গোলাম কিবরিয়া
প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০২৫ ১২:৩৫ পিএম
আনাতোলিয়ান রোভার চ্যালেঞ্জে বিশ্বে তৃতীয় এবং এশিয়ায় প্রথম ইউআইইউ মার্স রোভার
ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ‘ইউআইইউ মার্স রোভার টিম’ তুরস্কের স্পেস এক্সপ্লোরেশন সোসাইটি (ইউকেইটি) দ্বারা আয়োজিত বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক রোবটিক্স প্রতিযোগিতা আনাতোলিয়ান রোভার চ্যালেঞ্জ (এআরসি) ২০২৫ -এ বিশ্বে তৃতীয় এবং এশিয়ায় প্রথম স্থান অর্জন করেছে। প্রতিযোগিতার ফাইনাল রাউন্ড ২৩-২৭ জুলাই ২০২৫ তারিখে তুরস্কে অনুষ্ঠিত হয়।
বিশ্বে তৃতীয় এবং এশিয়ায় প্রথম স্থান অর্জনের পাশাপাশি, ইউআইইউ এর মার্স রোভার টিম এবার আরও কতগুলো পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে যার মধ্যে রয়েছে সেরা স্বনির্ভর, ড্রাইভিং ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দল এবং সেরা বিজ্ঞান দল। বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ অর্জন ইউআইইউ শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী শক্তি, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দৃঢ় সংকল্প এবং প্রকৌশলগত উৎকর্ষে দক্ষতা প্রদর্শন করে। ইউআইইউ মার্স রোভার টিমের অটোনোমাস নেভিগেশন, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ক্ষমতা এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রতিযোগিতার বিভিন্ন বিচারক এমনকি অপরাপর অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে প্রশংসা পেয়েছে। আনাতোলিয়ান রোভার চ্যালেঞ্জ বিশ্বজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয় দলগুলিকে মার্স রোভারভিত্তিক ডিজাইন নির্মাণ করতে আমন্ত্রণ করে যেখানে উদ্ভাবিত রোভার বা রোবটগুলো মহাশূন্যে বিভিন্ন অনুসন্ধানের প্রতিবন্ধকতাকে দূর করার মতো জটিল কাজ সম্পাদন করতে সক্ষম।
এআরসি বিখ্যাত আন্তর্জাতিক সংস্থা স্পেস এক্সপ্লোরেশন সোসাইটির (ইউকেট) একটি উদ্যোগ। এআরসিতে এই অর্জন ইউআইইউকে বিশ্বব্যাপী শীর্ষ রোভার ইঞ্জিনিয়ারিং দলগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে স্থান দিয়েছে। এ ছাড়াও এই সাফল্য রোবটিক্স এবং মহাকাশ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ক্রমবর্ধমান দক্ষতাকে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে জোরদারভাবে দেখায়। দলের প্রধান উপদেষ্টা ও সিএসই অনুষদের ডিন ড. হাসান সারওয়ার এবং মেন্টর আবিদ হোসাইনের তত্ত্বাবধানে নেতৃত্ব দিয়েছেন মো. মোসফিকুর রহমান। কো-টিম লিডার ছিলেন গাজী তাওসিফ তুরাবি। সায়েন্স টিমের দায়িত্বে ছিলেন সাইফ আল সাদ, মেকানিক্যাল টিমের নেতৃত্ব দিয়েছেন মো. সিয়াম বিন রশীদ, অটোনোমাস টিম পরিচালনা করেছেন আহমেদ জেবাইল সৌখিন এবং কমিউনিকেশন ও এরিয়াল টিম পরিচালনা করেছেন ইফতে ফয়সাল। দলের অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন নাজমুল হাসান আথিন (অটোনোমাস), দিগন্ত কর্মকার (মেকানিক্যাল) এবং শেখ সাকিব হোসেন (অটোনোমাস)।
উল্লেখ্য, গত ২৮ থেকে ৩১ মে যুক্তরাষ্ট্রের ইউটা স্টেটের হ্যাঙ্কসভিলে মার্স ডেজার্ট রিসার্চ স্টেশনে অনুষ্ঠিত হয় ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জ ২০২৫-এর চূড়ান্ত পর্ব। মার্স সোসাইটি আয়োজিত ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জ ২০২৫ প্রতিযোগিতায় ২০২২, ২০২৩ এবং ২০২৪ সালের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এশিয়ায় টানা চতুর্থবারের মতো প্রথম স্থান অর্জন করে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ‘ইউআইইউ মার্স রোভার’। বিশ্বব্যাপী ষষ্ঠ স্থান অর্জন করে।
তিন দিনের চূড়ান্ত রাউন্ডে নিজেদের তৈরি রোভারের ক্ষমতা এবং অপারেশন দক্ষতা প্রদর্শন করে অংশগ্রহণকারী দলগুলো। এজন্য রোভারগুলোকে অনুসন্ধান, স্বয়ংক্রিয় নেভিগেশন, চরম পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা এবং ইকুইপমেন্ট সার্ভিসিং এই চারটি মিশন সফলতার সঙ্গে অতিক্রম করতে হয়েছিল।
