হালুমের দাঁত ব্যথা
প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২৫ ১১:৫৩ এএম
আঁকা : মিথিলা ভৌমিক, নবম শ্রেণি, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা
আয়েশ করে মাংস চিবোচ্ছিল হালুম। অনেক দিন ধরে এমন স্বাদের খাবার খায়নি সে। মাংসের বড় একটুকরো দাঁত দিয়ে চেপে ধরল। অমনি ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল।
ঘুম ভেঙে গেল। স্বপ্ন দেখছিল। সত্যি সত্যি দাঁত ব্যথা করছে। দুদিন আগে মাংস খাওয়ার সময় দাঁতের ফাঁকে মাংস ঢুকেছিল। তা এখনও বের হয়নি।
‘বাবা, এখনও শুয়ে আছিস! তাড়াতাড়ি খেয়ে স্কুলে যা।’ মা চিৎকার করে বলল।
উত্তর দিতে মুখ খুলতেই ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল।
‘বেশি ঘুমালে মোটা হয়ে যাবি। সবাই মোটু বলে খ্যাপাবে।’
ভেবেছিল মাকে দাঁত ব্যথার কথা বলবে। সেই চিন্তা বাদ দিল।
মা চলে গেল।
চোখ বন্ধ করল হালুম।
‘হালুম, কেমন আছ?’ কিচকিচ করে জানতে চাইল মংকু।
‘ভালো নেই।’
‘কেন?’
‘দাঁতে ব্যথা।’
‘এটা কোনো সমস্যা! চলো।’
‘কোথায়? খরগুর কাছে?’ খরগোশের দাঁত সুন্দর।
‘খরগু দাওয়াত খেতে গেছে। আমি তোমাকে নিয়ে যাব এমন একজনের কাছে, যে আটকে থাকা মাংস একটানে বের করে দেবে।’
রওনা দিল দুজনে।
মংকু নিয়ে গেল হাতিদের কাছে।
‘হাতি ভাই, হাতি ভাই একটা উপকার করবে?’
‘কী উপকার?’ দলনেতা জানতে চাইল।
‘হালুমের দাঁতে মাংস আটকে গেছে। ওটা বের করে দাও না।’ মংকু বলল।
‘ওকে দাঁতের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাও।’ গজগজ করতে বলল হাতিদের দলনেতা। গোসল করার সময় এভাবে বিরক্ত করাটা মোটেও পছন্দ হচ্ছে না তার।
‘ডাক্তারখানা তো লোকালয়ে। সেখানে গেলে মানুষ ওকে খাঁচায় ভরে রেখে দেবে।’ মংকু বলল।
‘হুম! দেখি মুখটা হা করো।’ দলনেতা হাতি তার শুঁড়টা হালুমের মুখের কাছে নিয়ে এলো।
হালুম মুখ হাঁ করল। পরমুহূর্তে পানির প্রবল তোড়ে দূরে ছিটকে পড়ল হালুম। হাতি শুঁড় দিয়ে প্রচণ্ড জোরে পানি ছুড়ে মেরেছে হালুমের মুখে। চিৎ হয়ে পড়ে রইল হালুম। মাথা ঝিমঝিম করছে। দাঁত ব্যথা আরও বেড়ে গেল।
মংকু ওকে মাটি থেকে টেনে তুলল।
‘পারবে না বললেই হতো! ছেলেটাকে এত কষ্ট দেওয়ার দরকারটা কী ছিল। চলো হালুম, তোমাকে অন্য ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই।’
‘কার কাছে?’ হালুম কোঁকাতে কোঁকাতে বলল।
‘জঙ্গলে কি পশুপাখির অভাব আছে? কেউ না কেউ ঠিকই তোমার দাঁতের ফাঁক থেকে মাংস বের করে দিতে পারবে।’
একটু পরে ওদের পথ আটকালো শেয়াল।
‘হন্তদন্ত হয়ে কোথায় যাচ্ছ দুজনে?’
