নুসরাত সাদিয়া মুনা
প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৫:১১ পিএম
ছবিতে শুভ ও পুষ্প
বাংলাদেশের সমাজে একসময় শিক্ষাজীবন আর সংসারজীবন ছিল দুই ভিন্ন ধাপের নাম। প্রথমেই পড়াশোনা শেষ করতে হবে, তারপর ক্যারিয়ার দাঁড় করাতে হবে, তারপরই আসবে সংসারের পালা। এই পরিক্রমায় অনেক প্রেমিক-প্রেমিকারই হয়েছে বিচ্ছেদ। ‘চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি বেলা শুনছো’ শোনার ভাগ্য হয়নি অনেক প্রেয়সীর। একটা ভালো চাকরির অভাবে হারিয়ে গেছে যুগান্তরের প্রেম। অল্প কিছু বছর আগেও, কর্ম খোঁজের আগেই বিয়ের চিন্তাই যেন এক অসম্ভব কল্পনা ছিল।
কিন্তু বর্তমানের আলাপ ভিন্ন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দৃশ্যপট যেন বদলে গেছে। পরিবর্তন এসেছে আমাদের চিন্তাভাবনায়। করোনাকালে দীর্ঘ লকডাউন, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, মৃত্যুর হার, মানসিক একাকিত্ব সব মিলিয়ে সমাজের জীবনদর্শন বদলে দিয়েছে। মানুষ উপলব্ধি করেছে জীবনের নেই স্থায়িত্ব। তাই স্থিরতা, সম্পর্ক আর মানসিক নিরাপত্তার প্রাধান্যই জীবনে বেশি হওয়া উচিত। ফলে প্রেমের সম্পর্কগুলো পরিণতির কথা ভেবেছে, দ্রুত রূপ নিয়েছে বিয়েতে। অভিভাবকরাও সন্তানদের মানসিক চাহিদা ও বাস্তবতার কথা ভেবে এই সিদ্ধান্তে অনেক বেশি সহনশীল হয়ে উঠেছেন।
প্রেমের সম্পর্ক দ্রুত বিয়েতে রূপ নেওয়ার প্রবণতা করোনাকাল থেকে বেশি হয়েছে। অভিভাবকরাও সন্তানদের পাশে থেকে দেখেছেন তাদের মানসিক অস্থিরতা, নিঃসঙ্গতা। তাই আগে যেখানে পড়াশোনা চলাকালীন বিয়ে মানেই ছিল অসম্ভব এক ‘অসাবধানী সিদ্ধান্ত’, এখন তা অনেক পরিবারের জন্য বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়াশোনার পাশাপাশি বিয়ে করার প্রবণতা কতটা বেড়েছে, তা বোঝা যায় সাম্প্রতিক জরিপগুলো থেকে। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকসের (BBS) ২০২২ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে মোট বিবাহিত নারীদের প্রায় ২৬% এর বয়স ২০-২৪ বছরের মধ্যে। এদের একটি বড় অংশ তখনও পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় (২০২১) দেখা যায়, নগর এলাকায় প্রায় ১৮% বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী স্বীকার করেছেন যে তারা পড়াশোনার সময় বিয়ে করেছেন বা বিয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ছাত্রছাত্রীদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি একেবারেই অন্যরকম। কেউ কেউ মনে করেন, বিয়ে তাদের পড়াশোনায় সহায়ক হয়। বিশেষ করে মেয়ে শিক্ষার্থীরা বলেন, বিশ্ববিদ্যালের দিন শুরুর পর থেকেই বিয়ের ব্যাপারে পরিবার ও আত্মীয় স্বজনের চাপ সৃষ্টি হয়। তাই পড়াশোনা চলাকালীন বিয়ে হলে পারিবারিক চাপ কমে যায়, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দূর হয়। এমনকি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে স্বামীর সহযোগিতাও পাওয়া যায়।
ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাসনিম ও রায়হান দম্পতি। দুজনে এখনও পড়াশোনা করছেন। তাসনিম বললেন, ‘করোনার সময় মনে হয়েছিল ভবিষ্যতে কতদিন এভাবে থাকতে হয় তা জানি না। পরিবার থেকেও বিয়ের চাপ ছিল। তাই সংসার শুরুর সিদ্ধান্ত নেই। এখন দুজন দুজনকে সাপোর্ট করেই এগিয়ে চলছি।’ অভিভাবকদের মাঝেও দেখা যাচ্ছে পরিবর্তন। আগে যেখানে চাকরির আগে বিয়ের আলোচনায় প্রধান অন্তরায় ছিল অভিভাবক, সেখানে এখন তারা সবচেয়ে বড় সাপোর্ট। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অভিভাবক বলেন, ‘আগে ভাবতাম পড়াশোনার আগে বিয়ে মানেই জীবন শেষ। কিন্তু করোনা আমাদের শিখিয়েছে জীবন কত অনিশ্চিত। যদি মেয়ে আর ছেলেটি দুজনেই দায়িত্ব নিতে পারে, তবে কেন না?’
