মোনাকো
ফরিদ ফারাবী
প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০২৫ ১২:৫০ পিএম
একদিকে আল্পস পর্বতমালা, অন্যদিকে উন্মুক্ত নীলাভ ভূমধ্যসাগর আর মাঝে বিশ্বের দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ মোনাকো। ২.১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দেশটি চাইলে হেঁটেই ঘোরা যায়।
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্বের শহর নিস থেকে আমরা যাত্রা শুরু করলাম মোনাকোর পথে। মাত্র ২০ কিলোমিটারের পথ চাইলে সহজেই ট্রেনে চলে যাওয়া যায়। তবু বেশিরভাগ পথ টানেলের ভেতর দিয়ে যায় বলে আমরা বাস ধরলাম, যাতে বাইরের নৈসর্গিক পরিবেশ দেখতে দেখতে যাওয়া যায়। আন্তঃশহর রুটে চলা এই বাস অত্যন্ত সাশ্রয়ী হলেও বেশ ধীরগতিতে যায়। নিস শহর পেরিয়ে কিছুদূর যেতেই বাকি পথটুকু সমুদ্রের পাড় ধরে যাচ্ছিল বাস। কেবল মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখছিলাম। প্রায় ৪৫ মিনিট লাগল মোনাকোর রাজধানী মন্টেকার্লো পৌঁছাতে।
বাস থেকে নেমেই চারদিকে মোনাকো সার্কিট রেসিং ইভেন্টের বিলবোর্ড চোখে পড়ল। বলাবাহুল্য মোনাকো সার্কিট ফর্মুলা ওয়ান দুনিয়ার সবচেয়ে আইকনিক ও চ্যালেঞ্জিং রেস ট্র্যাকগুলোর একটি। ৩.৩৭ কিলোমিটারের এই ট্রেক পুরো মোনাকোর রাস্তা ধরেই তৈরি হয়। ১৯২৯ সালে শুরু হওয়া এই ইভেন্ট প্রতি বছর মে মাসে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। মে মাস হওয়ায় চারদিকে এক অন্যরকম উৎসবমুখর পরিবেশ। ল্যাম্বোর্গিনি, রোলস রয়েসের সঙ্গে একটু পরপর সাঁই সাঁই করে ছুটে যাচ্ছে রেসিং কারের বহর। এমন দৃশ্য এর আগে দেখিনি বলে বেশ উপভোগ করছিলাম।
ডানে ভূমধ্যসাগরের খাড়ি আর সেখানে সারি সারি করে দাঁড় করানো আছে ধনকুবেরদের বিলাসবহুল সব ইয়ট। মন্টেকার্লো পুরো শহরটাই উঁচুনিচু পাহাড়ি পথে ঘেরা। আয়তনে ছোট দেশ হলেও প্রতিটি মোড়েই অপেক্ষা করছে নতুন বিস্ময়। এখানকার রাস্তাগুলো পরিচ্ছন্ন, সাজানো আর মোড়ে মোড়ে নামিদামি সব ব্র্যান্ড শপ।

আমরা হেঁটে এগোলাম মন্টেকার্লোর বিখ্যাত ক্যাসিনোর দিকে। ১৮৬৩ সালে নির্মিত ঐতিহাসিক এই ক্যাসিনোর সঙ্গে একটি সমসাময়িক অপেরাও রয়েছে। ক্যাসিনো কমপ্লেক্সের সামনে ল্যাম্বরগিনি আর ফেরারির সারি দেখে মনে হচ্ছিল আমি কোনো হলিউড সিনেমার সেটে আছি। এত ব্যয়বহুল গাড়ি একইসঙ্গে ইউরোপের আর কোথাও দেখেছি বলে মনে পড়ে না। এখানকার আয়ের বড় দুই উৎস পর্যটন ও কার রেসিং। পর্যটন আরও নির্দিষ্ট করে বললে তা মূলত ক্যাসিনো-কেন্দ্রিক যা সারা পৃথিবীর অন্যতম বিখ্যাত।
ক্যাসিনো এলাকা ঘুরে আমরা এগোলাম প্রিন্স প্যালেসের দিকে। পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে ওপরে ওঠা যেন ক্লান্তির নয়, বরং রোমাঞ্চের। দূর থেকেই চোখে পড়ল প্যালেসের বিশাল তোরণ। আরেকটু সামনে এগোতেই প্যালেস চত্বরে এসে পৌঁছলাম।
প্রিন্স প্যালেসের এই অংশ বেশ জমজমাট। চারদিকে ভ্রমণার্থীদের আনাগোনা বেশ। এখানে বেশি স্যুভেনির শপও রয়েছে। প্রাসাদের সামনে পাহারারত পোশাকধারী গার্ডেরা এখানকার আভিজাত্য আর নিরাপত্তার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, কত রাজনীতি, কত ঐতিহ্য এই দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে আছে!
সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে চালিত এই দেশের জন্ম ১৪৯৪ সালে। আয়তনে বিশ্বের দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম হলেও মোনাকো পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। দেশটির জনসংখ্যা প্রায় চল্লিশ হাজার, যার বেশিরভাগই অন্যান্য দেশ থেকে এসে নাগরিকত্ব নেওয়া। এখানকার নাগরিকদের জন্য ট্যাক্স না থাকায় অনেক ধনকুবেরই মোনাকোর নাগরিকত্ব নিতে আগ্রহী থাকেন। যদিও তা পাওয়াটাও খুব সহজ।
প্রিন্স প্যালেস ঘুরে আমরা হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম প্রায় ১৫০ বছরের পুরনো দ্য ক্যাথেড্রাল অব আওয়ার ইমাকুলেট লেডির সামনে। আশপাশের প্রতিটি রাস্তা এত সাজানো-গোছানো আর পরিচ্ছন্ন যে মনে হচ্ছে ছবির মতো। ডানদিকে তাকালেই চোখে পড়ে ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশি। কিছুটা সামনে এগোতেই চোখে পড়ল মোনাকোর বিখ্যাত ওসেনোগ্রাফিক মিউজিয়াম। যদিও সময়ের অভাবে আমাদের যাওয়ার সুযোগ হয়নি, তবে সমুদ্রের তলদেশের অবিশ্বাস্য জগৎ নিয়ে আগ্রহ থাকলে নিঃসন্দেহে এই মিউজিয়াম অবশ্য দ্রষ্টব্য।
সমুদ্রের পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে আবার মন্টেকার্লো সিটির জমজমাট এলাকায় চলে আসলাম। আমাদের ফেরার সময় হয়ে এসেছে, তাই এগোলাম ট্রেন স্টেশনের দিকে। মোনাকো যেন এক মিনি স্বর্গ, যেখানে বিলাসিতা আর সৌন্দর্য একসঙ্গে মিশে গেছে।