ইসতিয়াক আহমেদ
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৫ ১১:৪২ এএম
আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৫ ১১:৪৮ এএম
ঘুরে ঘুরে ঘোরাঘুরি করতে করতে আবারও বেরিয়ে পড়ে ছিলাম। তবে এ যাত্রায় আমাদের গন্তব্য ভারত মহাসাগরের বুকে নাশপাতি বা আমের আকৃতির এক দ্বীপদেশ, যার নাম শ্রীলঙ্কা। যে দেশটিকে কি না ভারতীয় উপমহাদেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে মান্নার উপসাগর ও পল্ক প্রণালী। প্রাকৃতিক নৈসর্গ, ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থান এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে সমৃদ্ধ এই এশিয়ার দেশটিতে আমার ঘুরুঞ্চিপনা নিয়েই পয়েন্ট অব ভিউ-শ্রীলঙ্কা।
বিভিন্ন কাজের চাপে দীর্ঘদিন কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয় না। একের পর এক লম্বা ছুটি চলে যাচ্ছে, কিন্তু ব্যাটে-বলে না মেলায় হচ্ছে না ঘোরাঘুরি। তাই অনেকটাই হঠাৎ প্ল্যানের টানা বুদ্ধপূর্ণিমাসহ তিন দিনের ছুটিতেই বেরিয়ে পড়লাম আমরা আদি সিলন নামে বিখ্যাত শ্রীলঙ্কার পথে।
এ যাত্রায় আমাদের যাত্রায় সাথী Fits Air, রাত ২ : ১৫ মিনিটে। সমুদ্রবেষ্টিত দেশ হিসেবে শ্রীলঙ্কার আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ। অক্টোবর ও নভেম্বরে বৃষ্টিপাত হওয়ার কারণে পর্যটকরা মূলত এ সময়ে সচরাচর শ্রীলঙ্কা ভ্রমণ করেন না। চা, কফি, নারিকেল, রাবার জন্য বিখ্যাত সিলনখ্যাত এই শ্রীলঙ্কা। শ্রীলঙ্কায় রয়েছে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যসংবলিত সমুদ্রসৈকত ও পাহাড়ি অঞ্চল। সেই সঙ্গে সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, শ্রীলঙ্কাকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

প্রায় সাড়ে ৩ ঘণ্টার ফ্লাইট শেষে স্থানীয় সময় ভোর ৫টা ১৫ মিনিটে নামলাম আমরা কলম্বো বন্দরনায়েক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। মানি এক্সচেঞ্জ, সিম নিতে নিতেই চলে এসেছে আমাদের জন্য নির্ধারিত গাড়ি ও গাইড। এ যাত্রায় আমরা থাকব বেনটোটাতে, শ্রীলঙ্কার দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত বেনটোটা শহর সমুদ্রসৈকতের জন্য বিখ্যাত। এয়ারপোর্ট হতে প্রায় ৮০ কিলোমিটার এই বেনটোটা। ভারত মহাসমুদ্রবেষ্টিত শহর হিসেবে শহরটিতে অনেকগুলো রিসোর্ট রয়েছে। এখানে সার্ফিংসহ রয়েছে বিনোদনের নানান ব্যবস্থা রয়েছে আর তাইতো বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন এখানে।
সুন্দর গোছানো ও পরিচ্ছন্ন দেশ শ্রীলঙ্কা। আর তার প্রমাণ পাওয়া যায়, শ্রীলঙ্কার পথঘাটজুড়েই। প্রায় দেড় ঘণ্টার জার্নি শেষে আমরা এসে পৌঁছালাম আমাদের জন্য নির্ধারিত রিসোর্ট Turyaa Kalutara তে। একদম সাগরের সঙ্গে লাগোয়া ফাইভস্টার সমমানের যে রিসোর্ট। শ্রীলঙ্কার আবহাওয়া আমাদের তুলনায় বেশ গরম। সেই সঙ্গে বাতাসের আর্দ্রতাও অনেক বেশি, আর তাই গরমের অনুভূতিটা একটু বেশিই হয় এখানে। শ্রীলঙ্কা আসার পূর্বে সেই অনুযায়ী জামাকাপড় আনতে ভুলবেন না।
-6874990ee1862.jpg)
মূলত রুমে ফ্রেস হলে বেরিয়ে পড়লাম হোটেলের চারপাশ সেই সঙ্গে ভারত মহাসাগরের পাড়ে ঘুরতে। আমাদের দেশের সাগরের তুলনায় এখানে সাগর অনেক বেশি উত্তাল। বড় বড় ঢেউ এসে আছরে পড়ে হলদে বালুর এই সৈকতে। সার্ফিং করার জন্য বেশ ভালো জায়গা এই হোটেল লাগোয়া বিচ।

