আমির খসরু সেলিম
প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০২৫ ১৬:৩৬ পিএম
রুহান তখন একদম পুঁচকে। হাতের কাছে কিছু পেলেই চেপে ধরে। তার পর সেটা চোখের সামনে আনার চেষ্টা করে। একটু শুঁকে দেখে। একটু চাটেও। তার পর ছুড়ে ফেলে দেয়। শুঁকে দেখা বা চোখে দেখা পর্যন্ত ঠিক ছিল। কিন্তু ‘চেখে’ দেখাটা মোটেই ভালো কথা নয়। রুহানের পেট খারাপ হতে পারে।
রুহান তখন একদম পুঁচকে। হাতের কাছে কিছু পেলেই চেপে ধরে। তার পর সেটা চোখের সামনে আনার চেষ্টা করে। একটু শুঁকে দেখে। একটু চাটেও। তার পর ছুড়ে ফেলে দেয়।
শুঁকে দেখা বা চোখে দেখা পর্যন্ত ঠিক ছিল। কিন্তু ‘চেখে’ দেখাটা মোটেই ভালো কথা নয়। রুহানের পেট খারাপ হতে পারে।
আমি সতর্ক হলাম। যতটা পারি আটকালাম। তার পরও সে যা হাতের নাগালে পেয়েছিলÑ মায়ের চুল, রাবারব্যান্ড, কলম, নোটপ্যাড, মগ, বই আর আমার চশমা এবং আরও অনেক কিছু।
এর পর সে হাতে শুধু দুটো জিনিসই নিত। দুধের ফিডার আর সেলফোন।
সেলফোন বা মোবাইল ফোন বলুন, জিনিসটা শিশুদের হাতে দেওয়া কোনোভাবেই ঠিক না। কিন্তু ওটা হাতে না পেলে রুহান অদ্ভুত এক কাণ্ড করত।
প্রথমে ওল্টাত ঠোঁট। তার পর চার হাত-পা ছড়িয়ে দিত চারদিকে। লম্বা একটা নিঃশ্বাস নিত, ফুলিয়ে তুলত পেট। তার পর শুরু করত বিকট চিৎকার। সেই চিৎকার থামত হাতে শুধুই ফোন পেলে।
প্রচুর অনিচ্ছা থাকলেও ওর হাতে ফোন দিতে বাধ্য হতাম। না হলে সেই চিৎকারে প্রায় পুরো বিল্ডিং কাঁপত। দলে দলে প্রতিবেশীরা খোঁজ নিতে আসতেন।
রুহানের বয়স যখন দুই, তখনই সে ইউটিউব সার্চ দিতে পারে। চার বছর বয়সে সে পাঁচটা ভাষা জানে। বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, চাইনিজ আর রাশিয়ান।
অন্যরা চমকিত হলেও আমি হই না। মানে, পুরনোগুলোতে আর হই না। কারণ রুহান নিয়মিত আমার জন্য সারপ্রাইজের ব্যবস্থা করে। সে এগুলো শেখে ইউটিউব দেখে। তার ওপর আবার নিজের চিন্তাভাবনা প্রয়োগ করে।
এক দিন অফিস থেকে বাসায় এসেছি। নবে চাবি ঢুকিয়ে মোচর দিয়ে কেবল একটা পা ঘরের ভেতর রেখেছি, অমনি প্রথমে একটা ছোট বস্তা মাথায় পড়ল, কী যেন গুঁড়ার মতো ছড়িয়ে পড়ল সারা গায়ে। মনে হয় আটা বা ময়দা। এরপর একটা প্লেট উড়ে এসে সারামুখে নরম ক্রিম ঠেসে দিল। একটা বক্সিং গ্লাভস এসে পেটে দিল ঘুসি। এরপর একটা প্লাস্টিকের বালতি মাথায় চেপে বসল। আর আমি মেঝেতে ধড়াম।
এসবও নাকি সে ‘নেট’ থেকে শিখেছে। ভাগ্যিস সেদিন হাড়গোড় ভাঙেনি। রাতে আমি বিছানায় শুয়ে ব্যথায় কো-কো করছি, ওর মা কী যেন একটা অয়েটমেন্ট মাখিয়ে দিচ্ছে আর ফিস ফিস করে হাসছে, আর রুহান লেকচার দিচ্ছেÑ আমারই নাকি আরও সতর্ক হওয়া উচিত। জীবনযুদ্ধে জয়ী হতে গেলে নাকি এসব ট্রাপ থেকে বাঁচার কৌশল জানতে হবে...।
আমি বিশেষ কথা বললাম না। ছেলে আমার চেয়ে আধুনিক। ওদের জেনারেশনে সঙ্গে টক্কর দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
কয়েক দিন আগে রুহান এসে জানাল, সে অ্যানিমেটর হতে চায়।
আমি বললাম, ‘বেশ তো, হও। কী লাগবে?’
আমার প্রাইভেসি লাগবে।
ওর মা কাছেই ছিল। প্রায় উড়ে এসে বলল, ‘তুই তো একা বাথরুমেই যেতে পারিস না। তোর আবার প্রাইভেসি কী?’
রুহান গম্ভীর হয়ে বলে, ‘প্রাইভেসি লাগবেই। ডিস্টার্ব করলে আমি কাজ করতে পারব না। এই দেখো আমার নতুন অ্যানিমেশন।’
আমরা দেখলাম কম্পিউটারের মনিটরে। একটা রসগোল্লার মতো বলের সঙ্গে কাঠির মতো হাত-পা লাগানো একটা মানুষের মতো কিছু। সেটা কয়েক পা হেঁটে হঠাৎ করে লাফাতে থাকে।
সত্যি সত্যি একটা অ্যানিমেশনের নমুনা দেখে ওর মা প্রাইভেসির ব্যাপারটা মেনে নিল।
রুহান অবশ্য আমার কানে কানে বলল, বাবা, কিছুদিন তুমি আমার বাথরুমের সময় দরজায় দাঁড়িয়ে থাকবে। মাকে বলো না যেন।
আমি হাসলাম।
কয়েক মাস পর এক দিন রাত দুটোয় রুহানের ডাকে ওর রুমে গেলাম। ও আমাকে যা বলল, আমি অবাক। তার পর ডেকে আনলাম ওর মাকে। সব শুনে সে-ও অবাক।
ঘটনা এই রুহান একটা পাঁচ মিনিটের অ্যানিমেশন মুভি একটা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে সেল করেছে মাত্র ১ হাজার ডলারে।
মানে লাখখানেক টাকা। আমার বা ওর মায়ের বেতনও অত নয়।
এর পর? এর পর আর কী? আমরা সবাই মেনে নিলাম রুহান এই অল্প বয়সেই একজন দারুণ ‘অ্যানিমেটর’ হয়ে গেছে। সে-ও দেখলাম ওর রুমের দেয়ালে লিখে রেখেছেÑ BUSY ANIMATOR