মাসুম বিল্লাহ
প্রকাশ : ২৪ জুলাই ২০২৫ ১৫:৪১ পিএম
অলংকরণ : মিথিলা ভৌমিক। নবম শ্রেণি, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা
জিয়াতুন জাহান তখন ঘুমিয়ে ছিল। যখন সে চোখ খুলল, দেখল চারদিক ঝলমলে রঙে ভরা। সব পাখি তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
পাখিরা বলল, ‘তুমি পাখি আঁকতে খুব পছন্দ করতে বুঝি?’
জিয়াতুন ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলে, ‘হ্যাঁ, খুব।’
পাখিরা আবারও একসঙ্গে গানের সুরে বলে ওঠে, ‘সেজন্য তোমাকে পাখিদের রাজ্যে পাঠানো হয়েছে। আমরা তোমাকে পেয়ে ভীষণ খুশি।’
পাখিদের কথায় জিয়াতুন অবাক হয়। সে চোখ পিটপিট করে বলে, ‘সত্যি?’
‘হ্যাঁ, সত্যি।’ পাখিরা একসুরে বলল।
সারাদিন পাখিদের সঙ্গে ছোট্ট জিয়াতুন ঘুরে বেড়াল। হাসি আর আনন্দে দেখতে দেখতে দিনটা ফুরিয়ে এলো।
এ সময় হঠাৎ জিয়াতুন বলে ওঠে, ‘আমাকে এখন বাড়ি যেতে হবে, দেরি করলে মা বকবে!’
‘না, আর বকবে না।’ শালিক পাখিটা মুখ ভার করে বলল।
টিয়ে পাখি উড়ে এসে জিয়াতুনের ঘাড়ে বসল। তারপর জিয়াতুনের কান খুঁটে দিয়ে বলল, ‘আমরা তোমাকে যেতে দেব না। তুমি আমাদের সঙ্গে খেলবে। আমাদের এখানে অনেক মজা বুঝলে।’
জিয়াতুন হাত নেড়ে ‘না, না’ করে ওঠে, বলে, ‘না বাবা, আর ১০ মিনিট পরই আমার স্কুল ছুটি হবে। আমি বাসায় যাব। তারপর হোমওয়ার্ক করতে হবে। সকালে আবার স্কুলে যেতে হবে...!’
তখন সাদা বক এসে জিয়াতুনের সামনে দাঁড়াল। বকের মুখ বিষণ্ন। পালকেও আগুনে পোড়া ছাই লেগে আছে। তারপর বকটা জিয়াতুনের কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে বলল, ‘আমরা এখন গোপন আকাশের ভেতর আছিÑ পৃথিবীর অনেক ওপরে, মেঘের ওপরে, শব্দেরও ওপরে! এখান থেকে চাইলেও চলে যাওয়া যায় না।’
সাদা বকের কথায় ভয় পেয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল জিয়াতুন। এই ফাঁকে ছুটে এলো ময়না পাখি। তার হাতে আগুনে পুড়ে যাওয়া একটা খাতা!
মলাটে লেখাÑ
নাম : জিয়াতুন জাহান
ক্লাস : থ্রি
বিষয় : বাংলা এইচডব্লিউ (হোমওয়ার্ক)
ভার্সন : বাংলা
সেকশন : আকাশ
মলাটের ওপরের দিকে ছিল একদল রঙিন পাখি, একটা সূর্য আর একটা ছোট বাড়ি। জিয়াতুনের কান্না থেমে গেল। সে চিৎকার করে ওঠে, ‘এটা আমার বাংলা হোমওয়ার্কের খাতা!’
সে ভীষণ অবাক হলো তার হোমওয়ার্কের খাতাটা দেখে। মনে মনে ভাবÑ আমার খাতাটা এখানে এলো কীভাবে!
তারপর খাতাটা হাতে নিয়ে মন খারাপ করে বলে, ‘এ্যাঁ, আমার খাতাটা এভাবে কে পুড়িয়ে দিয়েছে!’
চড়ুই পাখিটা গলার স্বর বাড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘একটা বিমান। বিমানটা অনেক দিনের পুরনো ছিল...!’
চড়ুইয়ের কথায় জিয়াতুন ভারী অবাক হয়ে বলে, ‘বিমান আবার কারও হোমওয়ার্কের খাতা নষ্ট করে নাকি? বিমান তো আকাশে ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়।’
‘কিছু বিমান পচা হয়।’ হঠাৎ বলে ওঠে কাকটা।
‘এখন আমি লিখব কীভাবে?’ কান্না জড়ানো কণ্ঠে জিয়াতুন বলে।
দোয়েল পাখি উত্তর দেয়, ‘তোমাকে আর কখনও হোমওয়ার্ক করতে হবে না। তুমি এখন থেকে শুধু ছবি আঁকবে, ফুল, পাখি, নদী...তোমার যা ইচ্ছে আঁকবে। এখানে কেউ পাখি মারে না, কেউ আগুনে পোড়ে না, হোমওয়ার্কের খাতাও আগুনে পোড়ে না।’
জিয়াতুনের হোমওয়ার্কের খাতা পৃথিবীতে আগুনে পুড়ে গিয়েছিল, এই কথাটা পাখিরা জিয়াতুনকে বলেনি। পাখিরা চায় নাÑ ছোট্ট জিয়াতুন কষ্ট পাক, কান্না করুক।
জায়াতুন এখন রঙিন পাখিদের দেশের স্কুলে বসে ছবি আঁকছে। এখানে স্কুলের কোনো ক্লাসে আগুন লাগে না, কারও হোমওয়ার্কের খাতাও আগুনে পুড়ে যায় না।
পাখিরা জিয়াতুনের হাত ধরে বলল, ‘চলো, আমরা সবাই মিলে আমাদের পাখিদের দেশটা আরও সুন্দর করে গড়ি…যেন কখনও কারও হোমওয়ার্কের খাতা আগুনে পুড়ে না যায়!’