শ্রীলঙ্কান খাবারে শুকনো মরিচ ও নারকেল ব্যবহারে আধিক্য লক্ষণীয়। সারা রাত জেগে যেহেতু এসেছি আমরা তাই দুপুরে খানিক রেস্ট নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম শহর ঘুরতে। একমাত্র হেঁটেই একটা শহর সব থেকে ভালোভাবে দেখা যায়, বোঝা যায় স্থানীয়দের জীবনযাত্রার ধরন। আর তাই বেরিয়ে পড়লাম এই শ্রীলঙ্কার পথে। ঘুরতে ঘুরতে অনেক রাত অলরেডি হয়ে গেছে, তাই ঢুকে পড়লাম বিখ্যাত সি সেল রেস্টুরেন্টে। আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি শুনেই রেস্টুরেন্টের ব্যাকগ্রাউন্ডে প্লে করল বাংলাদেশি সব গান।
অতঃপর রাতে রুমে ফিরে আসলাম ফ্রেশ হয়ে আবারও বেরিয়ে পড়া বিচের ধারে। রাতে যেন আরও একটু বেশিই সুন্দর এই Turyaa Kalutara হোটেলটি। সকালে উঠেই ফ্রেশ হয়ে ছুটলাম। Turyaa kalutara এর বুফে ব্রেকফাস্টে। নানান পদের নানান খাবারের আয়োজন এই বুফেতে। এখানে পাবেন শ্রীলঙ্কান নিজস্ব কিছু খাবারের খোঁজ। শ্রীলঙ্কায় খাবারের স্বাদ অনেকটাই আমাদের দেশের খাবারের মতোই।
ব্রেকফাস্ট করে রেডি হতে না হতেই চলে এলো আমাদের জন্য নির্ধারিত গাড়ি। শ্রীলঙ্কা ট্রিপের পুরো সময়জুড়েই আমাদের জন্য নির্ধারিত ছিল এই ট্যুরিস্ট বাস। আমরা মাত্র ১০ জন টিম ঘুরুঞ্চি এ যাত্রায় ঘুরে বেড়াচ্ছি বিখ্যাত সিলনজুড়ে।
অতঃপর পথচলা শুরু। নানান শহর ও লোকালয় পেরিয়ে সাগরের পার ধরে ছুটে চলছি আমরা। শ্রীলঙ্কার উপকূলীয় এই অঞ্চলটি ওয়াডডুয়া থেকে টিসামহারামা পর্যন্ত বিস্তৃত। কালুতারা, বেরুওয়ালা, বেন্টোটা, ডেডডুয়া, মাদু গঙ্গা, বালাপিটিয়া, আহুঙ্গাল্লা এবং হিক্কাডুয়ার মতো উপকূলীয় স্থান এই অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত।

প্রথমেই আমরা বিরতি দিলাম মাদু গঙ্গা বোট সাফারির জন্য। bentota থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটারের পথ এই মাদু গঙ্গা বোট সাফারি। মূলত মাদু নদীর প্রায় ৬১ হেক্টর জায়গাজুড়েই ম্যানগ্রোভ বন। আর তা নিয়েই মাদু গঙ্গা বোট সাফারি। প্রায় ১.৫ ঘণ্টার এই বোট সাফারি ঘুরে বেড়ায় ৬৪টি ছোট দ্বীপ। এখানে ১.৫ ঘণ্টার জার্নির জন্য তারা জনপ্রতি ৪০০০ রুপি চায়, কিন্তু একটু দামাদামি করতেই তা ২৫০০ রুপিতে নামিয়ে আনা সম্ভব। এই মাদু রিভার সাফারিতে সোয়াম ফরেস্ট ঘোরা সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায় দারুচিনির বন। সেই সঙ্গে করা যায় ফিস স্পা। নদীর ধারে গড়ে ওঠা সুন্দর রেস্টুরেন্টগুলো। পারফেক্ট প্লেস দেওয়ার জন্য খানিক কফির আড্ডা।

