× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আনারসের রাজ্য মধুপুর

অরণ্য ইমতিয়াজ

প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৫ ১৭:০৩ পিএম

 আনারসের রাজ্য মধুপুর

আনারসের কথা মনে হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রসে ভরা টইটম্বুর একটি ফল। বাইরে অনেকটা শক্ত মনে হলেও ভেতরে নরম। কাটার সময়ই রস ঝরতে থাকে। মুখে দেওয়ার পর মিষ্টি রসে ভরে যায় মুখ। ২০২৪ সালে মধুপুরের আনারস জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

আনারস আবাদের বড় জায়গা হলো টাঙ্গাইলের মধুপুর। এ উপজেলার বেশিরভাগ জমিতেই আনারসের আবাদ হয়। মধুপুর আর আনারসÑ একটির নাম উঠলেই অন্যটির কথা মনে পড়ে। মধুপুর উপজেলা আনারসের ‘রাজধানী’ হিসেবে খ্যাত। এ উপজেলায় প্রচুর আনারস আবাদ হয়। তবে মধুপুরের পার্শ্ববর্তী উপজেলা ঘাটাইল ও সখীপুরেও প্রচুর আনারসের আবাদ হয়ে থাকে। আনারসের মূল মৌসুম হচ্ছে জুন, জুলাই ও আগস্ট। তবে বর্তমানে সারা বছরই কমবেশি আনারস আবাদ হয়ে থাকে। আগে মূলত জায়ান্টকিউই জাতের আনারস আবাদ হতো মধুপুর গড়ের পাহাড়িয়া অঞ্চলে। জায়ান্ট মানে দৈত্য। জায়ান্টকিউ আকারে সত্যিই বড়। তার পর ধীরে ধীরে অন্য জাতের আনারসও আবাদ হতে থাকে। কয়েক বছর ধরে জলডুগি জাতের আনারস আবাদ হচ্ছে। পার্বত্য অঞ্চলের আনারস জলডুগি বা হানি কুইন। জলডুগি খেতে মিষ্টি তবে আকারে ছোট। 

সম্প্রতি ফিলিপাইনের উন্নত ‘এমডি টু’ জাতের আনারসের আবাদ শুরু হয়েছে মধুপুর উপজেলায়। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) মাধ্যমে ফিলিপাইন থেকে এক লাখ এমডি টু জাতের আনারসের চারা আমদানি করা হয়। সে চারা বিতরণ করা হয় কৃষকদের মধ্যে। উপজেলার মহিষমারা এলাকার ১৭ জন চাষি তাদের জমিতে এ চারা রোপণ করেন। এ আনারস সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি সুমিষ্ট। এ ছাড়া বাগান থেকে কাটার পর সহজে পচন ধরে না। তাই পচন রোধে কোনো ধরনের রাসায়নিক ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য অনেক ইতিবাচক বলে জানিয়েছেন কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা।

জমি ও আবাদের পরিমাণ : টাঙ্গাইল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, টাঙ্গাইলের মধুপুর গড় অঞ্চলে গত বছর ৭ হাজার ৬৬১ হেক্টর জমিতে আনারস আবাদ করা হয়। উৎপাদন হয়েছিল ২ লাখ ৭২ হাজার মেট্রিক টন। চলতি মৌসুমে ৭ হাজার ৭৯৪ হেক্টর জমিতে আনারস আবাদ করা হয়েছে। এ বছর ২ লাখ ৮৭ হাজার ৬০১ মেট্রিক টন ফল আসবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ। 

এ নিয়ে কথা হয় টাঙ্গাইল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আশেক পারভেজের সঙ্গে। তিনি বলেন, আনারস আবাদের জন্য পাহাড়িয়া এলাকা খুবই উপযোগী। এবার আনারসের ভালো ফলন হয়েছে। কৃষকরা দাম ভালো পাচ্ছেন। প্রতিটি আনারস পাইকারি হিসেবে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা আর ভোক্তা পর্যায়ে আকারভেদে সর্বোচ্চ ৬০ টাকায় বিক্রি করা যাচ্ছে। কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছেÑ আনারসে পরিমাণ মাত্রায় হরমোন প্রয়োগের জন্য এবং নির্দিষ্ট সময় পর আনারস বাজারে তোলার জন্য।

