জারাদ ত্রিস্তান
প্রকাশ : ৩১ জুলাই ২০২৫ ১১:৩৬ এএম
আঁকা : মেহেরুন্নিসা, সপ্তম শ্রেণি, রানী নীহার দেবী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, মানিকছড়ি, খাগড়াছড়ি
রূপকথার নিয়ম অনুসারে সেই রাজ্যের ছিল একজন রাজা এবং একজন রানীমা। একদিন রাজা মশাই সিংহাসনে বসে বসে ঘুমে ঢুলছেন। তার শিকারে যেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু আজকে রানীমাও সভায় এসেছেন। তার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে শিকারে যাওয়া বেশ কঠিন ব্যাপার।
মহারাজ রানীমার কাছে অনুমতি চাইবেন কি না তা ভাবছেন। এমন সময় সিপাহি এসে জানালো এক প্রজা এসেছে। মহারাজের নির্দেশে তাকে নিয়ে আসা হলো।
ভদ্রলোক একজন গরু পালক। বেশ সরল-সোজা দেখতে। আসার সময় রাজার জন্য ভেট হিসেবে খাঁটি গরুর দুধ নিয়ে এসেছে। ‘এহে বাপু তোমার সমস্যাটা কী? এই ভর দুপুরে কী বিচার দিতে এসেছ?’
‘মহারাজ আমার একজনের প্রতি অভিযোগ ছিল...’
মহারাজ তাকে কথা শেষ করতে দিল না, ‘দ্রুত বলো, আমার তাড়া আছে।’
কথাটা রানীমাও শুনতে পেলেন, ‘কোথায় যাওয়া হচ্ছে?’
‘কই, আমি কোথাও যেতে চাইনি। তা যাক গে, কী বলছিলে, বল তো বাপু।’
‘যে আজ্ঞে মহারাজ, আমি এক গরিব। গরু লালন-পালন করে আমার সংসার টানতে হয়। আমার গরুগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো যে দুধেল গরু, সেটা আজ সকালে মারা গেছে। মারা গেছে পড়শীর বাড়ির পাঁচিল পড়েই। আপনি বিচার করুন মহারাজ।’
লোকটির কথায় সবার চোখে কান্না চলে এলো। রানী কান্নার পানি রাখার জন্য ছোট্ট একখানা শিশি নিয়ে নিলেন।
মহারাজ তৎক্ষণাৎ পড়শীকে ধরে আনার হুকুম দিলেন।
সিপাহিরা পড়শীকে ধরে আনল। ভদ্রলোক বেশ মোটাসোটা। মাথায় টাক, বড্ড বাচাল।
সিপাহিদের প্রশ্ন করে আগেই তিনি জেনে নিয়েছেন তাকে কোন অপরাধে ধরা হয়েছে। তাই কোনো কিছু তোয়াক্কা না করে ঢুকেই তিনি কথা বলা শুরু করলেন, ‘আমার কি দোষ! কাল রাতে ২৫টা লুচি আর এক বাটি কষা মাংস খেয়ে ঘুম দিলাম। তাও কি আর ঘুমাতে পারি। রাতে মশার জ্বালা। শেষমেষ মশা তাড়াতে তাড়াতে ভোরের দিকে ঘুম হলো। সাত সকাল হতে না হতেই গিন্নির ডাকে উঠে পড়লাম। ঘুম থেকে উঠে কোনোমতে দশখানা পরোটা, আর আস্ত একটা লাউয়ের তরকারি খেয়েছি। এমনি পাশের বাড়ির ব্যাটা এসে চেঁচানো শুরু করল। বাইরে গিয়ে দেখি, আমার বাড়ির পাঁচিলটা ভেঙে তার এক গরু মরে গেছে। আমার এখানে কী করার ছিল! আমি তো পাঁচিল বানানোর জন্য মিস্ত্রির মজুরি দিয়েছিলাম ৫০০০ টাকা। সে বেটা ঠিকমতো পাঁচিল তৈরি না করলে আমার কি দোষ! আপনি তাকেই ডেকে পাঠান।’
পড়শীর এমন বাচলামোতে সভার সবার মাথা ভোঁ-ভোঁ করে ঘুরছে। রাজা নিজেকে সামলে নিয়ে, পাঁচিল বানানো সেই মিস্ত্রিকে আনার হুকুম দিলেন।
রাজমিস্ত্রি ভয় পেয়ে উল্টাপাল্টা কথা বলা শুরু করে। তাকে ধরে আনতেই মহারাজকে যমরাজ বলার কারণে সিপাহিদের কাছেও ধমক খেলো।
‘তুমি এমন পাঁচিল কেন তৈরি করেছ, যা ভেঙে মানুষের ক্ষতি হতে পারে?’