অভিভাবকদের মনোভাবেও পরিবর্তন এসেছে। আগে বাবা-মায়েরা বলতেন, ‘আগে পড়াশোনা শেষ করো, তারপর বিয়ে।’ কিন্তু করোনাকালীন অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, চাকরির বাজারের অস্থিরতা, এবং সমাজে মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে অনেক অভিভাবক এখন পড়াশোনার পাশাপাশি বিয়েকে স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছেন। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারে মেয়েদের দ্রুত বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।
অতীত ও বর্তমানের তুলনা
অতীতের সঙ্গে বর্তমানের তুলনা করলে এই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়। ৯০-এর দশক বা তার আগেও শিক্ষাজীবনে বিয়ে হওয়া অস্বাভাবিক কিছু ছিল না, তবে তা মূলত গ্রামীণ এলাকায় বেশি হতো এবং অনেক ক্ষেত্রে তা ছিল প্রথাগত বাল্যবিবাহ। বর্তমানে শহুরে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও পড়াশোনার সঙ্গে বিয়ের ঘটনা বেড়ে গেছে, তবে এর পেছনের কারণ ভিন্ন। এখনকার সময়ে বিয়ের সিন্ধান্ত নেওয়ার কারণ হলো প্রেম, পারিবারিক বোঝাপড়া, কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা।
তবে এই বাস্তবতার দুই রকম ছবি আছে। অনেকেই পড়াশোনা চলাকালীন বিয়েকে আশীর্বাদ মনে করলেও, অন্য শিক্ষার্থীরা মনে করেন বিয়ে পড়াশোনার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একই গবেষণায় প্রায় ৪২% শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, বিয়ের কারণে তাদের পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিয়ে মানেই শুধু কাগজে দস্তখত নয়। সংসার, দায়িত্ব, আর্থিক চাপ, সন্তান জন্ম ইত্যাদি কারণে অনেকে পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখেই থেমে যেতে বাধ্য হন।
একদিকে কিছু তরুণ-তরুণী বলছেন, সংসার জীবনের সঙ্গী থাকায় পড়াশোনার চাপ ভাগ হয়ে যায়, জীবনে স্থিরতা আসে। অন্যদিকে ভিন্ন অভিজ্ঞতাও আছে। সংসারের চাপ আর একাডেমিক জীবন সামলানো একসঙ্গে বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে উঠছে অনেকের কাছে। এমনকি অল্প বয়সে এই সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে হিতে বিপরীত হয়েছে অনেকের সঙ্গে। সংসারের আর্থিক টানাপড়েন, দৈনন্দিন কাজের চাপ, সন্তান জন্ম নিলে নতুন দায়িত্ব এসব সামলে পরীক্ষা, ক্লাস, গবেষণা করা সহজ নয়। ফলস্বরূপ কেউ কেউ পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে, আবার কেউ ক্যারিয়ার গড়ার প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে যাচ্ছে। বিশেষত মেয়েদের ক্ষেত্রেই সংসারের দায়িত্ব বেশি হয়ে যায়, ফলে তাদের শিক্ষাজীবন প্রায়ই থমকে যায়।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, এই প্রবণতা সমাজে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। করোনার পর তরুণরা সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে একই সঙ্গে তারা ক্যারিয়ার ও শিক্ষার গুরুত্ব ভুলে গেলে চলবে না। পরিবারগুলোকে দেখতে হবে বিয়েটি যেন তাদের স্বপ্নকে থামিয়ে না দেয়।