শরীফ স্বাধীন
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২৫ ১১:৪৭ এএম
গত কয়েক বছরে পশুর দানাদার খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় হাইব্রিড জাতীয় ঘাসের চাহিদা বেড়েছে। সব ধরনের খাদ্য ওজনে বিক্রি হলেও গো-খাদ্য নেপিয়ার ঘাস ওজনে বিক্রি শুরু হয় জেলায় এ বছরই প্রথম। মাগুরা পৌরসভার চোপদার পাড়ার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা পারভিন আক্তার (৪৫) ও স্বামী মো. জাফর মোল্ল্যা (৫০)। পারভিন আক্তার একই গ্রামের মুন্সিপাড়া মাঠে দুই বিঘা জমিতে উন্নত জাতের নেপিয়ার ও রেড নেপিয়ার ঘাস লাগিয়ে সাড়া ফেলেছেন। অভাবের সংসারে ঘাস লাগিয়ে ভাগ্য বদল করেছেন তিনি। পারভিন মনে করেন, নেপিয়ার ঘাস আঁটি হিসেবে আগে বিক্রি করে তেমন লাভ হয়নি কিন্তু ওজনে বিক্রি করে লাভের টাকায় হয়েছেন স্বাবলম্বী। ঘাসের টাকায় কিনেছেন জমি, বেড়ার ঘরের জায়গায় হয়েছে পাকা বাড়ি, গরুর খামার এবং সেই সঙ্গে হয়েছে বেশ কয়েকটা ব্যাটারিচালিত ভ্যান। আশপাশের কৃষকরাও আসেন পারভিন আক্তারের খোঁজে। ভালো বীজ আর ঘাসের বোগ কোথায় পাওয়া যাবে জানতে।
প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলায় গরুর খামারির সংখ্যা ৭৮৬টি, ছাগল পালন খামার ৪১১টি, ঘাস চাষে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে ৩০ জন করে ৫৯ ব্যাচে ১৭৭০ জনকে। নেপিয়ার, রেড নেপিয়ার ও পাকচং এই তিন ধরনের ঘাস চাষের জমির পরিমাণ ১০৯ হেক্টর। চাষির সংখ্যা ১২১৪ জন। দিনে গরুর কাঁচা ঘাসের চাহিদা ১৫ থেকে ১৮ কেজি। গরুপ্রতি ঘাস উৎপাদনে জমি প্রয়োজন হয় ৫ থেকে ৭ শতক।
সরেজমিন মাঠে গিয়ে দেখা যায়, পারভিন আক্তার নেপিয়ার ঘাস কেটে আটি বেঁধে ডিজিটাল স্কেলে ওজন দিয়ে বিক্রি করছেন। শহরের আশপাশে অনেক চাষের উপযোগী জমি পড়ে থাকে। ২০১৯ সালে বিঘাপ্রতি আট হাজার টাকায় দুই বিঘা জমি বছরে ১৬ হাজার টাকা দিয়ে ঘাস লাগানো শুরু করেন পারভিন। প্রথম বছর ৮০ শতক জমিতে ঘাস লাগানো থেকে বিক্রি পর্যন্ত ৩০ হাজার টাকা ব্যয় করেন। ঘাসের বোগ লাগানোর ৪০ দিন পরে ঘাস কাটার উপযুক্ত হয়। ঘাসের বোগ প্রথমবার লাগালে ৪০ দিন পর থেকে ১৫ দিন পর পর তিন বছর পর্যন্ত ঘাস কেটে বাজারে বিক্রি করা যায়। বাজারে এক কেজি ঘাস ১০ থেকে ১২ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়। এক বিঘা জমিতে বছরে ৪৫০ থেকে ৪৭০ মণ নেপিয়ার ঘাস সংগ্রহ করা যায়।
