আফসানা মিমি
প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৫ ১৩:৩৫ পিএম
আমাদের শরীরের ভেতরে হরমোন নামের একেকটি রাসায়নিক বার্তাবাহক রয়েছে, যাদের কাজ নিখুঁতভাবে শরীরের নানা প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা। এই হরমোনগুলো বিভিন্ন গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হয়ে রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে দেহের প্রত্যেক কোষে গিয়ে বার্তা পৌঁছে দেয়। হরমোনের প্রভাবে আমাদের ঘুম, ক্ষুধা, শরীরের তাপমাত্রা, রক্তচাপ, ওজন, মানসিক অবস্থা, চুল ও ত্বকের অবস্থা এমনকি প্রজনন ক্ষমতা পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিত হয়। এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যে সামান্য ব্যাঘাত ঘটলেই দেখা দেয় নানা শারীরিক সমস্যা- যা আমরা অনেক সময় বুঝতেই পারি না। এই অবস্থাকেই বলা হয় হরমোনের অসামঞ্জস্যতা। এই অসামঞ্জস্যতা একদিকে যেমন দৈহিক অসুস্থতা তৈরি করে, অন্যদিকে মানসিক অবস্থাকেও প্রভাবিত করে। সমস্যা হলো, এর লক্ষণগুলো এতটাই সাধারণ যে অনেকেই একে গুরুত্ব না দিয়ে বছরের পর বছর অসুস্থতা বয়ে বেড়ান।
কেন হয়
হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণ হতে পারে বহু ধরনের। যেমনÑ অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও উদ্বেগ, অনিয়মিত ও অপর্যাপ্ত ঘুম, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন, রাসায়নিক যুক্ত প্রসাধনী বা প্রক্রিয়াজাত খাবার, দীর্ঘদিন ওষুধ সেবন (যেমনÑ জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি), জিনগত বা পারিবারিক কারণ, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব।
বিশেষ করে নারীদের মধ্যে প্রজনন হরমোনের ওঠানামা, মাসিক চক্রের পরিবর্তন, মেনোপজের সময়কাল কিংবা পলিসিস্টিক ডিম্বাশয় সিনড্রোমের মতো অবস্থায় এই সমস্যা প্রকট হয়ে ওঠে।

যেভাবে বোঝা যায় হরমোনে সমস্যা হচ্ছে
হরমোনের ভারসাম্যহীনতা শরীরে নানা সংকেতের মাধ্যমে প্রকাশ পায়, যেমনÑ মাসিক অনিয়মিত বা বন্ধ হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি বা হঠাৎ ওজন হ্রাস পাওয়া, মুখে বা শরীরে ব্রণের প্রকোপ, চুল পাতলা হয়ে যাওয়া বা অতিরিক্ত পড়া, ত্বকে রুক্ষতা বা অতিরিক্ত তৈলাক্ত ভাব, অতিরিক্ত ক্লান্তি, ঝিমুনি বা ঘুমের সমস্যা, ঘন ঘন মেজাজ পরিবর্তন, মন খারাপ বা দুশ্চিন্তা, যৌন ইচ্ছা হ্রাস, গর্ভধারণে সমস্যা ইত্যাদি। এমন লক্ষণগুলো যদি দীর্ঘদিন ধরে থাকে, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।
প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে করণীয়
হরমোনের ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য চাই সচেতন জীবনযাপন ও কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস। যেমন-
১) সুষম ও প্রাকৃতিক খাদ্যগ্রহণ : পরিমিত ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত চিনি ও তেল পরিহার করতে হবে।
২) নিয়মিত ব্যায়াম : প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা, সাইক্লিং বা হালকা যোগব্যায়াম হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক।
৩) ঘুমের সঠিক রুটিন : রাতে ভালো ঘুম হলে কর্টিসল হরমোন কমে যায়, যা অন্যান্য হরমোনের কাজ সহজ করে।
৪) মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখা : প্রতিদিন কিছুটা সময় নিজের জন্য রাখা, প্রার্থনা, ধ্যান, পছন্দের কাজে সময় দেওয়া মানসিক চাপ কমায়।
৫) রসায়নমুক্ত পণ্য ব্যবহার : প্লাস্টিক, প্যারাবেন ও সালফেটযুক্ত প্রসাধনী হরমোন বিভ্রাট ঘটাতে পারে, তাই সাবধানতা জরুরি।
৬) চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া : যেকোনো অনিয়মিত লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হরমোন পরীক্ষা করে নেওয়া ও প্রয়োজনে ওষুধ গ্রহণ করা দরকার।
হরমোনের ভারসাম্যে সুস্থ জীবন
আজকের ব্যস্ত জীবনযাত্রায় হরমোনের ভারসাম্যহীনতা যেন নীরবে শরীরকে ক্ষয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে মাসিক চক্র থেকে শুরু করে গর্ভধারণ, ওজন নিয়ন্ত্রণ, ত্বকের উজ্জ্বলতা, চুলের স্বাস্থ্যÑ সবই হরমোনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই এসব সংকেতকে উপেক্ষা না করে শুরু থেকেই সচেতন হওয়া জরুরি।
শরীরের ভেতরের ভারসাম্য ঠিক না থাকলে বাইরের যত্ন, প্রসাধনী বা চিকিৎসাও বেশিরভাগ সময় অকার্যকর হয়ে পড়ে। ভেতরের এই নিয়ন্ত্রক যন্ত্রপাতি অর্থাৎ হরমোন যদি ঠিকমতো কাজ করে, তাহলেই শরীর, ত্বক, চুল এমনকি মনও ভালো থাকে।
সুস্থ ও সুন্দর জীবন গড়তে চাইলে শুধু বাইরের যত্ন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন নিজের ভেতরের প্রতি যত্নশীল হওয়া। হরমোন ঠিক থাকলে শরীর ঠিক থাকবে— এই সহজ সত্যটিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিদিনের অভ্যাস ও সিদ্ধান্ত গড়তে হবে। কারণ, ভেতরের ভারসাম্যই বাহ্যিক দীপ্তিময়তার আসল চাবিকাঠি।