× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

টেকসই বিশ্বের জন্য প্রাকৃতিক রঙ

শেখ সাইফুর রহমান

প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০২৫ ১৪:১১ পিএম

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২৫ ১৪:১২ পিএম

টেকসই বিশ্বের জন্য প্রাকৃতিক রঙ

প্রকৃতি সব সময়ই মানুষের জন্য অকৃপণ। আমরাই বরং সভ্যতাগর্বী হয়ে উপেক্ষা করি সে দান। অথচ আজকের প্রেক্ষাপটে টেকসই বিশ্বের জন্য মানুষ পুনরায় ফিরতে চাইছে প্রকৃতির কাছে। আত্মসমর্পণ করে হতে চাইছে নির্ভার। প্রাকৃতিক রঙ ব্যবহারের আন্দোলন তারই উদাহরণ। লিখেছেন শেখ সাইফুর রহমান

খ্রিস্টপূর্ব হাজার বছর আগে এই বাংলায় তখন মসলিন বোনা হচ্ছে। সেই মসলিন রাঙানো হচ্ছে প্রাকৃতিক নীলে। মিসরে তখন ফারাওদের রাজত্ব। ফারাওরা আবার সেই কাপড় তাদের দেশে আমদানি করছে। কারণ মরার পর তাদের মৃতদেহ মমিতে রূপান্তরের জন্য নীল কাপড় তাদের প্রয়োজন হতো। আর নীল রঙ ফারাওদের কাছে ছিল পূত-পবিত্র। এখানে একটু বলে রাখা প্রয়োজন, মসলিন সেই সময়ে এই বাংলায় বোনা হতো, ওই বাংলায় নয়। কারণ ফুটি কার্পাস এই বাংলাতেই ব্যাপক আকারে চাষ হতো। ওই বাংলায় হতো না। অন্যদিকে নীল বেশি জন্মাত এই বাংলায়, ওই বাংলায় নয়; ওখানে অল্প কিছু জায়গায় নীল চাষ হতো। 

ফলে এখানকার মসলিন নীলে রাঙানোটাই স্বাভাবিক। স্বাভাবিক সেই কাপড় দেশে ব্যবহার করার কিংবা বিদেশে রপ্তানি হওয়ার। তবে মিসরের ফারাওদের মমিতে যে নীল রঙের মসলিন ব্যবহার করা হতো, সেটা ইতিহাসবিদরা স্বীকার করেছেন। যদিও সেটা ইন্ডিয়ান টেক্সটাইল হিসেবে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। সে প্রসঙ্গের অবতারণা অন্য কোন সময়ে করা যাবে। কারণ আজকের বিষয় অন্য। অতএব আমরা সেদিকে পা বাড়াই। তবে ওপরের প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করার অভিপ্রায় যথাসময়ে খোলাসা করা হবে।

গবেষকরা বলছেন, মানুষের সৃজনশীলতার প্রাথমিক প্রকাশ প্রায় ৭৫ হাজার বছর আগে ঘটেছিল। তখন তারা খাদ্য আহরণ ও জীবিকা নির্বাহের জন্য বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম তৈরি করত। পরে ৭০০০ থেকে ২০০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দের মধ্যে মানুষ বস্ত্র বুননে দক্ষতা অর্জন করে, যা মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রায় এক বিশাল পদক্ষেপ ছিল। নিজেদের তৈরি কাপড় দিয়ে কেবল লজ্জা ঢাকাই নয়, মানুষের মধ্যে নান্দনিকতাবোধও জন্ম নেয়। ফল, শিকড়, বাকল এবং পাতার রস দিয়ে কাপড় রাঙানোর শিল্প তারা প্রথাগতভাবে চালিয়ে যায়।

প্রকৃতি যুগ যুগ ধরে মানুষের কল্যাণে অকৃত্রিম ভূমিকা পালন করেছে। হাজার বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষরাই কাপড় রাঙানোর পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন, যা ছিল নিজের সৌন্দর্য প্রকাশের এক মাধ্যম। এই শিল্প তখন থেকে মানুষকে সুন্দর করে উপস্থাপনের আকাঙ্ক্ষা জাগিয়েছে। সময়ের সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান উন্নতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়েছে সভ্যতা। সমান্তরালে মানুষের সৌন্দর্যবোধ এবং নিজেকে সুন্দর করে উপস্থাপনের আকাঙ্ক্ষা আজও অপরিবর্তিত রয়েছে। প্রকৃতির উপকরণ দিয়ে রঙ করার ঐতিহ্য ক্রমে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে মিশে নতুন রূপ নিয়েছে, তবে মানুষের রঙিন হয়ে ওঠার অভিলাষ আজও আগের মতোই প্রবল ও অবিকল।