ঘাস কিনতে আসা কাদের মোল্যা বলেন, ৮ টাকা কেজি দরে এক আঁটি ৪৫ থেকে ৫০ টাকায় কিনি। গো-খাদ্য ব্যবসায়ী বেলাল শেখ বলেন, আমার দোকানে গরুর সব খাবার আছে। তারপরও এই নেপিয়ার ঘাসের চাহিদা বেশি। গরু পালতে যত দামি আর ভালো খাবার দেওয়া হোক না কেন কাঁচা ঘাস লাগবেই।

পারভিন আক্তার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমার গরু ঘাসের অভাবে নানা রোগ-ব্যায়রাম হইতো। পশু হাসপাতালে নিয়ে গিলি ডাক্তার কয়ডা বড়ি দিয়ে নেপিয়ার ঘাস লাগাতি কয়। এই ঘাস খাওয়ালি গরুর রোগ-ব্যারাম ভালো হয়ে মোটা-তাজা হবি। ডাক্তারের এই কতা আমার মনে ধরে। পরে ধার-দেনা কইরে তিন বছর আগে নেপিয়ার ও রেড নেপিয়ার ঘাসের বোগ জুগাড় করে জমিতে লাগায়। ৪০ দিনের মধ্যে দেখতি দেখতি বড় হয়ে গেল। ৩০টা বোগে এক আঁটি করে বাইন্ধে ২০ টাকা দরে বিক্রি করে সেই রকম লাভ হইলো না। এ বছর জানতি পাল্লাম অন্য জেলার কিছু কিছু জায়গায় এই ঘাস ঢাকার মহাজনদের কাছে ওজনে বিক্রি করে। মহাজনরা এক কেজি ১০-১২ টাকায় কিনে ঢাকায় ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি করে। আমিও শুরু করি কেজিতে ঘাস বিক্রি। এখন এক আঁটি নেপিয়ার ঘাস চল্লিশ, পঞ্চাশ টাকায় জমি থেকেই কিনে নিয়ে যায় স্থানীয় খামারিরা। বছরে আমার খরচ বাদে তিন-চার লাখ টাকা আয় হয়। আর গরু এই ঘাস খাইয়ে তাড়াতাড়ি বাইড়ে যায়। বছর শেষে গরু ব্যাচা-কেনা করে দেড় দুই লাখ টাকা আয় আসে। জমি কিনিছি, নতুন পাকা ঘর করিছি আর কতো। এই নেপিয়ার ঘাসেই আমার সুদিন ফিরিছে। আমার দুই ছেলেমেয়ে। টাকা খরচ করে মেয়ের ভালো জায়গায় বিয়ে দিছি। চারটা ভ্যান রাস্তায় চলে, সেগুলো ছেলে দেখে।’
পারভিনের স্বামী মো. জাফর মোল্যা বলেন, ‘অভাবের সংসার ছিল। হাটের দিন ত্যাল-চাইল কিনতে জানের ওপর উঠে যাইতো। এহন মনে চালি ভালো-মন্দো খাতি পারি। আগে অনেক কিছু কল্লিউ অভাব কাটাতি পারিনি। অভাব কাটিছে এই ঘাস লাগায়ে। আমার বাড়িয়ালী আরও জমি লিজ নেবে ঘাস লাগানোর জন্নি। বাড়িয়ালী আর আমার সারা দিন কাইটে যায় এই ঘাসের জমিতি।’
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মিহির কান্তি বিশ্বাস প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, গরু-ছাগল পালনে যে চারণভূমি থাকা প্রয়োজন। এই চারণভূমি না থাকায় দানাদার খাদ্য দিয়ে কিছুটা চাহিদা পূরণে করা হচ্ছিল। বর্তমানে গো-খাদ্যের দাম বৃদ্ধিতে খামারিরা আবার সেই কাঁচা ঘাসের দিকে ঝুঁকছে। আমরা গো-খাদ্যের চাহিদা পূরণে এবং কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে হাইব্রিড জাতীয় ঘাসের প্রশিক্ষণ ও উৎপাদনের ওপর জোর দিয়েছি।