এখানেই পাবেন বিখ্যাত ক্যাপ্টেন বোট হাউস। সুন্দর এক প্রাচীন জাহাজের জাদুঘর। যেখানে আছে কি না শত শত বছরের পুরনো সব জাহাজে ব্যবহৃত জিনিসপত্র। যদি চান তবে এখানেও দিয়ে দিতে পারেন খানিকটা আড্ডা।শ্রীলঙ্কা মানেই যেন চা আর নারকেল। তাই শ্রীলঙ্কা এসে ডাবেন পানি না খেলে যে শ্রীলঙ্কা ট্যুর অসম্পন্নই থেকে যাবে। ডাবে দাম এখানে ২০০ রুপি, যা কি না বাংলা টাকায় প্রায় ৮০ টাকা।
ডাব খেয়ে আবারও পথ ধরা এবার পরবর্তী গন্তব্য আমাদের, Turtles beach. শ্রীলঙ্কার Hikkaduwa তে অবস্থিত এই টার্টল বিচ। সকালে বিশেষ করে ৭টা হতে ৯টার মধ্যেই প্রচুর পরিমাণে বড় বড় কচ্ছপ চলে আসে এই বিচে। তুলনামূলক ছোট এই বিচটিই, সারা পৃথিবী থেকে আসা পর্যটকদের পদচারণায় থাকে মুখর সব সময়। স্বচ্ছ পানির পরিষ্কার সাগর সৈকত। যেখানে আছে কি না সান বাথসহ আরও নানান অ্যাক্টিভিটি করার সুযোগ। যেখানে কিন্তু পানিতে সাঁতার কাটতে পারবেন বড় বড় কচ্ছপের সঙ্গেই। শ্রীলঙ্কা ঘুরতে আসতে তাই হিক্কাডুয়ার এই বিচকে মাস্ট ভিজিট প্লেস হিসেবে লিস্টে রাখতেই হবে।

হিক্কাডুয়া ঘুরে আবারও পথ ধরা, এবার সরাসরি গন্তব্য বিখ্যাত গলে। সাগরের ধার ঘেঁষে চলে যাওয়া যে পথ ধরে ছুটছি আমরা ইতিহাসের পথে। কত শত ইতিহাসের সাক্ষী এই অঞ্চল। কলম্বো থেকে ১১৯ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বাংশে এই গলে শহরের অবস্থান। শহরটি শ্রীলঙ্কার দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশের প্রশাসনিক রাজধানী হওয়ার পাশাপাশি গলে জেলারও রাজধানী।
ষোড়শ শতকে পর্তুগিজরা যখন এখানে আসে তখন এটি গিমাথিথ্থা নামে পরিচিত ছিল। এর পূর্বে চতুর্দশ শতকে বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা এ শহরটিকে ‘কালি’ নামে উল্লেখ করেছিলেন। ওই সময় দ্বীপরাষ্ট্রটির প্রধান বন্দর হিসেবে এক গল পরিচিতি পায়। পৃথিবীর অন্যতম দর্শনীয় ও ছবিসদৃশ্য স্টেডিয়ামটি কিন্তু গলেতেই। বিশ্বের সবচেয়ে মনোরম ক্রিকেট মাঠ হিসেবে যা বিবেচিত হয়। এই মাঠটিও সুনামিতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তীতে মাঠটি পুনর্নির্মাণ করা হয় এবং ১৮ ডিসেম্বর ২০০৭ সালে সেখানে টেস্ট ম্যাচ পুনরায় শুরু হয়।
গলে গিয়েই সবার প্রথমে চোখ আটকে যাবে বিখ্যাত গলে লাইট হাউসে। ১৬৫০-এর দশকের শেষের দিকে এই অঞ্চলে কর্মরত ডাচমন্ত্রী ফিলিপাস বালডেউস তার ‘আ ট্রু অ্যান্ড এক্সাক্ট ডেসক্রিপশন অব দ্য মোস্ট সেলিব্রেটেড ইস্ট-ইন্ডিয়া কোস্টস অব মালাবার অ্যান্ড করোম্যান্ডেল অ্যান্ড অ্যালডো অব দ্য আইল অব সিলন’ (১৬৭২) বইয়ে গ্যাল হারবার সম্পর্কে তার পর্যবেক্ষণের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন যে, প্রাচীরের ওপর একটি লোহার কামান স্থাপন করা হয়েছিল এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৮ ফুট উঁচু পাথরের ওপরে নাবিকদের পথ দেখানোর জন্য একটি লণ্ঠন ছিল, যা সমুদ্রে বেরিয়ে এসেছিল। তার সেই লেখা থেকেই বোঝা যায় গলের লাইট হাউস কতটা প্রাচীন।