ইউআইইউ মার্স রোভার টিম, মিশন অতিক্রমের এই সফলতায় চূড়ান্ত পর্বে ৩৮টি দলের মধ্যে বিশ্বে ষষ্ঠ স্থান অর্জন করলেও এশিয়ান দলগুলোর মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেছিল এই প্রতিযোগিতায়। এ ছাড়াও প্রতিযোগিতার বিজ্ঞান মিশনে ইউআইইউ মার্স রোভার টিম ১০০ স্কোরের মধ্যে ১০০ স্কোর করে সেরা বিজ্ঞান দলের পুরস্কার জয় করে, যেটি এশিয়ান দলের জন্য এটিই প্রথম। প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পোল্যান্ড, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, চিলি, মেক্সিকো এবং তুরস্কসহ প্রায় ১৫টি দেশের প্রতিযোগীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ‘ইউআইইউ মার্স রোভার’ দল।
বিজয়ী ইউআইইউ দলটির তত্ত্বাবধানে ছিলেন বিশ্ববিদ্যলয়টির কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের প্রভাষক মো. আবিদ হোসেন। ইউআইইউ সেন্টার ফর আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেঞ্চ অ্যান্ড রোবটিক্সের (সিএআইআর) ১০ জন ছাত্রছাত্রীকে নিয়ে উক্ত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে। এই প্রকল্পের টিম লিডার হলেন ইউআইউ’র ইইই বিভাগের শিক্ষার্থী মো. মুশফিকুর রহমান। অন্যান্য, মেকানিক্যাল সাব টিমে মো. সিয়াম বিন রশীদ, ইলেকট্রিক্যাল সাব টিমে গাজী তাওসিফ তুরাবি, সফটওয়্যার সাব টিমে আহমেদ জেবাইল সৌখিন, কমিউনিকেশন সাব টিমে মো. ইফতে ফয়সাল এবং সায়েন্স সাব টিমে সাইফ আল সাদ নেতৃত্ব দিয়েছে। ইউআইইউর এই রোবটিক্স সাফল্য শুধু একটি প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠত্ব নয়; এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য এবং উদ্ভাবনী সংগ্রামের প্রমাণ।

ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের প্রভাষক মো. আবিদ হোসেন বলেন, মঙ্গল গবেষণায় তরুণদের সম্পৃক্ত করতে আয়োজন করা হচ্ছে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা। তেমনই একটি আয়োজন ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জ (ইউআরসি), যার আয়োজক মার্স সোসাইটি নামের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি সংস্থা। এই প্রতিযোগিতায় মূলত মঙ্গল গ্রহে গবেষণা-উপযোগী রোবট (মার্স রোভার) তৈরি করতে হয়। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কয়েক বছর ধরেই ইউআরসিতে অংশ নিয়ে আসছেন। আমাদের ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) মার্স রোভার দলের যাত্রা শুরু ২০২১ সালে। তখন হাতে আধুনিক যন্ত্রপাতি ছিল না, বিশাল ল্যাব ছিল না, বড় বাজেট ছিল না; কিন্তু একদল সাহসী তরুণের স্বপ্ন ছিল। ছিল শেখার আগ্রহ আর নিজেকে প্রমাণ করার জেদ। আমার সৌভাগ্য, সেই দলে আমিও ছিলাম। সে সময় পাশে দাঁড়িয়েছিলেন আমাদের সাবেক মেন্টর আকিব জামান। তার উৎসাহে আমরা ছোট একটি প্রোটোটাইপ দিয়ে শুরু করি। থ্রি–ডি ডিজাইন থেকে শুরু করে সিমুলেশন সফটওয়্যার— সবই আমাদের ঠেকে ঠেকে শিখতে হয়েছে। রাতজাগা পরিশ্রমের ফল হিসেবে তৈরি হয়েছিল আমাদের প্রথম রোভার। নাম ‘মেভেন’। ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ‘ইউআইইউ মার্স রোভার টিম’ তুরস্কের স্পেস এক্সপ্লোরেশন সোসাইটি (ইউকেইটি) দ্বারা আয়োজিত বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক রোবটিক্স প্রতিযোগিতা আনাতোলিয়ান রোভার চ্যালেঞ্জ (এআরসি) ২০২৫ -এ বিশ্বে ৩য় এবং এশিয়ায় ১ম স্থান অর্জন করেছে এবার। বিশ্বে তৃতীয় এবং এশিয়ায় প্রথম স্থান অর্জনের পাশাপাশি, ইউআইইউর মার্স রোভার টিম এবার আরও কতগুলো পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে সেরা স্বনির্ভর, ড্রাইভিং ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দল এবং সেরা বিজ্ঞান দল। আমি মনে করি, এ ধরনের প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত কী ফল পেলাম, সেটাও আসলে মুখ্য নয়; বরং ঠেকে ঠেকে শেখা, ভুলগুলো শোধরানো, আত্মবিশ্বাস পাওয়া, নতুন নতুন আইডিয়া পাওয়া— এ সবই বড় অর্জন।