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের, বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের নিলুফা ইয়াসমিন বৃষ্টি ও মো. সালাউদ্দীন মহসিন ৩য় বর্ষে থাকাকালীন বিয়ে করেন। ডিপার্টমেন্টে অসাধারণ রেজাল্ট, এক্সট্রা কারিকুলার আক্টিভিটিজ এবং তার পাশাপাশি দুজনেই টিউশন কাজে সংযুক্ত থেকে নিজেদের খরচ নিজেরাই চালিয়েছেন। সবকিছু এত চমৎকারভাবে কীভাবে সামলিয়েছেন জানতে চাইলে তারা বলেন, ‘ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির কথা ভেবে আমরা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেই। একে অন্যকে প্রতিনিয়ত সাহায্যের মাধ্যমেই এগিয়ে চলেছি। একসঙ্গে ক্যারিয়ার প্ল্যান করতে পেরেছি। এখন এসে মনে হয় বিয়ের সিদ্ধান্তটি আমরা সঠিক নিয়েছি।’
নতুনদের জন্য পরামর্শের বিষয়ে নিলুফা ইয়াসমিন বৃষ্টি বলেন, ‘বিয়ে একটা দায়িত্ব। আর্থিক ও মানসিকভাবে এই দায়িত্ব নিতে পারলে তবেই পড়াশোনার পাশাপাশি এই সিদ্ধান্তের কথা ভাবা উচিত।’
অতীতে বিষয়টি এত সহজ ছিল না। তখন সমাজে কথাবার্তার ভয়, আত্মীয়স্বজনের চাপ, প্রতিবেশীর সমালোচনাÑ সব মিলে পড়াশোনার ফাঁকে বিয়ে ছিল ব্যতিক্রম। আজ সেই সমাজই অনেকটা বদলে গেছে। প্রেম-ভালোবাসাকে এখন পরিবারগুলো বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করছে। একই সঙ্গে তরুণরা নিজেরাই অনেক বেশি স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
অনেক তরুণ দম্পতি একে অন্যকে সমর্থন করে পড়াশোনা শেষ করছেন, যৌথভাবে ক্যারিয়ার গড়ছেন। পারিবারিক জীবনের পাশাপাশি পড়াশোনার অভিজ্ঞতা তাদের মানসিকভাবে পরিণত করছে। তবে নেতিবাচক দিকও স্পষ্ট অল্প বয়সে দায়িত্বের চাপ, আর্থিক টানাপড়েন, মানসিক চাপ এবং পড়াশোনার ক্ষতি। ইউনিসেফের ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বিয়ের পর পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হওয়া তরুণীদের সংখ্যা এখনও উল্লেখযোগ্য। বিয়ের পর সঙ্গীর সাপোর্ট ছাড়াও দুই পরিবারের পারিবারিক সাপোর্টও জরুরি হয়ে পড়ে, যা সব সময় সবাই পেয়ে ওঠে না। ফলস্বরূপ তরুণীরাই পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যায়।
সবশেষে বলা যায়, করোনা-পরবর্তী সময়ে তরুণদের পড়াশোনার ফাঁকে বিয়ে এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং সমাজে একটি নতুন প্রবণতা। এটি কারও জন্য আশীর্বাদ, কারও জন্য বোঝা। সমাজ ও পরিবারকে তাই ভাবতে হবে কোন বয়সে, কোন পরিস্থিতিতে এই সিদ্ধান্ত সত্যিই কল্যাণকর হতে পারে। বিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত। বয়সের অপরিপক্কতা, সিদ্ধান্তহীনতা অনেক সময় ভবিষ্যতের কাল হতে পারে। শিক্ষা ও ক্যারিয়ারই যেখানে ভবিষ্যতের ভিত্তি, সেখানে বিয়ে যেন সেই ভিত্তিকে দুর্বল না করে, বরং শক্ত করে।