এই জায়্গাটিই মূলত গল ফোর্ট। এই গল ফোর্ট ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা জীবন্ত এক স্থাপনা; যা প্রথমে ১৫৮৮ সালে পর্তুগিজদের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল, পরে ১৬৪৯ সাল থেকে ১৭ শতক পর্যন্ত ডাচদের দ্বারা ব্যাপকভাবে সুরক্ষিত করা হয়েছিল। এটি একটি ঐতিহাসিক, প্রত্নতাত্ত্বিক স্মৃতিস্তম্ভ, যা ৪৩৭ বছরেরও বেশি সময় পরেও রয়েছে ঠিক আগের মতোই।

গল বিখ্যাত তার সাগর সৈকতের জন্যও। স্বচ্ছ নীল পানির সৈকত এই পুরো গলজুড়েই। যদিও সব জায়গায় নামা যায় না পানিতে। গলে ঘুরতে আসলে যদি পানিতে নামতে চান তবে নামবেন লাইট হাউজের পাশের বিচে। শ্রীলঙ্কার ঔপনিবেশিক শাসনের গোড়াপত্তন হয়েছিল যেসব শহরে, সেগুলোর মধ্যে গল অন্যতম। গল ফোর্ট এখন ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্বঐতিহ্যের অংশ। এই শহরের সর্বত্র ইউরোপীয় স্থাপত্যকলার উপস্থিতি সহজেই চোখে পড়বে। এই শহরটি প্রথম প্রতিষ্ঠা করেছিল পর্তুগিজরা। পরবর্তীতে ডাচ ও ব্রিটিশদের হাতে এর নিয়ন্ত্রণ ছিল।
দুর্গের মধ্যে মেরিটাইম জাদুঘর এবং প্রত্নতাত্ত্বিক প্রদর্শনীগুলো দেখতে পারেন। শ্রীলঙ্কার গলে অবস্থিত জাতীয় সমুদ্র জাদুঘর বা জাতীয় সমুদ্র প্রত্নতত্ত্ব জাদুঘরটি গলে দুর্গের মধ্যে অবস্থিত। এটি সর্বপ্রথম ৯ মে ১৯৯২ সালে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয় এবং গলে দুর্গের পুরাতন গেটের ওপরে ১৬৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি ডাচ গুদামে যা কি না অবস্থিত। ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর সুনামির আঘাত থেকে জাদুঘরটি রক্ষা পেলেও সংলগ্ন ইউনেস্কোর সমুদ্র প্রত্নতত্ত্ব ইউনিট সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায় এবং সমস্ত প্রদর্শনী বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বেশিরভাগ সামুদ্রিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হারিয়ে যায়।
দুপুরে বসে পড়লাম গলের বিখ্যাত গ্লোবাল কিচেন অ্যান্ড ক্যাফেতে দুপুরের লাঞ্চ করার জন্য। আমাদের এ যাত্রায় লাঞ্চের আইটেম মাটন বিরিয়ানি। আর যাই হোক এই প্রথম মনে হলো, বিরিয়ানি খাবার জন্য বাংলাদেশই সেরা জায়গা। শ্রীলঙ্কায় খাবারের দাম যেমন অনেক তেমনি টাকার মান ও অনেক কম। প্রতিবেলায় মোটামুটি মানের খাবার খেতে চাইলেও খরচ পড়বে ২৫০০-৪০০০ রুপি।