ইতিহাস : টাঙ্গাইলের মধুপুরে আনারস আবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হয়। তারা আনারস আবাদের ইতিহাস সম্পর্কে জানান, মধুপুরে আনারস আবাদের ইতিহাস খুব বেশি পুরনো নয়। গড় (উঁচু) এলাকার আউশনারা ইউনিয়নের ভেরেনা সাংমা ষাটের দশকের শেষ দিকে গিয়েছিলেন ভারতের মেঘালয়ে। সেখানে প্রচুর আনারস হয়। তিনি কয়েকটি জায়ান্টকিউ জাতের আনারসের চারা নিয়ে আসেন। মধুপুর গড়ে নিয়ে এসে রোপণ করেন। প্রথমবারেই ভালো ফলন হয়। খেতেও সুস্বাদু ছিল। পরে আরও বেশি জমিতে আনারস আবাদ করেন তিনি। তার দেখাদেখি অন্যরাও আনারসের আবাদ করতে থাকেন। এভাবেই মধুপুরে যাত্রা শুরু করে আনারস আবাদ। স্বাদ ও সুমিষ্ট গন্ধের কারণে খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এ আনারস।

বাজার : ঘাটাইল ও মধুপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী গারোবাজার এবং মধুপুরের জলছত্র আনারস ক্রয়-বিক্রয়ের বড় হাট। প্রতি সপ্তাহের রবি ও বুধবার গারোবাজার বসে আনারসের হাট। উপজেলার অরণখোলা, আউশনারা, শোলাকুড়ি বা পঁচিশ মাইল থেকে জলছত্রে আনারস আসে। জলছত্র হাট বসে শুক্র ও মঙ্গলবার। এ ছাড়া ভরা মৌসুমে এ হাটে প্রতিদিনই আনারস বিক্রি হয়। এ সময় দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকাররা আনারস ক্রয়ের জন্য আসেন।খুচরা ব্যবসায়ীরা আনারস ক্রয় করে অটোরিকশা ও ছোট পিকআপে যার যার গন্তব্যে নিয়ে যান।

কথা হয় মধুপুর ও ঘাটাইল উপজেলার কয়েকজন আনারস চাষির সঙ্গে। তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত তারা আনারস আবাদ করছেন। বছর শেষে খরচ বাদ দিয়ে ভালো লাভ থাকছে তাদের। তবে কিছু সমস্যার কথাও জানান কেউ কেউ। তাদের একজন গারোবাজারের স্কুলশিক্ষক সাজ্জাদ রহমান। তিনি বলেন, দাম ভালো পাওয়ায় আমরা খুশি। চাষিরা লাভবান হওয়ায় আনারসের আবাদও বেড়েছে। তবে বিপণন খরচ, মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে কিছু সমস্যা হচ্ছে। আনারস বিপণন ও সংরক্ষণ হচ্ছে সবচেয়ে বড় সমস্যা। 

মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক প্রয়োগ : এক সময় কিছু মুনাফালোভী চাষির কারণে আনারস গাছে নানা রকমের রাসায়নিক প্রয়োগ করা হয়। এতে চারা রোপণের এক বছরের মধ্যেই ফল আসে। তবে ওইসব আনারসে প্রকৃত স্বাদ থাকে না। অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে আনারস এক সময় ঐতিহ্য হারাতে বসে। বাজারে ধস নামতে থাকে।

প্রায় বিশ বছর আগে অসময়ে জলডুগি আনারস উৎপাদন ও বিপণনের জন্য অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও হরমোন ব্যবহার করার প্রবণতা শুরু হয়। কিছু অসাধু চাষি অতিরিক্ত লাভের আশায় অতিমাত্রায় এ রাসায়নিক প্রয়োগ শুরু করেন। এ সময় থেকেই মূলত আনারস থেকে অনেকটা মুখ ফিরিয়ে নিতে থাকেন ক্রেতারা। বর্তমানে এ অবস্থার অনেকটা পরিবর্তন হলেও কিছু কিছু চাষি এখনও আনারসে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করে যাচ্ছেন। 

