ইউক্রেনের রূপকথা
সুব্রত চৌধুরী
প্রকাশ : ৩১ জুলাই ২০২৫ ১১:২৬ এএম
অলংকরণ : মিথিলা ভৌমিক। সে ঢাকার ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী
কোনো এক গ্রামের শেষ প্রান্তে একটা কুঁড়েঘরে এক বুড়ো লোক বাস করত। তার ছিল এক পোষা বিড়াল, যে তার যৌবনকালে ইঁদুর শিকারে বেশ পটু ছিল। কিন্তু বয়সের ভারে সে এখন বেশ দুর্বল, চোখেও কম দেখতে পায়। তাই আগের মতো আর ইঁদুর শিকার করতে পারে না।
গ্রামের শেষ প্রান্তে যেখানে বনের শুরু সেই বনের ধারে ঝোপের মধ্যে একটা চালাক শেয়াল বাস করত।
একদিন বুড়ো ভাবল বিড়ালটা যখন আর ইঁদুর শিকার করতে পারে না তখন আর শুধু শুধু ঘরে রেখে লাভ কী!
তা ছাড়া বিড়ালের জন্য দুধ, মাছ জোগাড় করতে গিয়ে বুড়োর ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা। বুড়ো একবার মনে মনে ভাবল বিড়ালটাকে মেরেই ফেলি কিন্তু পরক্ষণেই আবার ভাবল কতদিনের পোষা বিড়াল! বিড়ালটার জন্য তার খুব মায়া হলো। তাই বিড়ালটাকে না মেরে বনের ভেতর নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল, যাতে করে অন্তত সে বনের খাবারদাবার খেয়ে বেঁচেবর্তে থাকতে পারে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। পরদিন সকাল হতেই বুড়ো বিড়ালটাকে নিয়ে বনের ভেতর রেখে এলো।
বুড়ো চলে যাওয়ার পর বিড়ালটার চোখ ফেটে কান্না এলো। মিউ মিউ স্বরে সে অঝোরে কেঁদেই যেতে লাগল। তার কান্না শুনে শেয়াল ঝোপের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, লক্ষ্মী বোনটি আমার কাঁদছ কেন?
বিড়ালটা তাকে আদ্যোপান্ত খুলে বলল।
সবকিছু শুনে শেয়াল তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, তুমি চিন্তা করো না, আজ থেকে আমিই তোমাকে দেখভাল করব।
শেয়াল বিড়ালের জন্য ঝোপের পাশে একটা ঘর তৈরি করে দিল এবং তাকে এই বলে আশ্বস্ত করল যে তার খাবারদাবার সব শেয়ালই জোগাড় করে দেবে। বিড়ালটা তাকে কী বলে যে ধন্যবাদ জানাবে তা ভেবে উঠতে পারল না।
দিন কয়েক পরের ঘটনা। একদিন বিড়ালটা দেখতে পেল বনের ভেতর থেকে একটা খরগোশ বেরিয়ে এসে বুড়োর ক্ষেতের বাঁধাকপি সব খেয়ে ফেলছে। বিড়ালটা তা দেখতে পেয়ে তারস্বরে মিউ মিউ করে ডাকতে বলল। তা শুনে খরগোশটা ভয় পেয়ে বনের ভেতর পালিয়ে গিয়ে ভালুক, নেকড়ে বাঘ ও বন্য শূকরের কাছে পুরো ঘটনাটি খুলে বলল।
খরগোশের মুখে সব শুনে ভালুক বলল, কেমন সাহস বিড়ালটার! তোমাকে ভয় দেখাল? বিড়ালটাকে তো শায়েস্তা করতে হবে।
শোন, আমার মাথায় একটা প্ল্যান এসেছে।
কী?
আমরা চারজন চারটা ঝুড়ি নেব এবং শেয়াল ও বিড়ালের জন্য দুটি ঝুড়ি তৈরি রাখব। আমি বুড়োর বাড়ি থেকে পানীয়, নেকড়ে মাংস রান্নার পাত্র আর শূকর বাগানের ফল চুরি করে নিয়ে আসব। কাজটা এমনভাবে করতে হবে, যাতে কেউ ঘুণাক্ষরেও টের না পায়। আর তুমি শেয়াল ও বিড়ালকে পরের দিনের জন্য নৈশভোজের দাওয়াত দিয়ে আসবে।
আর শেয়াল ও বিড়াল যখন নৈশভোজের খাবার খেতে ব্যস্ত থাকবে তখন আমরা চারজন তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মেরে ফেলব।
পরিকল্পনামতো সবাই যার যার কাজে নেমে পড়ল। খরগোশ গেল শেয়াল ও বিড়ালকে দাওয়াত দিতে।
দাওয়াত দেওয়ার সময় তাদেরকে এও মনে করিয়ে দিল তারা যেন সঙ্গে কাঁটাচামচ ও ছুরি নিয়ে যায়।
শেয়াল ও বিড়াল নির্ধারিত সময়ে নৈশভোজস্থলে পৌঁছে দেখে সেখানে কেউই নেই। কিন্তু টেবিলে থরে থরে খাবার সাজানো আছে।
শেয়াল ও বিড়াল কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে খাবার খাওয়া শুরু করে দিল। আর ওদিকে ভালুক, নেকড়ে, শূকর ও খরগোশ গাছের আড়ালে লুকিয়ে থেকে সুযোগ খুঁজছিল তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মেরে ফেলার জন্য। হঠাৎ খরগোশ গাছের আড়াল থেকে উঁকি মারতেই বিড়ালটি তাকে দেখে ফেলল।
সে পিঠ উঁচিয়ে লেজ ফুলিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে ‘মিউ! মিউ’ করে ডেকে উঠল। আর তা ওই চারজনের কানে গিয়ে বাজল ‘মার! মার!’ শব্দ হিসেবে। শেয়ালও তারস্বরে ‘হুক্কা হুয়া! হুক্কা হুয়া!’ ডাকে বনবাদাড় কাঁপিয়ে তুলল। আর তা ওই চারজনের কানে গিয়ে বাজল ‘ধর! ধর!’ শব্দ হিসেবে।
আর তা শুনেই ভয়ে চার প্রাণীই লেজ গুটিয়ে বনের গহিনে পালিয়ে গেল।
এই সুযোগে বিড়াল আর শেয়াল গোগ্রাসে খাবারগুলো সাবাড় করতে বলল। আর যে খাবারগুলো বেঁচে গেল তা তাদের জন্য রাখা পাত্র দুটিতে ভরে নিজেদের ডেরার পথে পা বাড়াল।
পথে যেতে যেতে বিড়াল ও শেয়াল গোঁফে তা দিতে দিতে খুশিতে ডিগবাজি খেতে বলল।