প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০২৫ ১৩:০২ পিএম
বাংলাদেশে দলিত ও হরিজন সম্প্রদায়ের অধিকার এবং সুশাসনের জন্য নিবেদিত একটি সংস্থা ‘দলিত’। ইসলামিক রিলিফ সুইডেনের অর্থায়নে সোমবার (২১ জুলাই) ঢাকার সিরডাপ আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জাতীয় দলিত কনভেনশন ২০২৫’ আয়োজন করে। কনভেনশনের মূল লক্ষ্য ছিল দেশের প্রান্তিক দলিত ও হরিজন সম্প্রদায়ের কণ্ঠস্বর নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তাদের অধিকার ও অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা।
দলিত সংস্থার নির্বাহী পরিচালক জনাব স্বপন কুমার দাস স্বাগত বক্তৃতায় ব্যক্তিগত অভিমত ছাড়াও দলিত জনগোষ্ঠীর বঞ্চনার বাস্তবতা তুলে ধরেন। তিনি বৈষম্যবিরোধী আইন বাস্তবায়ন এবং সংসদে দলিত নারীদের জন্য অগ্রাধিকারমূলক আসন নিশ্চিত করার দাবি জানান। দলিত সংস্থার সম্মানিত স্বেচ্ছাসেবক মিনা দাস মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় বারোটি দাবি উত্থাপন করেন। তিনি সরকারের কাছে অনুরোধ করেন যে, দলিত সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার বাস্তবতা অনুধাবন করতে উক্ত এলাকায় প্রতিনিধি পাঠানো হোক। ড. আবুল হাসনাত (উপসচিব, আইন ও বিচার বিভাগ) প্রধান অতিথির বক্তব্যে সুশাসন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আমাদের সব কাজ সবার কল্যাণের জন্য পরিচালিত হয়। দেশে যদি যথাযথভাবে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব। সামাজিক কল্যাণ মন্ত্রণালয় সমাজের নিপীড়িতদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য নিবেদিত। আমাদের দায়িত্ব হলো সমাজের দুর্বল মানুষদের রক্ষা করা। বাংলাদেশ গরিব দেশ নয়, বরং এটি অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত একটি দেশ। আমাদের প্রচুর সম্পদ রয়েছে, কিন্তু সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সেগুলো কীভাবে কাজে লাগানো।
ব্যবস্থাগত বাধা দূরীকরণ : নীতি ও অনুশীলনে দলিত অধিকার শীর্ষক আলোচনায় আইন মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব আবুল হাসনাত জানান- এন্টি-ডিসক্রিমিনেশন অ্যাক্ট ২০১৮ এর খসড়া প্রস্তুত রয়েছে এবং সরকার এই জনগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করছে। সংবিধানের ২৮(৪) ধারার বাস্তবায়নের মাধ্যমে অধিকার আদায়ের চেষ্টা চলছে এবং সম্মেলনে উত্থাপিত প্রস্তাবনা তিনি মন্ত্রণালয়ে পৌঁছে দেবেন।
বাংলাদেশ নারী মুক্তি কেন্দ্রের প্রেসিডেন্ট সীমা দাস বলেন, হরিজন ও দলিত সম্প্রদায় পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন এবং তাদেরকে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী বলি। তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান এই বিষয়গুলোর বাস্তব প্রয়োগ দেখা এবং নারী নেতৃত্বে দলিত ও হরিজন সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দকে এগিয়ে আসতে উৎসাহ প্রদান করার।
হরিজন ঐক্য পরিষদের সভাপতি কৃষ্ণ লালা বলেন, আমাদের আইনগুলো কাগজে আছে কিন্তু কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ নেই, তাই এখন চর্চায় আনা জরুরি। স্বপন কুমার দাস (নির্বাহী পরিচালক, দলিত) বলেন, দলের যুবকদের সংগঠিত করা একটি চ্যালেঞ্জ, তবে আমরা তাদেরকে একত্রিত হতে, সিবিও (Community-Based Organization) গঠন ও নিবন্ধন করার পরামর্শ দিয়েছি। দলিত সম্প্রদায়ের সুযোগ-সুবিধা পেতে সরকারের নজর দেওয়ার আহ্বান জানান।
আলোচনায় ইতালি রাষ্ট্রদূত এইচ.ই. আন্তেনিও আলেসান্দ্রে দলিত সংগঠন ও সম্মেলনকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, দলিত জনগোষ্ঠী তাদের ভয়েস রেইজ করছে, যা অত্যন্ত ভালো। প্রতিবন্ধকতা, বিশেষ করে প্রান্তিক অঞ্চলে সমস্যার সমাধানে আইন বাস্তবায়ন ও সংস্কৃতি অনুসরণ প্রয়োজন। নতুন প্রজন্ম, বিশেষ করে যুবকদের, দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কাজ করতে হবে। আইন প্রয়োগ বাস্তবতার সঙ্গে মেলাতে হবে। এই কনভেনশনের মাধ্যমে লিঙ্কেজ তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে পদক্ষেপ নেওয়া সহজ করবে।
সম্মেলনটি ইসলামিক রিলিফ সুইডেনের অর্থায়নে আয়োজন হওয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ এবং সহমর্মিতা স্পষ্ট হয়েছে। সুইডেনের মতো দেশ মানবাধিকার রক্ষা এবং উন্নয়ন সহযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যেমন রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু সহায়তাসহ তাদের সহমর্মিতা লক্ষণীয়। বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারও বাংলাদেশে দলিত অধিকার ও অন্তর্ভুক্তি বিষয়ে আগ্রহ প্রদর্শন করেছে। বাংলাদেশে দলিত অধিকার আন্দোলনের একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকার শাহবাগে বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী অধিকার আন্দোলন (বিডিওআরএএম) তাদের বারো দফা দাবিতে সমাবেশ করে। সম্মেলনের শেষে এনজিও প্রতিনিধিদের বক্তব্য এবং দলিত সংস্থার ধন্যবাদ বক্তব্যের মাধ্যমে জাতীয় দলিত কনভেনশন-২০২৫ এর সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।