মানুষের রঙ ব্যবহারের ইতিহাস সুদীর্ঘ ও বর্ণময়। খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০ সালে চীনেই পাওয়া যায় প্রথম রঙ ব্যবহারের প্রমাণ। এরপর রোমান, বাইজেন্টাইন, মিসর, মায়া, অ্যাজটেকÑ সব সভ্যতাই নিজেদের পোশাক, ঘর, দেয়াল এমনকি শরীরও রাঙিয়েছে প্রাকৃতিক উৎসের রঙে। ম্যাডার থেকে লাল, ইন্ডিগো থেকে নীল, কোচিনীল পতঙ্গ থেকে উজ্জ্বল লাল আর মুরেক্স শামুক থেকে পাওয়া ইম্পেরিয়াল পার্পলÑ প্রতিটি রঙই ছিল মর্যাদা ও ঐতিহ্যের প্রতীক। কখনও তা ছিল শোকের চিহ্ন, কখনও রাজকীয় ক্ষমতার প্রতীক, আবার কখনও আত্মরক্ষার রঙিন আবরণ।

প্রকৃতি থেকে দূরে, বিজ্ঞানের পথে

১৮৫৬ সালের আগে পৃথিবীর সব রঙই ছিল প্রকৃতির দান। সেই বছর আঠারো বছরের ছাত্র উইলিয়াম পারকিন কুইনিন তৈরি করতে গিয়ে কাকতালীয়ভাবে পান এক লালাভ-নীল দ্রবণ; যা পরে ‘মভ’ নামে পরিচিত হয়। এ আবিষ্কার বদলে দেয় রঙের ইতিহাসÑ প্রাকৃতিক উৎসের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে শিল্প বিপ্লবের গতিতে এগিয়ে যায় রঙের জগৎ।

রঙের সঙ্গে মানুষের অবিচ্ছেদ্য বন্ধন

গুহাচিত্র থেকে শুরু করে অজন্তা-ইলোরার ফ্রেসকো, তাজমহলের কারুকাজ থেকে মমির পোশাকে লুকিয়ে থাকা নীল রঙ- সবই প্রমাণ করে সৌন্দর্যের প্রতি মানুষের সহজাত টান। রঙ শুধু সাজসজ্জা নয়, সংস্কৃতি, ধর্ম, শোক, শক্তি সবকিছুরই বহিঃপ্রকাশ।

ফিরে আসার ডাক

যদিও কৃত্রিম রঙ শিল্প ও বাণিজ্যে বিপ্লব ঘটিয়েছে, তবু এর বিষাক্ত বর্জ্য পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই আজ মানুষ আবার প্রকৃতির কোলে ফিরে যেতে চাইছে। চিকিৎসা, প্রসাধন, এমনকি ফ্যাশনেও দেখা যাচ্ছে প্রাকৃতিক ও পরিবেশবান্ধব রঙের পুনর্জাগরণ।

প্রশ্নের মুখে ভবিষ্যৎ

প্রাকৃতিক রঙের উৎপাদন কি কৃত্রিম রঙের মতো সস্তা ও ব্যাপক হতে পারবে? বাজারে কি প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখা সম্ভব? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরেই নির্ধারিত হবে প্রাকৃতিক রঙের ভবিষ্যৎ আর ঠিক হবে আমাদের পৃথিবী কতটা ‘সবুজ’, ‘টেকসই’ আর ‘রঙিন’ হয়ে উঠবে।

ফ্যাশনে সবুজ বিপ্লবের সম্ভাবনা

এতক্ষণে নিশ্চয়ই পাঠক অনুধাবন করতে পেরেছেন আমাদের মূল প্রতিপাদ্য প্রাকৃতিক রঙ নিয়ে। একই সঙ্গে ভূমিকায় বাংলাদেশের মসলিন ও প্রাকৃতিক নীলের উল্লেখের কারণও আপনাদের বোধগম্য হয়েছে। তবে বর্তমানের দিকে তাকালে উপেক্ষার উপায় নেই যে, ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম দূষণকারী শিল্প হিসেবে। কৃত্রিম রঙের রাসায়নিক বর্জ্য শুধু নদী-খাল দূষিত করছে না, বরং মানুষের স্বাস্থ্যকেও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এই প্রেক্ষাপটে ন্যাচারাল ডাই বা প্রাকৃতিক রঙ আবার ফিরে আসছে নতুনরূপে- টেকসই, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে।

