এমএ হান্নান
প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২৫ ১৩:০৬ পিএম
গল্পটা প্রায় ১২ বছর আগের। স্বামীর একার আয়ে টেনেটুনে চলছিল সংসার। অভাবের এ সংসারে দুই সন্তানের পড়াশোনার খচর বহন করা দুরূহ হয়ে ওঠে। বাড়তে থাকে অভাব-অনটন। নিজে কিছু করার প্রত্যয় নিয়ে ঘরে বসেই মুড়ি ভাজা শুরু করেন প্রতিভা রাণী। সময়ের চাকা ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে ভাগ্যের চাকাও ঘুরতে থাকে। প্রতিভার বাড়তি আয়ে ঘুচতে শুরু করে সংসারের অভাব। অভাবের সংসারে আসতে থাকে সচ্ছলতা। প্রথমে একা মুড়ি ভাজা শুরু করলেও তিন বছরের মাথায় তার কাজে দুই নারীকে সহযোগী হিসেবে কাজে নেন। আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। এখন তিনি একজন সফল নারী উদ্যোক্তা। গড়ে তুলেছেন মুড়ি ভাজার কারখানা। তার কারখানায় কর্মসংস্থান হয়েছে সমাজের পিছিয়ে থাকা নারীদের। প্রতিভা রাণী তার সংসারে এনেছেন সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য। তার কারখানায় কাজ করে অনেক নারীই হয়েছেন স্বাবলম্বী।
জীবন সংগ্রামে সফল এ নারীর বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কালাইয়া সবুজবাগ হিন্দুপাড়ায়। তিনি ওই পাড়ার নির্মল চন্দ্র ব্যাপারীর স্ত্রী।
প্রতিভা রাণীর কারখানা ঘুরে দেখা যায়, কাকডাকা ভোরে খোলে প্রতিভা রাণীর মুড়ি ভাজার কারখানার দুয়ার। শুরু হয় মুড়ি ভাজার কর্মযজ্ঞ। মাটির চুলায় মুড়ি ভাজা হয়। ৮টি চুলায় প্রতিভা রাণীসহ ১০ থেকে ১৫ জন নারী মুড়ি ভাজার কাজ করে থাকেন। কেউ কেউ লবণ পানি আর রসুন মিশানো চাল মাটির চুলায় হালকাভাবে ভেজে নেন। পাশের চুলায় মাটির পাত্রে উত্তপ্ত করা হয় বালু। হালকা ভাজা চাল উত্তপ্ত বালুর মধ্যে দিয়ে বিশেষভাবে নাড়াতে থাকেন অন্য নারী শ্রমিকরা। এতে মুহূর্তে গরম চাল মুড়িতে পরিণত হয়। কোনো রকম রাসায়নিক কেমিক্যাল ছাড়াই ভাজা হয় সুস্বাদু এই মুড়ি। যে কারণে উপজেলাজুড়ে এ মুড়ির কদর অনেক বেশি।
প্রতিভা রাণী জানান, উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ মুড়ি ভেজে নিতে তার কারখানায় ভিড় করেন। প্রতি কেজি মুড়ি ভাজতে নেওয়া হয় ২৫ টাকা করে। প্রতিদিন প্রায় তিন মণ চালের মুড়ি ভাজা হয় প্রতিভা রাণীর কারখানায়। প্রতি মাসে সব খরচ বাদে তার ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় হয়। মুড়ি ভাজার কাজে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন স্থানীয় ১০ থেকে ১৫ জন নারী শ্রমিক। তারাও প্রতি মাসে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা আয় করেন।
প্রতিভা রাণীর কারখানার শ্রমিক লক্ষ্মী রাণী বলেন, প্রতিভা রাণীর কারখানায় কাজ করে আমিসহ অনেক নারী স্বাবলম্বী হয়েছেন। আমরা মুড়ি ভেজে যে টাকা আয় করি তা দিয়ে সংসারের চাহিদা পূরণ করি। ছেলেমেয়ের পড়াশোনায় ব্যয় করি।
আরেক নারী শ্রমিক সুগন্ধা রাণী বলেন, সংসারে অভাব ছিল। স্বামী যা ইনকাম করে তা দিয়ে সংসার চালানো কষ্টের ছিল। কয়েক বছর ধরে মুড়ি ভেজে ৮-৯ হাজার টাকা ইনকাম করি, যা দিয়ে সংসার ভালোভাবেই চলছে।
এ বিষয়ে পটুয়াখালী জেলা বিসিকের শিল্পনগরী কর্মকর্তা মো. আলামিন বলন, প্রতিভা রাণীর মুড়ি ভাজার কারখানা পরিদর্শন করব। তাকে বিসিকের পক্ষ থেকে কারিগরি প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তা দেওয়া হবে।