চীনা লোকগল্প
রূপান্তর : নিজাম বিশ্বাস
প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৫:০০ পিএম
আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৫:০১ পিএম
অলংকরণ : নিঝুম নিসর্গ, সপ্তম শ্রেণি, রোজডেল ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, খুলনা
দূর পাহাড়ে বাস করত বড় বড় দুটি সাপ। তারা ছিল দুই বোন। বড় বোনের গায়ের রঙ ছিল সাদা, আর ছোট বোনটি কালো। তাদের ছিল ভীষণ জাদুকরী ক্ষমতা। চাইলেই তারা যখন-তখন যেকোনো প্রাণীর রূপ ধারণ করতে পারত। দুই সাপ বোনের একদিন খুব ইচ্ছে হলো মানুষের দেশ ঘুরে দেখার। তাই তারা দুই নারীর রূপ নিয়ে পাহাড় থেকে নেমে এলো সমতলে।
আহা, কী সুন্দর মানুষের দেশ! মানুষের ঘর-বাড়ি, পথ-ঘাট, সাজানো বাগান, আরও কত কী। তারা যেদিকেই তাকায় আনন্দে শিহরিত হয়ে ওঠে! হাঁটতে হাঁটতে দুই বোন অবশেষে এক বিশাল দিঘির কাছে এসে পৌঁছল। সেখানে জু জিয়ান নামে এক সুদর্শন যুবকের সঙ্গে তাদের পরিচয় হলো। সাদা সাপ মেয়ে জু জিয়ানের রূপে মুগ্ধ হয়ে গেল। জু জিয়ানেরও সাদা সাপ মেয়েটিকে ভালো লেগে গেল। তারপর একসময় তারা বিয়ে করে ফেলল। বিয়ের পর সাপবধূ জু জিয়ানের বাড়িতে একটি দাতব্য চিকিৎসালয় খুলে বসল। বনের সব ঔষধি লতাপাতা ছিল তার জানা। তাই তাদের ওষুধে মানুষ দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠত। দেশ-দেশান্তর থেকে লোক এসে ভিড় করত সেখানে।

একদিন এক তান্ত্রিক এলো জু জিয়ানের বাড়িতে। সেই তান্ত্রিকেরও ছিল এক ভয়ানক ক্ষমতা। সে জু জিয়ানের বউকে দেখা মাত্রই চিনে ফেললÑ এ এক মস্ত বড় সাপ। জু জিয়ানকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলল সব। কিন্তু জু জিয়ানের কিছুতেই তান্ত্রিকের কথা বিশ্বাস হলো না। তান্ত্রিক তাই জু জিয়ানের হাতে একবোতল মন্ত্রপূত জল দিয়ে বলল, ‘এটা তোমার বউকে পান করালেই দেখতে পাবে তার আসল রূপ।’
এক রাতে সাপবধূর স্যুপের বাটিতে জু জিয়ান লুকিয়ে সেই মন্ত্রপূত জল ঢেলে দিল। ঘরের কাজ সেরে যেই না সাপবধূ স্যুপের বাটিতে চুমুক দিল, অমনি সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল, এবং মুহূর্তের মধ্যে সে আগের সেই বিশাল সাদা সাপের রূপ ধারণ করল। এই দেখে বেচারা জু জিয়ান ভয়ে আর আতঙ্কে একেবারে মরেই গেল।
মন্ত্রপূত জলের ক্ষমতা একসময় শেষ হয়ে এলো। সাপবধূ আবার ফিরে পেল মানুষের রূপ। চোখ খুলে দেখল জু জিয়ান মেঝেতে পড়ে আছে। স্পর্শ করে বুঝতে পারল সে আর বেঁচে নেই। জু জিয়ানের মৃত্যুতে সাপবধূ ভীষণ কষ্ট পেল। পরক্ষণেই তার মনে পড়ল আকাশচুম্বী এক পাহাড়ের ওপর মরা মানুষকে জীবিত করার আশ্চর্য এক ওষুধ আছে।