প্রাকৃতিক রঙ কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ

প্রাকৃতিক রঙ হলো উদ্ভিদ, খনিজ বা প্রাণিজ উৎস থেকে প্রাপ্ত রঙ। ইন্ডিগো গাছের পাতা থেকে নীল, ডালিমের খোসা থেকে হলুদাভ-বাদামি, কোচিনীল পোকা থেকে লাল রঙ পাওয়া যায়। 

বিশ্বব্যাপী ‘সাসটেইনেবল ফ্যাশন’-এর অংশ হিসেবে প্রাকৃতিক রঙ জনপ্রিয় হচ্ছে কারণÑ ১. উৎপাদনে কম কার্বন ফুটপ্রিন্ট, ২. রাসায়নিক দূষণ প্রায় শূন্য, ৩. জীবাণু বিয়োজ্য ও স্বাস্থ্যবান্ধব, ৪. স্থানীয় কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে সহায়তা। 

বাজারে চাহিদা ও ধরন

বিশ্বব্যাপী রঙের বাজারে কৃত্রিম রঙের অবস্থান যে জোরালো তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এর অংশ ৮৫ শতাংশ। ডাই মার্কেটের আকার ২০২৪ সালে ছিল প্রায় ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের। যেখানের মধ্যে প্রাকৃতিক রঙের বাজার ছিল ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই বাজার ছোট হলেও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে আর সেটা বছরে প্রায় ৮-১০% হারে। ২০৩৪ সালে সেটা গিয়ে দাঁড়াবে ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। 

রঙের ধরন

সাধারণভাবে রঙকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। 

প্রাকৃতিক রঙ : উদ্ভিদ, খনিজ বা প্রাণিজ উৎস থেকে প্রাপ্ত।

কৃত্রিম রঙ : কৃত্রিম রাসায়নিক উপাদান দিয়ে তৈরি যেমনÑ অ্যাজো ডাই, রিয়্যাক্টিভ ডাই।

মিশ্র বা সেমি সিনথেটিক ডাই: প্রাকৃতিক উপাদান ও রাসায়নিকের মিশ্রণ। 

প্রাকৃতিক রঙের ভেতরেও রয়েছে উদ্ভিজ্জ রঙ (যেমন : নীল বা ইন্ডিগো, হলুদ), প্রাণিজ রঙ (যেমন : কোচিনীল পোকা, মুরেক্স), আর খনিজ (যেমন : আয়রন অক্সাইড)।

যেসব কাপড় প্রাকৃতিক রঙের জন্য উপযুক্ত

প্রাকৃতিক রঙ মূলত প্রোটিন ফাইবার ও সেলুলোজ ফাইবারে ভালোভাবে কাজ করে। প্রোটিন ফাইবার; যেমন : সিল্ক, উল। আর সেলুলোজ ফাইবার; যেমন : সুতি, লিনেন, হেম্প। তবে সিনথেটিক ফাইবারে (পলিয়েস্টার বা নাইলন) প্রাকৃতিক রঙ সহজে স্থায়ী হয় না।

তবে অনেক সময় প্রাকৃতিক রঙ অনেক বেশি দিন স্থায়ী হয় না। এজন্য রঙকে টেকসই করার মাধ্যম হিসাবে প্রয়োজন পড়ে অন্য একটি বস্তুর; যেটাকে বলা হয়ে থাকে মরড্যান্ড। ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এই মরড্যান্ড ব্যবহারের কৌশল আবিষ্কার হওয়ায় প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার নতুন মাত্রা পায়। এই মরড্যান্ড সুতা আর রঙের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় রঙ শোষিত হতে সাহায্য করে। জানা যায়, মিসরে মরড্যান্ড হিসেবে ব্যবহৃত হতো খনিজ লবণ।

