শেখ সোহেল
প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০২৫ ১২:৪৯ পিএম
নিজের লেখাপড়ার খরচ ও সংসার চালাতে বাগেরহাট শহরের অলিগলিতে এক বেলা করে চা-কফি বিক্রি করেন বাগেরহাট সদর উপজেলার কচুয়ার মোঘিয়া ইউনিয়নের ছোট আন্ধারমানিক গ্রামের এক সংগ্রামী তরুণ উজ্জ্বল মুখোপাধ্যায়। বর্তমানে তিনি সরকারি পিসি কলেজের অনার্স গণিত প্রথম বর্ষের (২০২৩-২৪) শিক্ষার্থী। অভাব-অনটনের সংসারে বাবার চিকিৎসা, নিজের পড়াশোনা এবং পরিবারের খরচ মেটাতে তিনি প্রতিদিন বিকালে কাঁধে নিয়ে বের হন থার্মোফ্লাস ভর্তি চা ও কফি। তার এই কফি শপে কফি তৈরির সব সরঞ্জাম, তার পোশাকের সঙ্গেই আটকানো থাকে। এর জন্য উজ্জ্বল ব্যবহার করেন বিশেষ ধরনের একটি জ্যাকেট। সেখানে বুকের সামনে লাগানো থাকে গরম পানির ফ্লাস্ক। জ্যাকেটের কোনো পকেটে থাকে কফির পাতা, কোনো পকেটে দুধ, কোনো পকেটে চিনি। জ্যাকেটের এক পাশে আবার লাগানো থাকে কফির কাপ। এভাবে ফেরি করে কফি তৈরির সব সরঞ্জাম শরীরে নিয়ে হেঁটে বিক্রি করেন চা-কফি।
উজ্জ্বলের বাবা বিষ্ণুপদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন তালা-চাবির কাজের কারিগর। এখন বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি আর কাজ করতে পারেন না। মা কাজল রানী মুখোপাধ্যায় গৃহিণী। চার বোনের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর মা-বাবার একমাত্র ভরসা উজ্জ্বল। পরিবারের এই দায়িত্বভার নিজের কাঁধে নিয়েই তিনি স্বপ্ন দেখেন পড়াশোনা শেষ করে নিজের অবস্থান গড়ে তোলার।

উজ্জ্বল প্রতিদিন বিকালে বাগেরহাট শহরের নূর মসজিদ এলাকা থেকে যাত্রা শুরু করে ৫টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত বাগেরহাট শহরের অলিগলিতে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করেন ব্ল্যাক কফি ও দুধ কফি। ব্ল্যাক কফি ৮ টাকা, দুধ কফি ২০ টাকা করে বিক্রি করে দিনে লাভ হয় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। এই আয় দিয়েই তিনি চালান নিজের পড়াশোনার খরচ, বই-খাতা কেনা, টিউশন ফি এবং বাসার বাজার।
স্থানীয় দোকানদার ও ক্রেতারাও তার পরিশ্রম ও লড়াইকে সম্মান জানিয়ে পাশে দাঁড়াচ্ছেন। বাগেরহাট শহরের কসমেটিকসের দোকানদার আল আমিন বলেন, উজ্জ্বল ছেলেটা খুব ভদ্র আর পরিশ্রমী। ছোট্ট একটা থার্মোফ্লাস নিয়ে প্রতিদিন হাসিমুখে আসে। আমাদের মতো দোকানদাররা প্রায় সবাই তার কাছ থেকে কফি খাই। তার চোখেমুখে লড়াইয়ের ছাপ বোঝা যায়। এত ছোট বয়সে এত দায়িত্ব নেওয়া সত্যিই সাহসিকতার ব্যাপার।
উজ্জ্বলের বন্ধু জয় হরিচাঁদ মৃধা বলেন, ছোটবেলা থেকেই ও পড়াশোনায় ভালো, ওর স্বপ্ন অনেক বড়। কিন্তু পরিবারের অবস্থা দেখে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করাটা ওর বাধ্যতামূলক হয়ে পড়েছে। তারপরও কখনও অভিযোগ করতে শুনিনি সব সময় হাসিমুখে থাকে। টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য না করতে পারলেও ভালো বন্ধু হিসেবে পাশে থাকব ওর।
কলেজছাত্র উজ্জ্বল মুখোপাধ্যায় বলেন, বাবার বয়স সত্তরোর্ধ্ব হয়েছে। এখন কিছুই করতে পারে না। সংসারের অবস্থা খুব খারাপ। আমি পড়াশোনা ছাড়তে চাই না, তাই বিকালে কফি বিক্রি করি। এই আয় দিয়েই কোনো মতে পড়াশোনার খরচ, বই-খাতা, টিউশন ফি, আর বাসার বাজার চালাই, যতটা পারছি লড়ে যাচ্ছি। কেউ কিছু কিনলে শুধু উপার্জন নয়, সাহসও পাই। আমি চাই বাবা-মা বেঁচে থাকতে তাদের মুখে হাসি ফোটাতে। আমার কাছে এই রাস্তায় রাস্তায় কফি বিক্রি করা লজ্জা লাগে না। কারণ আমি গরিব ঘরের সন্তান। আর বিশেষ করে আমি তো চুরি-ডাকাতি করে খাচ্ছি না এই জন্য আমার কাজ নিয়ে আমি গর্বিত। মাঝে মাঝে একটু কষ্ট হয় তা মানিয়ে নিয়েছি। অনেক লোক আছে বন্ধুবান্ধব দেখে হাসাহাসি করে আসলে লজ্জা করলে তো আর আমার পেট চলবে না। আর আমি সামনের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব না। এই কারণে মুখে মাস্ক ব্যবহার করে বিক্রি করি। আমি অল্প কিছুদিন হলো এই কফি বিক্রি করা শুরু করেছি। কারণ আমার বাবাকে আর কষ্ট দিতে চাই না। সেই ছোটবেলা থেকেই বাবা আমাদের জন্য অনেক কিছু করেছেন, বড় করেছেন। শেষ বয়সে এসে যদি এখনও কাজ করে খেতে হয় তাহলে এর চেয়ে লজ্জার আমার কাছে কিছু নেই। আর আমি পড়াশোনাও ছাড়তে চাই না। কারণ আমি বড় হব। বাবা-মায়ের মুখ উজ্জ্বল করব। এ ছাড়া আমি মাটির তৈরি প্রতিমা বানাতে পারি, এই প্রতিমা তো সব সময় তৈরি করা হয় না। তাই রাস্তায় রাস্তায় চা-কফি বিক্রি করি। জানি না কতটা সাফল্য অর্জন করতে পারব কিন্তু আমার মনোবল আছে, আমি সবকিছু পেরিয়ে সামনের দিকে পৌঁছে যাব।
সরকারি পিসি কলেজের গণিত বিভাগের ডিপার্টমেন্ট প্রধান রফিকুল ইসলাম বলেন, উজ্জ্বল আমাদের কলেজেরই মেধাবী একজন ছাত্র। আমি ওর সংগ্রামের কথা শুনেছি। সত্যি বলতে এই ধরনের ছেলেরা সমাজের জন্য উদাহরণ। আমরা কলেজ প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তাকে সহযোগিতার বিষয়টি বিবেচনা করব। তার মতো সংগ্রামী তরুণের পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব। আমরা যদি ওর পাশে এখন না দাঁড়াই তাহলে দাঁড়াবে কে। আমি একজন শিক্ষক হিসেবে ওর পাশে সব সময় বাবা-মায়ের মতো পাশে থাকব।