আনারসে অতিরিক্ত রাসায়নিকের কারণে শুধু স্বাদই নষ্ট হয় না শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিও হয়। নিউরোলজি ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. সাব্বির আহমেদ ঢালী বলেন, আনারসে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে মানুষের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি হতে পারে। দেহের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি হতে পারে। হাড় ও অস্থির ক্ষয়রোগ হয়ে সামান্য আঘাতে এগুলো ভেঙে সারা জীবনের জন্য পঙ্গুত্ববরণ করতে হতে পারে। এ ছাড়া ডায়াবেটিস, প্রেশার বেড়ে স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। আর বিষমুক্ত আনারস খেলে মানবদেহের পানিশূন্যতা, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হবে। ভিটামিন সি এবং পানির চাহিদা পূরণ হবে। 

নিরাপদ আনারস আবাদ : আনারসের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে এবং মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক প্রয়োগ বন্ধ করতে মধুপুরে কয়েকজন চাষি উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে প্রধান উদ্যোক্তা হলেন চাষি ছানোয়ার হোসেন। তার সঙ্গে যোগ দেন মো. আয়নাল হক, লোকমান হোসেন, আব্দুস সালাম, মো. জুলহাস উদ্দিন, মো. ফারুক হোসেন, মো. শহিদুল ইসলাম, মো. জাবেদ আলী, হুমায়ূন কবীর, জাকির হোসেন। তারা ২০১৪ সালে গঠন করেন নিরাপদ ফল ও ফসল চাষি সমবায় সমিতি। এই সমিতির মাধ্যমে শুরু করা হয় নিরাপদ আনারস চাষ। সমিতির সভাপতি ও জাতীয় কৃষিপদকপ্রাপ্ত চাষি মধুপুর উপজেলার মহিষমারা গ্রামের ছানোয়ার হোসেন। তিনি জানান, মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিকমুক্ত আনারস চাষ করতে গিয়ে শুরুতেই মোটা অঙ্কের ক্ষতির মুখে পড়েন তারা। এতে হতাশ হলেও দমে যাননি। রাসায়নিকমুক্ত আনারস চাষের প্রচেষ্টা চালিয়েই গেছেন। পরবর্তীতে সুফল আসতে শুরু করে। বিষমুক্ত আনারসের চাহিদা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে আনারসের অতীত ঐতিহ্য আবার ফিরে আসবে বলে আশা করছেন মধুপুরের এ চাষিরা। সমিতির অন্য সদস্যরা জানান, চাষিরা সবাই রাসায়নিকমুক্ত আনারস আবাদ করতে চান। কিন্তু ক্ষতির আশঙ্কায় অনেকে সেটা পারছেন না। ভোক্তাদের রাসায়নিকমুক্ত আনারস কিনতে উদ্বুদ্ধ করতে পারলে এবং তাদের ভালো-মন্দ আনারস চেনানোর ব্যবস্থা করা হলে রাসায়নিকমুক্ত আনারস আবাদ করা যাবে বলে তারা জানান।

চাষি ও কৃষি কর্মকর্তারা জানান, মধুপুর গড় আনারস চাষের জন্য উপযোগী। এখানকার আনারস স্বাদ ও সুমিষ্ট গন্ধের কারণে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। স্বাভাবিকভাবে আনারস গাছ থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে সেই আনারস খেতে মজাদার হয়। কিন্তু এক শ্রেণির অসাধু চাষি ও ব্যবসায়ী অধিক লাভের আশায় আনারসে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করেন। এতে আনারস বাইরে থেকে হলুদ ও লালচে রং ধারণ করে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। ক্ষেতের সব আনারস পাকেও একসঙ্গে। ফলে চাষিরা আনারসগুলো একসঙ্গে বাজারে তুলতে পারেন। আর আকর্ষণীয় রঙ হওয়ায় ক্রেতার চাহিদা বাড়ে। বিক্রি হয়ে যায় সহজে। অন্যদিকে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার না করলে আনারস ভেতরে পাকা থাকলেও বাইরে থেকে সবুজ রঙ দেখায়। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা