নাঈম খান
প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২৫ ১৩:২৮ পিএম
ঝরঝরি ঝরনা
শরতের এ সময়ে চট্টগ্রামের মিরসরাই ও সীতাকুণ্ড হয়ে ওঠে প্রকৃতির স্বর্গরাজ্য। যেখানে পাহাড় ছুঁয়ে আছে আকাশকে, আর পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসে অসংখ্য ঝরনাধারা। আকাশজুড়ে মেঘের চলাচল। লেখা ও ছবি নাঈম খান
বর্ষার শেষে সাদা সাদা টুকরো মেঘের সঙ্গে অনন্য সুন্দর নীল আকাশে শরৎ ঋতু প্রকাশিত হয় স্বমহিমায়। আর এ সময়ই যেন চট্টগ্রামের মিরসরাই ও সীতাকুণ্ড হয়ে উঠে প্রকৃতির স্বর্গরাজ্য। যেখানে পাহাড় ছুঁয়ে যায় আকাশকে, আর পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা অসংখ্য ঝরনা, মেঘেরা বিচরণ করে আকাশজুড়ে। এই অঞ্চলে যতগুলো ঝরনা, ঝিরিপথ আছে, তা গুনে শেষ করা কঠিন।

নাপিত্তাছড়া
ঢাকা ছাড়ার সময় দেখে এসেছি পরিষ্কার আকাশ। মধ্যরাতের পর কুমিল্লার সীমানা পার হতেই ঠান্ডা হাওয়া বাসের জানালা গলে ঝাপটা মারতে লাগল শরীরে। সঙ্গে বৃষ্টির ফোঁটা। খুব ভোরে যখন নয়দুয়ারি বাজারে নামলাম, ততক্ষণে পুরো মিরসরাই এলাকা বৃষ্টিতে কাকভেজা। আমাদের এবারের অভিযান এমন এক ঝরনার খোঁজে, যার খবর খুব বেশি মানুষের কাছে নেই। টিপরাখুমের পথ ধরলাম। বৃষ্টিভেজা কর্দমাক্ত গ্রামীণ পথ পেরিয়ে, ধানক্ষেত পেছনে ফেলে পুবদিকে সোজা সবুজ পাহাড়ের সারি। আমরা চলেছি সেদিকেই। পাহাড় থেকে ঝিরি নেমে এসে লোকালয়ের দিকে গেছে। টিপরাখুম থেকে সেই ঝিরি ধরে এগোতে লাগলাম আমরা। মিনিট বিশ-পঁচিশ হেঁটেই দেখা পাওয়া গেল দিনের প্রথম বিস্ময়ের। পাথরের মসৃণ দেয়াল নেমে এসেছে ঝিরিপথে। গড়িয়ে পড়ছে পানির ধারা। এর নাম ছোট নাপিত্তাছড়া ঝরনা। এর পরের গন্তব্য বান্দরখুম। যেতে হবে নাপিত্তাছড়া ঝরনা পার হয়ে। এবার খাড়া পাহাড় বাইতে হবে। নাপিত্তাছড়া ঝরনার উৎসমুখের পাশেই পাহাড় উঠে গেছে আকাশমুখী। পিচ্ছিল সে পথ ভয় ধরলেও অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ সে ভয় তাড়াল। ওপরে উঠে দেখা মিলল এ এলাকার স্কাইলাইনের। ভরা বর্ষা মৌসুম শেষ হয়েছে। কিন্তু রেশ কাটেনি। স্বভাবতই সবুজে সবুজময় চারপাশ। ট্রেইল ধরে এগোতে লাগলাম আমরা। যদিও ১০ মিনিটের মধ্যেই আবার নামতে হলো ঝিরিতে। বান্দরখুম ঝরনার রূপ শিহরন জাগানো। সেই উত্তেজনা বাকিটা পথ আচ্ছন্ন করে রাখায় পথের দূরত্ব কষ্টের কারণ হয়নি। ঝিরিতে বেশ পানি। পায়ের পাতা ছাড়িয়ে সে স্রোত মাঝেমধ্যেই উঠে আসছে হাঁটু পর্যন্ত। বেশ বড় কয়েকটি পাথর পেরোতেই খানিক দূরে গাছের ফাঁকে চোখে পড়ল বান্দরখুম ঝরনার ওপরের অংশ। সোজা আকাশের পানে উঠে যাওয়া দুই পাহাড়ের মাঝামাঝি নেমে এসেছে ঝরনাধারা। নেমে আবার নিচের পাথরে পড়ে ভাগ হয়ে গেছে তিনটি। কাছাকাছি আছে আরেকটি ঝরনা। নাম বাঘবিয়ান। এর উচ্চতা আরও বেশি। বান্দরখুম থেকে একদমই যেতে মন চাইছিল না।

