সব সময়ই ভালো লাগে। তাই সরলা সব সময় চেষ্টা করে পুরনোকে সঙ্গে নিয়ে বর্তমানের একটা সেতু তৈরি করতে। এরই ধারাবাহিকতায় আলতা নিয়ে কাজ করা। আমাদের ধারণা অবশ্য একপেশে নয়। আমরা ফ্যাশনের সঙ্গে আলতার একটা যুগলবন্দি চেয়েছিলাম। যেমনÑ মেয়েরা আগে শুধু শাড়ি পরলে আলতা পরত, এখন আমরা চাই জিন্সের সঙ্গেও মেয়েরা আলতা পরুক। ট্রেন্ডের বাইরে গিয়ে কিছু নতুনত্ব আসুক। তবেই তো নতুন ট্রেন্ড তৈরি হবে।

কাচের চুড়ি
খ্রিস্টপূর্ব দেড় হাজার বছর আগে রোমান সভ্যতায় চুড়িতে কাচের ব্যবহারের কথা জানা যায়। কালের বিবর্তনে কাচের রেশমি চুড়ি এসে পড়ে বাংলায় আর আলাদা একটা আবেদন তৈরি করে বাঙালি নারীদের কাছে, যা চিরন্তন বাংলার একটা অংশ হয়ে উঠেছে। সেই লেইস ফিতার বাক্স থেকে আজ পর্যন্ত কাচের চুড়ির কদর কখনোই খুব একটা কমেনি। এই চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ ছাড়া বাঙালি উৎসব-পার্বণ যেন বৃথা। কাচের চুড়ির হরেক রঙ সাজে আনত আলাদা বৈচিত্র্য। তবে আগে খুব বেশি রঙের চল ছিল না। লাল, হলুদ, কালো আর সাদাÑ চলতো সবচেয়ে বেশি। আস্তে আস্তে কাচের চুড়ির নানা রঙ বাজারে আসতে থাকে। মেয়েরাও পছন্দের পোশাকের সঙ্গে রঙ মিলিয়ে কিনতে থাকে। আগের কাচের চুড়িগুলো বেশ ভঙ্গুর ছিল, তা ছাড়া অনেক সময় হাত কেটে যেত এটি থেকে। তাই মাঝে বাজারে ব্যবহার কমেছিল। আধুনিক প্রযুক্তি বর্তমানে কাচের চুড়ির স্থায়িত্ব বাড়িয়েছে। সঙ্গে এনেছে বৈচিত্র্যময় নকশা, খাঁজকাটা, দুই রঙাসহ নানা ডিজাইন ও রঙ। যেকোনো সাজের সঙ্গে কয়েকটা কাচের চুড়িই যেন পুরো সাজটাকে পরিপূর্ণ করে দেয়। শাড়ির সঙ্গে হাতভরা কাচের চুড়ি এখন মেয়েদের না হলেই নয়। বিভিন্ন মেটাল, ফাইবার, কাঠ, সুতা কিংবা আরও অনেক ম্যাটেরিয়ালে তৈরি চুড়ি বাজারে থাকা স্বত্ত্বেও কাচের চুড়ির আবেদন আজও বাঙালিদের কাছে একটুও কমেনি।
টিপ
‘আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা’ ছোট্টবেলায় মায়েরা ঘুম পাড়াতে বাচ্চাদের এভাবেই গান গেয়ে শোনাতেন। সেই ছোট্টবেলা থেকেই আমাদের পরিচয় টিপের সঙ্গে। হাজার বছর ধরে বাঙালি সাজসজ্জায় টিপ একটি বড় জায়গা দখল করে আছে। লেইস ফিতার বাক্সে ছোট বা বড় পাতায় পাওয়া যেত নানা রঙের টিপ। ছোট বাচ্চা থেকে তরুণী সবার চাহিদায় থাকত একটি হলেও টিপের পাতা। আগে লাল ও কালো গোল টিপের চল ছিল বেশি। টিপের চল বাংলায় কখনোই কমেনি। মায়ের হাতে ছোট্ট কপালে টিপ দেওয়া থেকে প্রিয় মানুষের হাতে টিপ পরা পর্যন্তÑ বাঙালি মেয়েদের সাজের বাক্সে টিপ থাকতই। তবে বর্তমানে টিপের আলাদা বাজার তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন রঙ, শেইপ ও সাইজের টিপ তো আছেই সঙ্গে আছে নানা বৈচিত্র্য। আছে হাতে বানানো টিপ, মেটাল ফিলিগ্রি দিয়ে বানানো টিপ কিংবা আলপনা আঁকা টিপ। বাঙালি মেয়েদের সাজের বাক্সে আবারও জায়গা দখল করে নিচ্ছে সব রঙিন টিপ।