আকাশচুম্বী পাহাড়ে সাদা সাপ যেই না ওষুধে দিল হাত, আর সঙ্গে সঙ্গে মস্ত বড় এক সারস পাখি তাকে আক্রমণ করে বসল। সাপ আর সারসে সে কী মারামারি! সারস পাখি ওই ওষুধ পাহারা দিয়ে রেখেছে। কাউকেই সে তা নিতে দেবে না। অবশেষে এক গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো, ‘থামো তোমরা। কী হয়েছে বলো আমাকে?’ সে ছিল পাহাড়ের দেবতা। সাদা সাপ সবকিছু বলল তাকে। মৃত জু জিয়ানকে বাঁচাতেই হবে তার। অনেক কাকুতি-মিনতি শেষে পাহাড়ের দেবতা তাকে মৃত মানুষ জীবিত করার আশ্চর্য সেই ওষুধ নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিল।
মৃত জু জিয়ানের শরীরে ওষুধ মেখে দেওয়া হলো। জু জিয়ান চোখ খুলল, কিন্তু শরীর ভীষণ দুর্বল। এ খবর চলে গেল সেই তান্ত্রিকের কানে। এক রাতে চুপি চুপি সে জু জিয়ানকে তুলে নিয়ে গেল তার বাড়িতে।
ঘুম ভেঙে সাপবধূ দেখে জু জিয়ান নেই। সে তার ছোট বোনকে খবর পাঠাল। এরপর দুই বোন মিলে জু জিয়ানকে খুঁজতে শুরু করল। অবশেষে তান্ত্রিকের বাড়িতে এসে পৌঁছল তারা। তান্ত্রিকের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য দুই বোন ড্রাগনরাজের সাহায্য চাইল। ড্রাগনরাজ দুই বোনকে সাহায্য করার জন্য পাঠিয়ে দিল একদল জলের সৈন্য। তারা সবাই মিলে তান্ত্রিকের বাড়ি জলে ডুবিয়ে দিল। তান্ত্রিকও কম যায় না, সেও এক দেবতার সাহায্য নিল। তান্ত্রিকের হাত থেকে বাঁচার জন্য দুই বোন পদ্মপাতার আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। তবু শেষরক্ষা হলো না। দুই বোন হেরে গেল তান্ত্রিকের জাদুমন্ত্রের কাছে।
এদিকে জু জিয়ানও আবার উঠে দাঁড়িয়েছে। তার শরীরে আগের মতোই শক্তি অনুভব করছে। তান্ত্রিক একদিন বাইরে কোথাও বের হলে জু জিয়ান সেই সুযোগে তান্ত্রিকের বাড়ি থেকে পালিয়ে সাপবধূর কাছে চলে এলো। জু জিয়ান জেনে গেছে তার বউ আসলে একটি সাপ। তবু সে তার বউকে বলল, ‘তুমি সাপ হও আর যা-ই হও আমি তোমাকে ভালোবাসি।’
কিন্তু তাদের কপালে সুখ বেশিদিন সইল না। সেই তান্ত্রিক আবার এসে তাদের আক্রমণ করে বসল। এবার সে দেবতাদের কাছে থেকে মস্ত বড় একটি সোনার বাটি নিয়ে এসেছে। সেই সোনার বাটি দিয়ে আটকে ফেলল সাপবধূকে। সাপবধূর পেটে ছিল সন্তান, তাই সে তান্ত্রিকের সোনার বাটি উল্টে ফেলে বের হতে পারল না। তান্ত্রিকের বাড়ির নিচে তাকে আটকে রাখা হলো, সেখানেই জন্ম নিল হতভাগী সাপবধূর ছেলে। তারপর কয়েকশ বছর ধরে তারা সেখানেই বন্দি ছিল।
[সামান্য পরিমার্জিত]