প্রাকৃতিক রঙের পুনর্ব্যবহার

সেটাও বেশি দিন নয়। ২০০৭ সালে ইউনেস্কো উদযাপন করেছে প্রাকৃতিক রঙ পুনর্ব্যবহারের ৫০ বছর। আর সে বছরই বাংলাদেশে বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদ উদযাপন করে ২৫ বছর। সে বছরের ৫-১২ নভেম্বর ভারতের হায়দরাবাদে ইউনেস্কোর উদ্যোগে ১৩ দেশের অংশগ্রহণে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সিম্পোজিয়ামে ‘ইন্ডিগো : দ্য ম্যাজিক্যাল ব্লু অব বেঙ্গল’ শিরোনামে নিবন্ধ উপস্থাপন করেছিলেন প্রয়াত রুবী গজনবী। বাংলাদেশে প্রাকৃতিক রঙকে পরিচিত ও জনপ্রিয় করার আন্দোলনে তিনি রেখেছেন অনুসরণীয় ভূমিকা। এখানে একটা বিষয়ের উল্লেখ প্রয়োজন, প্রাকৃতিক রঙের পুনর্ব্যবহার শুরু হয়েছিল এই ভারতীয় উপমহাদেশেই। যেখানে ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি বাংলাদেশ সেই আশির দশক থেকেই নীল চাষ শুরু করে। প্রথমে এগিয়ে আসে মেনোনাইট সেন্ট্রাল কমিটি (এমসিসি) নামের একটি এনজিও। মুক্তাগাছায় তারা চাষা শুরু করে। প্রথম দিকে তাদের অনেক প্রতিরোধের মুখে পড়ে হয়। কারণ নীল বিদ্রোহের কথা আমরা সবাই জানি। নীল ক্ষতিকারক নয়। কিন্তু ব্রিটিশদের অত্যাচারের কারণে নীল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা ছিল সাধারণ মানুষের মধ্যে। 

যাহোক পরবর্তী সময়ে কেয়ার বাংলাদেশের ‘প্রকল্প লিভিং ব্লু’ নীল চাষ ও বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের প্রাকৃতিক নীল উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এরপর এই ধারায় যোগ হয় ফ্রেন্ডশিপ কালার্স অব চরস। লিভিং ব্লু এখন ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। আনওয়ারুল হক এটা পরিচালনা করে থাকেন। 

এখানে একটা তথ্য দিয়ে রাখি, বেঙ্গল ইন্ডিগোর সুনাম একসময়ে ছিল বিশ্বজোড়া। এখনও সেটা অক্ষুণ্ন আছে। ফলে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক নীলের চাহিদা প্রচুর। বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ হওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন সঠিক ও সময়োপযোগী ব্র্যান্ডিং এবং নীলের জিআই সনদ দেওয়া। 

প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ : ঘটমান বর্তমান ও সম্ভাবনার ভবিষ্যৎ

রঙের গল্প বলতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হয় উপমহাদেশের সোনালি অতীতে, যখন মসলিন ছিল বিশ্ব এলিট শ্রেণির গর্ব, আর জামদানির নকশা ছিল শিল্পের শিখরে। মুঘল পৃষ্ঠপোষকতায় বয়ন ও প্রিন্টে এসেছিল উৎকর্ষ, পরে ইউরোপীয় সমর্থনে তা পায় বাণিজ্যের গতি। উনবিংশ শতকে রংপুর ও দিনাজপুরে পাওয়া যায় সুতা রাঙানোর (ইয়ার্ন ডায়িং) প্রমাণ; যা উল্লেখ করেছেন বুকানন হ্যামিলটন। তবে বাংলাদেশের আসল খ্যাতি প্রিন্টেড কাপড়ে নয়, বাংলার তাঁতের জন্যই।

কৃত্রিম রঙের আবিষ্কারের পর প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার প্রায় বিলীন হলেও উপজাতি গোষ্ঠী ও দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অঞ্চলে তা টিকে ছিল। ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা দুই দশকের গবেষণায় হারানো এই শিল্প পুনরুদ্ধারে সাফল্য পান। বাংলাদেশে এই চর্চা শুরু হয় ১৯৮২ সালে, বিসিকের ভেষজ রঙের গবেষণা প্রকল্পের মাধ্যমে। উদ্দেশ্য ছিলÑ রঙ উৎপাদক গাছ চিহ্নিত করা, স্থানীয় উৎস থেকে রঙ তৈরি এবং তাঁতি ও রঙকারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া। এই উদ্যোগে নেতৃত্ব দেন বিসিকের তদানীন্তন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সিরাজুদ্দিন ও ‘অরণ্য ক্রাফট’-এর রুবী গজনবী (কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণায় তিনি এই পথে এসেছিলেন)। পরিতাপের বিষয় মোহাম্মদ সিরাজুদ্দিন ও রুবী গজনবী আজ আর আমাদের মধ্যে নেই।

১৯৮২ সালে ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশে এসে প্রশিক্ষণ দেন। শিল্প মন্ত্রণালয়ের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতায় তা পরিচালিত হয়। সেই সময়েই গঠিত হয়েছিল ‘ভেজিটেবল ডাই সোসাইটি’। ভারতীয়দের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এক সময় বাংলাদেশে প্রাকৃতিক রঙের সংখ্যা ভারতের চেয়ে এগিয়ে ছিল। ফলে সেই সময় বিভিন্ন দেশ এমনকি ভারত থেকেও অনেকে বাংলাদেশে আসতেন প্রশিক্ষণ নিতে।