একসময় মেয়েদের সাজ বলতে ছিল খোঁপা করা চুল, শাড়ি-গয়না পরে ভ্রুর মাঝখানের ছোট্ট অংশজুড়ে চন্দন কিংবা কুমকুমের আলপনা দেওয়া। নানা রঙের কুমকুমের নকশায় ভরে উঠত বাড়ির ছোট-বড় বউ-ঝিয়ের ললাট। সাজের বাক্সে কুমকুমের সমাদর তাই বরাবরই ছিল। আর বিয়ের কনের কপালজুড়ে কুমকুম-চন্দনের আলপনার সাজে নিত্যনতুন নকশা যোগ না হলে যেন বিয়ের সাজে কোথাও কমতি রয়ে যেত। কোন বাড়ির কোন কনের কপাল থেকে গাল পর্যন্ত আলপনার নকশা কতটা নিখুঁত হলো, কতটা সুন্দর হলোÑ এ নিয়েও প্রতিযোগিতার শেষ ছিল না। সেসব দিন পেরিয়েছে কতকাল হলো। নানি-দাদি-চাচি-খালাদের কাছে এসব গল্প শুনতে শুনতে এখনকার আধুনিক সাজ দেওয়া মেয়েদেরও কি মাঝে মাঝে সেভাবে সাজতে ইচ্ছা হয়? নিশ্চয়ই হয়। তাইতো কুমকুমের সেই চিরচেনা সৌন্দর্য এখনও সবাই খুঁজে ফিরছে কেন? মেয়েদের ফ্যাশনে নতুন করে কুমকুম ব্যবহারের চল বেড়েছে। ঢাকার শাঁখারী বাজারেও অনেকেই এখন কুমকুম খুঁজতে যান বলে জানালেন সেখানকার একজন বয়স্ক দোকানি। তা ছাড়া অনলাইনেও অনেক পেইজ এখন কুমকুম নিয়ে আসছে ফ্যাশনের অংশ হিসেবে।
নেইল পলিশ
লেইস ফিতার বাক্সে মেয়েদের আরেকটি আকর্ষণের জিনিস ছিলÑ নেইল পলিশ। আগে নেইল পালিশ শুধু লাল বা মেরুন রঙেরই দেখা যেত। কাচের ছোট্ট শিশিতে করে আসা এই রঞ্জক পদার্থটি তরুণীদের জন্য ছিল বেশ ভালোবাসার। তবে দেখা যেত নেইল পলিশগুলো খুব একটা উন্নতমানের ছিল না, ফলে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হতো। বর্তমানে নেইল পালিশের অনেক রঙ বাজারে পাওয়া যায়। আছে দেশি-বিদেশি নানা ব্র্যান্ড। নেইল পলিশের রঙের টেকসইয়ের পাশাপাশি নখের ক্ষতি কম হয়, সহজে ওঠানো যায়Ñ এরকম নানা দিকে এখন উন্নত হয়েছে। ফলে আগের চেয়েও সবার কাছে এর চাহিদা বেড়েছে দ্বিগুণ। বর্তমানে মেয়েরা শুধু লাল বা মেরুন নয়, বরং রঙ মিলিয়ে নানা সাজে সাজিয়ে থাকে নিজেদের নখকে। সঙ্গে নেইল আর্ট করার অনুষঙ্গ সহজলভ্য হওয়ায় এটি শৈল্পিক একটি রূপ পেয়েছে, যা শুধুই নখকে রাঙানোর মাঝে আর সীমাবদ্ধ নেই।

চুলের ফিতা ও ক্লিপ
লেইস ফিতার কাচের বাক্স থেকে উঁকি দিত চুলের ক্লিপ। সাধারণত ববি পিনস যা বাংলায় কালো ক্লিপ নামে পরিচিতÑ সেটিই থাকত বেশি। এই কালো ক্লিপ দিয়েই মায়েরা, বোনেরা চুলে করতেন নানা রকম বেণি, খোঁপা। ছোট বাবুদের জন্য কিছু গোল গোল মৌ ক্লিপ পাওয়া যেত। বেশ পরে স্প্রিংয়ের প্রজাপতি ক্লিপও উঠল সেই বাক্সে। চুলের সাজের ক্ষেত্রে এসব ক্লিপের চাহিদা কখনোই কমেনি। আজও চুলে নানা সাজ দিতে কালো ক্লিপের ব্যবহার তো হয়ই। বাচ্চাদের চুল সাজাতে বর্তমান বাজারে নানা রঙ ও ডিজাইনের ক্লিপের চল এসেছে। এ ছাড়া বড়দের জন্যও এসব চুলের ক্লিপে এসেছে বৈচিত্র্য। নানা রঙের হেয়ার স্ট্রিং বর্তমানে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে মেয়েদের মাঝে।
রঙিন ফিতা দিয়ে চুল বাঁধা ছিল আগের যুগের একটি দৈনন্দিন অংশ। দেখা যাত বাড়ির উঠানে কয়েক বাড়ির মায়েরা মেয়েরা মিলে একে অন্যের চুল ফিতা দিয়ে বেঁধে দিচ্ছে, করে দিচ্ছে নানা ডিজাইনের বেণি, বেণির নিচে ফিতার ফুল। তাই লেইস ফিতার বাক্সের অন্যতম অংশ ছিল এই ফিতা বা লেইস। সাধারণত লাল, হলুদ, সাদা আর কালো ফিতার চল ছিল বেশি। আস্তে আস্তে নানা রকম হেয়ার টাই, স্ক্রাঞ্চি আসার ফলে ফিতা দিয়ে চুল বাঁধার চল উঠে গেছে। তবে চুল সাজাতে ফিতা বা লেইসের ব্যবহার উঠে যায়নি। বরং বর্তমানে ফিতা দিয়ে বানানো বিভিন্ন ডিজাইনের ফুল, বো ইত্যাদি ক্লিপ ও হেয়ারস্ট্রিংয়ের সঙ্গে লাগিয়ে পরার স্টাইল এসেছে। তাই লেইস ফিতার আদি স্টাইল হারিয়ে গেলেও নতুন রূপে সে এখনও সাজের বাক্স দখল করেই আছে।
কৃতজ্ঞতা
নন্দিতা জ্যোতি, মাইমুনা আফরিন মিথি,
হালদার সুমিতা, উম্মে মাহবুবা লাম্মি,
অনামিকা সরকার সঞ্চারী
পেইজ : ভূমিসুতা, তুড়ি