‘হালুমের দাঁত ব্যথা। ডাক্তারের খোঁজে যাচ্ছি।’ হড়বড় করে বলল মংকু।
‘এই জঙ্গলে আমার চেয়ে বড় কোনো ডাক্তার আছে না কি! হাঁ করো হালুম। মাংসের টুকরো বের করে দিচ্ছি।’
হালুম হাঁ করল।
শেয়াল তার লেজটা হালুমের মুখে ঢুকিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকল। একটু পরে লেজ বের করে বলল, ‘দেখো তো মাংসের টুকরো বের হয়েছে কি না?’
হালুম মাথা নাড়ল।
‘আশ্চর্য! আমি তো এভাবেই কাঁকড়া শিকার করি। মাংসের টুকরোটা ধরা দিল না কেন!’ চিন্তিত স্বরে বলল শেয়াল।
‘মাংসের টুকরোর কি জীবন আছে যে নিজে নিজে বের হয়ে আসবে! কাঁকড়া আর মাংসের টুকরো কি এক হলো, যত্তসব! চলো হালুম। তোমার জন্য ডাক্তার খুঁজে বের করি।’ কিচকিচ করে বলল মংকু।
কিছুদুর যেতেই খরগোশের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল ওদের।
‘কী রে খরগু, দাওয়াত কেমন খেয়ে এলি?’ জানতে চাইল মংকু।
‘খুব ভালো। খুব ভালো।’ মাথা নেড়ে বলল খরগু।
‘তুমিই ভালো আছ। তোমার দাঁত সুস্থ সবল। তাই তুমি প্রাণভরে খেতে পার। আর আমি…।’ কোঁকাতে কোঁকাতে বলল হালুম।
‘কী হয়েছে তোমার?’
মংকু সব খুলে বলল।
‘দেখি তোমার দাঁত। হাঁ করো তো।’Ñ খরগু বলল।
হালুম মাটিতে শুয়ে পড়ল কাত হয়ে। হাঁ করল।
খরগু হালুমের মুখের ভেতর ঢুকল। একটু পরই আবার বেরিয়ে এলো।
জঙ্গলের ভেতর ঢুকে সরু একটা বাঁশের কঞ্চি নিয়ে এলো।
তারপর সেটাকে ভাঁজ করে চিমটার আকৃতি দিল। এরপর আবার হালুমের মুখের ভেতর ঢুকল। একটু পরই চিমটায় ধরে মাংসের টুকরোটা বাইরে নিয়ে এলো।
‘আহ! অনেক শান্তি পেলাম!’ হালুম বলল।
‘বেশি কথা বোলো না। আমার কাজ এখনও শেষ হয়নি।’ আবার জঙ্গলের ভেতরে ঢুকল খরগু।
একটু পরেই ফিরে এলো। মুখে কয়েকটি লতাপাতা। আবার হালুমের মুখের ভেতর ঢুকল সে। দাঁতের ক্ষতস্থানে লতাপাতা রেখে ফিরে এলো বাইরে।
‘দাঁত দিয়ে লতাপাতাগুলো চেপে ধরে রাখো হালুম। কিছুক্ষণ পরই ব্যথা কমে যাবে।’ খরগু বলল।
‘কী মজা!কী মজা!! হালুম সুস্থ হয়ে গেছে। হালুম আবার খেতে পারবে।’ হাততালি দিল মংকু।
‘প্রাণভরে খেতে চাইলে সুস্থ সবল দাঁত লাগবে। আর দাঁত সুস্থ রাখার জন্য এর যত্ন নিতে হবে। দাঁত কিন্তু কিনতে পাওয়া যায় না, বুঝেছ হালুম?’
হালুম মাথা নেড়ে সায় দিল।
‘কিন্তু আমরা দাঁতের যত্ন নেব কীভাবে?’ মংকু জানতে চাইল।
‘খুব সহজ। সকালে খাওয়ার আগে দাঁত মাজবে আর রাতে খাওয়ার পরে। মনে থাকবে?’
‘থাকবে।’ মংকু বলল।
হালুমও সায় দিল।
দাঁতের ব্যথায় আর ভুগতে চায় না সে।