গোলাম কিবরিয়া
প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২৫ ১৩:১৮ পিএম
‘এআই কি সত্যিই মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে?’ ‘যে ছবিটা দেখছি, সেটা বাস্তব নাকি এআইয়ের কৃত্রিম সৃষ্টি?’ ‘এআই ব্যবহার করতে গিয়ে আমার ব্যক্তিগত তথ্যই কি সে সংগ্রহ করছে না?’ এমন নানা প্রশ্ন এখন প্রায় সবার মাথায় ঘুরছে। উত্তর খুঁজতে অনেকেই যাচ্ছেন চ্যাটজিপিটির মতো প্লাটফর্মে। কিন্তু সেটাও তো এআইয়েরই আরেক সংস্করণ!
আসলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence : AI) নতুন কোনো বিষয় নয়। এর সূত্রপাত হয়েছিল বহু আগে। ১৯৫০ সালে বিজ্ঞানী অ্যালান টুরিং প্রথম ধারণা দিয়েছিলেন, ‘একদিন মেশিনও মানুষের মতো ভাবতে, যুক্তি করতে ও সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।’ সেই ভবিষ্যদ্বাণী থেকেই এআই গবেষণার যাত্রা শুরু। তবে আজ প্রশ্ন হচ্ছে- এই প্রযুক্তি আমাদের জীবনে কতটা বদল আনবে? আগত বিপ্লবী পরিবর্তনের জন্য আমরা কতটা প্রস্তুত? আর প্রস্তুতি নেওয়ার পথটাই বা কেমন হওয়া উচিত?
এআই যখন পড়াশোনার বিষয়
গণিত বা পরিসংখ্যানে উচ্চতর ডিগ্রি নিলেও এআই-কেন্দ্রিক পড়াশোনার পথ খোলা। কারণ এআই কেবল সফটওয়্যারেই সীমাবদ্ধ নয়; এর ব্যবহারিক দিক রোবোটিকস, ইলেকট্রনিকস, আইওটি (Internet of Things), কিংবা স্মার্ট প্রযুক্তির সঙ্গেও নিবিড়ভাবে জড়িত। তাই তড়িৎ প্রকৌশল থেকে শুরু করে কম্পিউটার বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরাও এ খাতে এগিয়ে যেতে পারেন। বিশেষ করে যাদের অঙ্কে ভালো দখল আছে, পাশাপাশি জাভা, সি++ বা পাইথনের মতো প্রোগ্রামিং ভাষায় দক্ষতা রয়েছে- তারা নিঃসন্দেহে বাড়তি সুবিধা পাবেন।
বিশ্বজুড়ে এখন এআই শিক্ষার বিস্তৃত ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। ডেটা সায়েন্স থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-ভিত্তিক নানা বিষয়ের ওপর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি চালু করেছে অনেক নামকরা প্রতিষ্ঠান। স্ট্যানফোর্ড, বার্মিংহাম, কার্নেগি মেলন কিংবা এমআইটি- সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়েই এআই শেখার জন্য আলাদা কোর্স ও প্রোগ্রাম রয়েছে।
বাংলাদেশেও এআই শিক্ষার প্রসার ঘটছে। প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রমে বিষয়টি ইতোমধ্যেই গুরুত্ব পাচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা ব্যক্তিগতভাবে গবেষণা বা প্রজেক্টে এআই প্রয়োগের চেষ্টা করছেন। ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ডেটা সায়েন্সে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম চালু করেছে, আর ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি দিয়েছে এআই-তে ‘মেজর’ করার সুযোগ। এক কথায়, এখন এআই পড়াশোনা আর বিলাসিতা নয়, সময়ের দাবি। চিকিৎসা, প্রকৌশল কিংবা বৈজ্ঞানিক গবেষণাÑ সব ক্ষেত্রেই এআই যেমন জরুরি হয়ে উঠছে, তেমনি এর প্রভাব পড়ছে সমুদ্র অভিযানে থেকে মহাকাশ গবেষণাতেও।
ক্যারিয়ারের দিক থেকেও এআই নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে। কিছু কাজ হয়তো অটোমেশনের কারণে কমে যাবে, কিন্তু তার চেয়েও অনেক বেশি নতুন পেশা তৈরি হবে। ডেটা বিশ্লেষণ, মেশিন লার্নিং, এআই প্রোডাক্ট ম্যানেজমেন্ট কিংবা প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং- এসব ক্ষেত্রে দক্ষ মানুষের চাহিদা প্রতিদিনই বাড়ছে। বাংলাদেশেও শিগগিরই সেই চাহিদা প্রকট হয়ে উঠবে।
তাই শিক্ষার্থীদের এখন থেকেই নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। শুধু প্রযুক্তি শেখা নয়, এআই ব্যবহার করে সৃজনশীল সমস্যা সমাধান করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। একইভাবে কর্মজীবী মানুষেরও দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং এটি হতে পারে আমাদের সহযাত্রী। যারা এআই বুঝে কাজে লাগাতে পারবে, ভবিষ্যৎ মূলত তাদের হাতেই থাকবে। তাই প্রস্তুতি নিন, নতুন প্রযুক্তিকে সঙ্গী করে আগামী দিনের পথে হাঁটুন।