তবে এটা অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশে প্রাকৃতিক রঙ জনপ্রিয় করতে আমৃত্যু কাজ করে গেছেন রুবি গজনবী। তার কাছ থেকে শিখে পরবর্তীতে অনেকেই প্রাকৃতিক রঙ নিয়ে কাজ করেছেন। তবে আমাদের প্রাকৃতিক রঙের বেসুমার উৎস থাকলেও আমরা সেভাবে কাজে লাগাতে পারিনি। নেই সঠিক ও সময়োপযোগী গবেষণাও। ফ্যাশন হাউসগুলোও এ ব্যাপারে উদাসীন। ফলে প্রাকৃতিক রঙের বিস্তার যতটা ঘটা উচিত ছিল ততটা হয়নি। তবে বর্তমানে অনেক উদ্যোক্তা স্বপ্রণোদিত হয়ে প্রাকৃতিক রঙ নিয়ে কাজ করছেন। 

পুরোপুরি প্রাকৃতিক রঙ নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- অরণ্য, লিভিং ব্লু, ফ্রেন্ডশিপ কালার্স অব চরস। পাশাপাশি আংশিকভাবে কাজ করে আড়ং, কুমুদিনী, প্রবর্তনা, টাঙ্গাইল শাড়ি কুটির।

বাস্তবিকই প্রাকৃতিক রঙের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য বাংলাদেশকে কেবল ঐতিহ্যের ওপর নির্ভর করলে হবে না। বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন। রঙ স্থায়িত্ব বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এবং ব্র্যান্ডিং কৌশল এক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। তা ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবেশবান্ধব পণ্যের বাড়তি চাহিদা আছে। ফলে বাড়তি দামও পাওয়া যাবে। এক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হলো রঙের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি, উৎপাদন বৃদ্ধি আর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করা। প্রতিটিই আমাদের পক্ষে করা সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। উপরন্তু প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও বহুজাতিক এনজিও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করে থাকে। 

শেষকথা

বিশ্ব এখন পরিবেশবান্ধব সমাধানের দিকে ঝুঁকছে; ফলে বাংলাদেশের জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ হতে পারে প্রাকৃতিক রঙে রাঙানো পণ্য। এটি শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়; গ্রামীণ অর্থনীতি, নারী উদ্যোক্তা এবং দেশের সুনাম বৃদ্ধিরও পথ সুগম করতে পারে।

তৈরি পোশাক শিল্পের কারণে ফাস্ট ফ্যাশনের সহযোগী হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী পরিচিত। অথচ এই শিল্পে দূষণের পরিমাণ অপরিমেয়। এজন্যই বৈশ্বিক উষ্ণায়ন আর জলবাযু পরিবর্তনের ক্রান্তিতে দাঁড়িয়ে প্রাকৃতিক বা ভেষজ রঙ হতে পারে বাংলাদেশের পরিচিতির এক নতুন হাতিয়ার। কারণ প্রাকৃতিক রঙ কেবল একটি রঞ্জক নয়, এটি আমাদের মাটির গন্ধ, নদীর ঢেউ, আর মানুষের হাতের উষ্ণতার সঙ্গে জড়ানো এক ঐতিহ্য। এটি প্রমাণ করে, সৌন্দর্য কেবল বাহ্যিক সাজ নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে এক নিঃশব্দ বন্ধন। পৃথিবী আজ যখন দূষণ ও অস্থিরতার স্রোতে ভেসে যাচ্ছে, তখন প্রাকৃতিক রঙের দিকে ফিরে তাকানো মানে কেবল শিল্পকে বাঁচানো নয়, আমাদের জীবন দর্শনকেও বদলে ফেলা। 

বাংলাদেশের মাটি, জল ও মানুষের হাতে এই সম্ভাবনা আছে- বিশ্বকে আবার রঙিন করে তোলার, এমন রঙে যা পরিবেশের ক্ষতি করবে না, বরং প্রকৃতির সঙ্গে নতুন সখ্য গড়ে তুলবে। তাই এখনই সময় গবেষণা, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, বাজার ব্যবস্থাপনার আর পরিকল্পনার মাধ্যমে বৈশ্বিক ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার। পক্ষান্তরে এই ঐতিহ্যকে ভবিষ্যতের হাতে তুলে দেওয়া, যাতে এক দিন বিশ্ব বলতে পারেÑ বাংলাদেশ কেবল সস্তা তৈরি পোশাকের জন্য নয়, টেকসই রঙের জন্যও অনন্য।


লেখক : সিনিয়র ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল সাংবাদিক ও হেরিটেজ টেক্সটাইল বিশেষজ্ঞ

ছবি : লিভিং ব্লু 


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা