নিয়ন দুলাল
প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৫ ১৫:২৩ পিএম
কাকডাকা ভোরে গরুর গলায় ঘণ্টার আওয়াজ, কাঁধে লাঙল-জোয়াল নিয়ে জমির দিকে হেঁটে যাওয়া কৃষকের দৃশ্য একসময় ছিল বাংলার পল্লীজীবনের চিরচেনা রূপ। গরু দিয়ে হালচাষ শুধু একটি চাষাবাদ পদ্ধতি নয়, এটি ছিল গ্রামীণ কৃষকের জীবনযাত্রার অনুষঙ্গ। পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া ঐতিহ্যের প্রতি গভীর মমতামাখা সেসব দিন এখন কেবলই স্মৃতি। সময়ের স্রোতে হারিয়ে যেতে বসেছে বাঙালি জীবনের সাদামাটা ঐতিহ্য।
লালমনিরহাটসহ দেশের কৃষিনির্ভর এলাকায় একসময় গরু দিয়ে জমি চাষ ছিল কৃষকের নিত্যসঙ্গী। কৃষকের ঘরে দুটি গরু থাকাই ছিল গর্বের বিষয়। নিজেদের জমির পাশাপাশি অন্যের জমিতে হালচাষ করে অনেকেই জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে চাষাবাদের দৃশ্যপট। ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলারের ব্যবহার বেড়েছে বহুগুণ। সময় ও খরচ কম লাগায় কৃষকরাও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন গরু দিয়ে হালচাষ থেকে। এখন এটি ব্যয়সাধ্য, সময়সাপেক্ষ ও শ্রমনির্ভর। ফলে ধীরে ধীরে গ্রামবাংলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী কৃষি পদ্ধতি। তবুও কখনও কখনও দেখা মেলে হারিয়ে যাওয়া সময়ের চিহ্নের।
সম্প্রতি লালমনিরহাট সদর উপজেলার মহেন্দ্রনগর এলাকায় দেখা যায় গরু দিয়ে হালচাষের এক ব্যতিক্রমী দৃশ্য। সেখানকার কৃষক আব্দুল হালিমের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘অনেক দিন পর আমরা দুজন জমিতে মই ও হাল দিচ্ছি। ভালোই লাগছে। আগে গরু ছাড়া হালচাষ কল্পনাই করা যেত না। এখন যন্ত্রে দ্রুত কাজ হয় ঠিকই, কিন্তু ঐতিহ্যের প্রতি মায়া থেকেই গরু দিয়ে জমি চাষ করি।’
পুরনো দিনের টানে এখনও কেউ কেউ বাড়ির আঙিনায় রেখে দিয়েছেন লাঙল ও মই। সেগুলো যেন এক হারিয়ে যাওয়া সময়ের নিঃশব্দ সাক্ষ্য। একসময় লালমনিরহাট সদর ছিল কৃষিপণ্যের প্রাণকেন্দ্র। এখানে প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে জমজমাট হাট বসত। গরুর গাড়ির চাকা, লাঙল, জোয়াল, মইসহ গ্রামীণ কৃষিপণ্য কেনার জন্য ভিড় করতেন কৃষকরা। আজ সে হাটও হারিয়ে গেছে, নেই সেই শব্দ, নেই প্রাণ।
লালমনিরহাটের পাঁচটি উপজেলাতেই আধুনিক কৃষির প্রভাব স্পষ্ট। ফলন বেড়েছে, সময় বাঁচছে। তবে হারিয়ে যাচ্ছে সেই চিরচেনা দৃশ্যপট। কাঁধে লাঙল-জোয়াল ও হাতে গরুর দড়ি নিয়ে ভোরের আলোয় মাঠে যাওয়া কৃষকের নির্ভেজাল পথচলা আর চোখে পড়ে না। কানে বাজে না ‘হেই, হেট, হেট’ শব্দে গরুকে পথ দেখিয়ে নেওয়ার সেই অভিনব কায়দা। রাখালের কণ্ঠে নেই সেই চিরচেনা রাখালিয়া সুর আর নেই মেঠোপথও।
কৃষিবিদদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির প্রসারে গরু দিয়ে হালচাষ বিলুপ্ত হতে চলেছে। এখন আধুনিক সহজলভ্য যন্ত্রপাতি, গরুর উচ্চমূল্য এবং গো-খাদ্যের খরচ বৃদ্ধির ফলে কৃষিকাজে কৃষকরা আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছেন। গরুর ব্যবহারও ক্রমেই কমে আসছে। বর্তমানে যারা গরু পালন করছেন, তারা মূলত বাণিজ্যিক খামারের উদ্দেশ্যে পালন করেন, হালচাষের জন্য নয়।
বড়বাড়ী এলাকার প্রবীণ কৃষক আজাহার আলী স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘ভোরের আলো ফোটার আগেই গরু নিয়ে মাঠে যেতাম। গরু ছিল শুধু পশু নয়, পরিবারের মতো। এখন সব যন্ত্রে হয়, কিন্তু সেই মাটির টান আর গরুর সঙ্গে যে হৃদয়ের সম্পর্ক ছিল, তা আর ফিরে আসে না।’
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. সাইখুল আরিফিন বলেন, ‘গরু-মহিষ দিয়ে হালচাষ পরিবেশবান্ধব হলেও সময়ের দাবি মেটাতে আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার জরুরি। কৃষিকে টেকসই ও লাভজনক করতে প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতেই হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘লালমনিরহাটে এখন আর আগের মতো গরু দিয়ে হালচাষ দেখা যায় না। দুয়েকজন ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখলেও, সময়ের পরিবর্তনে সেটিও হয়ত একদিন ইতিহাসে পরিণত হবে।’
বাংলার মাটির গন্ধমাখা কৃষি ঐতিহ্য হারিয়ে গেলেও, কিছু হৃদয়ে আজও বেঁচে আছে সেই লাঙল-জোয়ালের স্মৃতি। হয়ত সময়ের বিবর্তনে লাঙল-জোয়ালের ব্যবহার বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাঙালি মানসে এই রেশ রয়ে যাবেই ইতিহাস ও ঐতিহ্য।