চাকরির বাজার কেমন
ধীরে হলেও দেশের নানা পর্যায়ে এআই-সংশ্লিষ্ট চাকরির চাহিদা বাড়ছে। উদ্যোক্তা পর্যায়ে অনেকে কাজ করছেন। অনেকে নিজেদের প্রতিষ্ঠান খুলছেন। বিভিন্ন খাতে নতুন করে সফটওয়্যার প্রকৌশলীদের চাহিদা বেড়েছে। বিশেষ করে পুরনো সফটওয়্যারগুলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আওতায় আনতে সংশ্লিষ্ট এআই, এমএল, ডেটা সায়েন্স প্রকৌশলীদের চাহিদা বেড়েছে। পড়ালেখা, গবেষণা, প্রকল্পে কাজ করাসহ নানা ক্ষেত্রে এআই-সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা থাকলে এখন দেশের বাইরে বৃত্তি বা তহবিল পেতেও সুবিধা হচ্ছে বলে জানালেন প্রকৌশলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
পরীক্ষার প্রস্তুতিতে এআই ব্যবহার
সঠিকভাবে ব্যবহার করা হলে এআই পড়াশোনার সময় কার্যকর সহকারী হতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, এআই সব সময় নির্ভুল তথ্য দেয় না। আর তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্দেশনা অনুযায়ী পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হবে। সেমিস্টারের শেষ দিকে অনেক শিক্ষার্থীকে বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ বা গবেষণাপত্র জমা দিতে হয়। এসব লেখায় কাঠামো, যুক্তি ও তথ্যসূত্র গুরুত্বপূর্ণ। এআই টুল ব্যবহার করে সহজেই প্রবন্ধের খসড়া, বিষয়ভিত্তিক লেখা কিংবা গবেষণার ধারণা পাওয়া যায়। পরীক্ষার প্রস্তুতির বড় একটি অংশ হলো নোট থেকে প্রাসঙ্গিক তথ্য খুঁজে বের করা। চাইলে ব্যবহারকারী তার নিজের নোট এআই চ্যাটবটে দিয়ে সংক্ষেপে সাজিয়ে নিতে পারেন। এতে সময় বাঁচে আর গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো আলাদা করে সহজে পড়া যায়। বিভিন্ন এআই টুলের মাধ্যমে সহজেই বিভিন্ন বিষয় পডকাস্টের মতো করে শোনা সম্ভব।
এমনকি দুটি এআই চরিত্রের কথোপকথনের মাধ্যমে পড়ার বিষয়গুলো ব্যাখ্যাও করে নেওয়া যায়। ফলে হাঁটার সময় বা দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে পডকাস্ট শুনে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব। অনেক সময় বারবার পড়ার পরও নির্দিষ্ট বিষয় সহজে বোঝা যায় না। এসব ক্ষেত্রে এআই চ্যাটবট ব্যবহার করে বিষয়টি সহজ ভাষায় বুঝে নেওয়া যায়। বর্তমান এআই টুলগুলো লেখা ছাড়াও ছবি ও চার্ট তৈরিতেও পারদর্শী। জিপিটি-৪ সংস্করণে চ্যাটজিপিটির ভিজ্যুয়াল প্রসেসিং ক্ষমতা আরও উন্নত হয়েছে। এটি ডেটা থেকে চার্ট, ফ্লোচার্ট বা অন্যান্য গ্রাফিক উপস্থাপন তৈরি করতে পারে; যা অনেক জটিল বিষয় সহজ করে বুঝতে সহায়তা করে। পরীক্ষার আগে নিজেকে যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এআই ব্যবহার করে ব্যবহারকারী ফ্ল্যাশকার্ড, কুইজ কিংবা প্রশ্নোত্তর অনুশীলনের মাধ্যমে তার প্রস্তুতি কতটা কার্যকর হয়েছে, তা পরখ করে নিতে পারেন।
শিক্ষার্থীরা যা ভাবছেন
এআই নিয়ে কাজ করে কদিন আগেও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়েছেন মাহাদির ইসলাম। বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজের এই শিক্ষার্থী জানালেন, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে কাজ শুরু করেন।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) সফটওয়্যার প্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘শাবিপ্রবির সফটওয়্যার প্রকৌশল বিভাগে এআই-সংশ্লিষ্ট তিনটি কোর্স পড়ানো হয়। শিক্ষকদের নির্দেশনাগুলো আমাদের সাহায্য করেছে। তারা সব সময় খুব উৎসাহ দেন।’
মাহাদির বললেন, ‘আমি প্রতিনিয়ত বিভিন্ন রিসোর্স থেকে জ্ঞান অর্জন করেছি। আন্তর্জাতিক মানের কোর্স করেছি, গবেষণাপত্র লিখেছি। সেগুলো বিভিন্ন ফোরামে উপস্থাপন করেছি। দেশের বাইরে ও দেশের ভেতরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের সঙ্গে কাজ করেছি। তাদের থেকে শিখেছি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা এবং কাজের মাধ্যমে আমি এআইয়ের বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কে জেনেছি।’