‘যমরাজ থুড়ি মহারাজ, আমার কোথায় দোষ, আমাকে পাঁচিল বানানোর মাল-মসলা মেশানোর জন্য যে পাত্র দেওয়া হয়েছিল, তাতেই সমস্যা ছিল। এদিক দিয়ে এবড়ো তো ওদিক দিয়ে খেবড়ো। যে আমাকে পাঁচিল বানাতে দিয়েছিল, সে এতই কিপ্টে, আরেকটা পাত্রের কথা বলতেই তাড়িয়ে দিল।’
‘পাত্রটা কোত্থেকে কিনেছিলে?’ মহামন্ত্রী প্রশ্ন করল। তিনি মাত্র সভায় এসেছেন, তাই শুরুতে তার কথা বলতে ভুলে গেছি।
‘আমি হাট থেকে কিনেছিলাম পাত্রটা’
‘হাটের কোন দোকান থেকে? হাটুরে কোথা থেকে মাটির পাত্রগুলো আনে জানো কি?’
‘জি, মহারাজ। যে এসব পাত্র বানায়, সে আমার পাশের বাড়িতেই থাকে। তার কাছ থেকেই প্রথমে আনতে গিয়েছিলাম। কিন্তু সে বলে পড়শী দেখে আমাকে নাকি সস্তায় দেবে, সস্তার জিনিসের বিশ্বাস নেই। তাই আমি দোকান থেকেই ও জিনিস কিনেছি।’
‘এ দেখি রাজার চেয়েও বড় আহাম্মক, এটাকে বিদায় করে ডাক বেটা কুমারকে।’ এবার মুখ খুললেন রানীমা।
কুমারকে ধরে আনা হলো, কুমার খুব সহজ-সরল। আসার সময় রানীমার জন্য ভেট হিসেবে মাটির পুতুল নিয়ে এসেছিলেন। তা দেখে রানী গলে একেবারে মাখন।
যখনই কুমারকে অপরাধী বলা হলো তখন সে বলল, ‘মহারাজ আমার কি দোষ! আমাকে যে লোক মাটি সরবরাহ করে, সেই এবার খুব বাজে মানের মাটি দিয়েছে। তাড়াহুড়ো করে বানানোর জন্য আর ভালো মাটিও জোগাড় করতে পারিনি।’
কুমারকে খালাস করে দেওয়া হলো। যে লোক মাটি সরবরাহ করে সে মাঠের একধারে বসে দেশিয়াল গান গাইছিল। সেই অবস্থায় চ্যাংদোলা করে তুলে আনা হলো।
তাকে গো হত্যার অপবাদ দিতে এসে বলল, ‘মেরে কেয়া কসুর হে রাজা জি? হামি গরিব আদমি, হামি ফির কী করলাম?’
‘বেটা বদমাশ, তুই খুব বাজে মানের মাটি দিয়েছিস। তাই ভালো মানের পাত্র তৈরি হয়নি। আর এ কারণেই পাঁচিল ভেঙে পড়ে আমার এক প্রজার গরু মারা গেছে।’
‘আমি আবার কী করলাম! এবারের মাটিটাই খারাপ ছিল। আমার যে মাঠে মাটি কাটি, এক বদমাশ প্রত্যেকদিন সে মাঠে এসে গোবর ফেলে যায়।’
‘ডাকো সেই বদমাশকে!’
‘বুলানের কী আছে বাবু! ওই তো সেই আদমি দাঁড়িয়ে আছে।’
সবার চোখ চলে গেল গরু পালকের দিকে। সে ভয়ে জবুথবু হয়ে আছে।
রাজা তৎক্ষণাৎ নির্দেশ দিলেন তাকে আটক করার। কিন্তু সে বেচারা খালি কান্নাকাটি করতে লাগল, বলতে লাগল সে জেলে গেলে তার পরিবার না খেয়ে মরবে। তাই দেখে রাজা-রানীর মনে দয়া হলো। তারা নির্দেশ দিলেন এবারের মতো তাকে ছেড়ে দিতে, কিন্তু ভুলেও যেন সে এই কাজ আর না করে। অন্যের ক্ষতি করলে যে আবার নিজেরই ক্ষতি হয় তা তাকে বুঝালেন তারা।
একটা ভালো মানের গরুও তাকে উপহার দিলে। তারপর তাকে ঘার ধরে সভা থেকে বের করে দিলেন।
তারপর?
এর বেশি কিছু আর জানি না, তবে বেশকিছু নিন্দুকে বলে, রানীমা নাকি সেই দুধ দিয়ে পায়েস বানিয়ে একা একা খেয়েছিলেন।
যারা এসব বলে তারা বড্ড পাজি। রানীমা একা না, সভার সবাইকে নিয়েই খেয়েছিলেন।
তবে এর অধিক আমি আর কিছু বলতে পারব না, ঘটনাটা তারপর বড়সড়ো একটা ধামা দিয়ে সুনিপুণভাবে পায়েসের ঘ্রাণসহ চাপা দিয়ে দেওয়া হয়।
পঞ্চম শ্রেণি, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কাকরাইল, ঢাকা