সুপ্তধারা, সহস্রধারা
আমরা চলে এসেছি সীতাকুণ্ড বাজারে। সীতাকুণ্ড বাজার থেকে খুবই কাছে এ ইকোপার্ক। জনপ্রতি ২০-২৫ টাকা ভাড়া দিয়েই পৌঁছে যাওয়া যায় পার্কের গেটে। ভেতরে যাওয়ার অনুমতি নিয়ে উঁচুনিচু পিচঢালা বৃষ্টিধোয়া পথে চললাম জাগ্রত সুপ্তধারা দর্শনে। পাহাড়ি পথে এখানে সিঁড়ি করে দেওয়া হয়েছে একেবারে ঝিরিপথ পর্যন্ত। আমরা সে পথেই নেমে গেলাম ঝিরিতে। নেমেই বুঝলাম প্রকৃতিদেব আমাদের প্রতি প্রসন্ন। পানিতে টইটম্বুর ঝিরি। তার মানে সুপ্তধারায় বৃষ্টিধোয়া জলের বান ডেকেছে। বেশ কয়েকবার ঝিরি এপার-ওপার করতে হলো। জঙ্গলের পথে কিছুটা হাঁটতেও হলো। শেষের দিকে ঝিরি মোটামুটি মসৃণ। শেষ বাঁকটি ঘুরতেই প্রথম দর্শনে মাথা একেবারে ঘুরিয়ে দিল সুপ্তধারার গর্জন। পাথুরে আড়াআড়ি মঞ্চের পুরোটা জুড়ে ঢল নেমেছে। কিছুক্ষণ পর সুপ্তধারার সামনে দাঁড়িয়ে থাকাই মুশকিল হয়ে গেল। এবার সহস্রধারার পথে। এ নামে অবশ্য আরেকটি ঝরনা আছে, কাছাকাছি অঞ্চলেই। সহস্রধারা দুই নামে পরিচিত। ভরা বর্ষার স্পর্শ পেয়ে সে তোড়জোড় শুরু করেছে। ঢাকা থেকে এলে সীতাকুণ্ড বাজারে নামাই ভালো। সীতাকুণ্ড-মিরসরাই অঞ্চলে আছে অসাধারণ কিছু ঝরনাধারা। এ অঞ্চলের অন্যতম সুবিধা হলো দিনে দিনেই এসব ঝরনার বেশ কয়েকটি দেখে ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামে ফিরতে পারবেন।

খৈয়াছড়া ঝরনা
সীতাকুণ্ড-মিরসরাই জোনের সবচেয়ে জনপ্রিয় গন্তব্য খৈয়াছড়া ঝরনা। ঢাকা থেকে গেলে চট্টগ্রামগামী যেকোনো বাসে মিরসরাই বাজারের আগে বড়তাকিয়া বাজারে নেমে যে কাউকে জিজ্ঞেস করলে দেখিয়ে দেবে খৈয়াছড়া যাওয়ার রাস্তা।
সুপ্তধারা-সহস্রধারা-১ ট্রেইল
সীতাকুণ্ড ইকোপার্কের ভেতরে আছে অসাধারণ দুটি ঝরনা সহস্রধারা ও সুপ্তধারা। ২০ টাকা দিয়ে পার্কের টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকে দিকনির্দেশক চিহ্ন ধরে হাঁটলে পেয়ে যাবেন ঝরনা দুটি।
সহস্রধারা-২ (মূল সহস্রধারা) ট্রেইল
ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী যেকোনো বাসে সীতাকুণ্ডের ছোট দারোগারহাট বাজারে নামতে হবে। সেখান থেকে সাইনবোর্ড নির্দেশিত পথে পুবদিকে যেতে হবে।
বড় কমলদহ ঝরনা
সেখানে যেতে হলে আসতে হবে বড় দারোগারহাট বাজারে। সেখান থেকে পুবদিকের পথ ধরতে হবে।
বোয়াইল্যা বাউশ্যা ট্রেইল
এই ট্রেইলটি হলো মিরসরাই সীতাকুণ্ড অঞ্চলের সবচেয়ে সুন্দর ট্রেইল। এই ট্রেইলে আছে বোয়াইল্যা বাউশ্যা অমরমানিক্য ঝরনা। এই রুটে মোট তিনটি ঝরনা। এ ছাড়া আছে ন হাইত্যে কুম এবং উঠান ঢাল। এই ট্রেইলটা এককথায় অপূর্ব ও অতুলনীয়।
যেভাবে যাবেন : প্রথমে নামবেন মিরসরাই বাজার। মিরসরাই কলেজ রোড থেকে ব্র্যাক পোল্ট্রি ফিড পর্যন্ত যাওয়ার সিএনজি পাবেন। ওখানে নেমে পূর্বদিকে হাঁটা ধরবেন।
বাড়বকুণ্ড ট্রেইল
এ ট্রেইলে আছে চারপাশে পাহাড়ঘেরা বহু পুরোনো কালভৈরবী মন্দির। এখানে আছে বাংলাদেশের একমাত্র গরম পানির ঝরনা। বাসে সীতাকুণ্ডের বাড়ববকু বাজারে নামতে হবে। এরপর পুবদিকের রাস্তা ধরে ১ ঘণ্টার মতো হাঁটলেই কালভৈরবী মন্দির পেয়ে যাবেন। বাকি পথ ছড়া ধরে গেলেই হবে।
হরিণমারা-হাঁটুভাঙা-সর্পপ্রপাত ট্রেইল
অসাধারণ এ ট্রেইলে আছে চমৎকার নীলাম্বর হ্রদ। পরপর পাবেন চারটি ঝরনা। হরিণমারা ঝরনা, হাঁটুভাঙা ঝরনা, বাওয়াছড়ার মুখ ও সর্পপ্রপাত। সীতাকুণ্ডের আগে ছোট কমলদহ বাইপাসের শুরুতে নেমে পুবদিকে হাঁটা শুরু করলে একসময় পথই আপনাকে নিয়ে যাবে অনিন্দ্যসুন্দর এসব জায়গায়।