এই ফোর্টের মাঝেই থাকা Dutch Reformed Church এ যদি ঘুরতে ঘুরতে ঢুকে পড়েন তবে দেখবেন তার মেঝে জুড়েই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কত শত প্রাচীন কবর। হঠাৎ করেই আমার চোখ আটকে গেল ১৭৯ বছরের পুরনো একটি এপিটাফে - EDMUND BUCKLE এর। যিনি কি না BENTINCK STEAMER এর বেঙ্গল রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন ছিলেন। ১৮৪৬ সালে মাত্র ৩৮ বছর ৮ মাস বয়সে আমাদের তৎকালীন বাংলা থেকে ইংল্যান্ড যাওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়েছিল এই গলে। তিনি সমাধিত আছেন এই ডার্চ রিফর্ম চার্চেই। গলে আছে দেখার মতো অনেক কিছুই। এখানে আছে, সেন্ট অল সেন্টস চার্চ, কালুতারা মন্দির, সিনিগামা মন্দির, সন্ধ্যায় এই ফোর্টের দেয়ালে হাঁটাও অনেক উপভোগ্য। তবে নকল প্রাচীন ডাচ কয়েন বা পাউডার দুধ বিক্রি করতে চাওয়া লোকদের কাছ থেকে বিরক্ত হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। এখানেই আছে পিস প্যাগোডা, ডাচ রিফর্মড চার্চ, আছে ১৮৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত আরবি কলেজ (আল বাহজাতুল ইব্রাহিমিয়া আরবি কলেজ)।

শত শত বছরের পুরনো এই শহর। পুরনো এই পথঘাট জুড়েই অন্যরকম এক অনুভূতি। শহরজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রেস্টুরেন্টগুলোতে আড্ডা দিয়েই কাটিয়ে ফেলা সম্ভব পুরো একটা বেলা। বেলা শেষ হয়ে আসছে। এবার ফিরতি পথ ধরার পালা। আমরা আবারও ফিরে চলছি কালুটারার পথে। শ্রীলঙ্কার এই অঞ্চল সাক্ষী হয়েছিল ভয়ংকর সুনামির। যার ক্ষত আজও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পুরো উপকূলীয় অঞ্চল জুড়ে। অনেক মানুষ হারিয়েছিল প্রাণ, অনেকেই হারিয়েছিল সবটুকু সম্বল। সুন্দর এই সাগর পাড় ধরে ছুটতে ছুটতে আনমে শোনা যায় সেই হাহাকার। দিনের আলো নিভে আসছে এবার ঘরে ফেরার পালা।
তখন প্রায় রাত নয়টা, ফিরলাম আমরা যখন হোটেলে। অপূর্ব সুন্দর এক দেশ এই শ্রীলঙ্কা। সুন্দর দেশটির মানুষগুলোও। সাগর পারে যথারীতি বসে থাকতে থাকতে সময় কখন চলে যাচ্ছে টেরই পাইছি। আজ আমাদের শেষ রাত কালুটারায়। সকাল হতেই বেরিয়ে পড়ব আমরা। আপাতত অপেক্ষা সকাল হওয়ার।
আজ মূলত তৃতীয় দিন আমাদের, অসাধারণ শ্রীলঙ্কা নয়নাভিরাম Turyaa Kalutara তে। আর তাইতো সকালে প্রথমেই ফ্রেশ হয়ে বুফে ব্রেকফাস্টে যাওয়ার পালা। আজ মূলত বৌদ্ধ পূর্ণিমার ছুটি আর তাইতো স্থানীয় প্রচুর মানুষ ছুটি কাটাতে এসেছেন এই হোটেলে। যেহেতু আজ স্থানীয় মানুষের আনাগোনা বেশি তাই খাবারের আইটেমেও আজ শ্রীলঙ্কান স্থানীয় খাবারের আধিক্যতা বেশিই।
কলম্বো হলো শ্রীলঙ্কার পশ্চিম উপকূলীয় একটি শহর যা কি না একই সঙ্গে শ্রীলঙ্কার নির্বাহী ও বিচার বিভাগীয় রাজধানী ও প্রধান সমুদ্রবন্দর। তবে প্রশাসনিক রাজধানীকে কলম্বো-সংলগ্ন শ্রী জয়বর্ধনপুর কোট্টে শহরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কলম্বো শহরটির পূর্ব নাম ছিল কালান-তোত্তা, যার অর্থ কেলানি নদীর ফেরিঘাট। আরব নাবিকেরা এর বিকৃত নাম দেয় কালাম্বু। ১৫১৭ সালে পর্তুগিজেরা ক্রিস্টোফার কলম্বাসের সম্মানে শহরের নাম বদলে কলম্বো রাখে।

কলম্বো শহরে ঢুকেই প্রথমে চলে গেলাম বিখ্যাত ইন্ডিপেনডেন্ট মেমোরিয়াল হলে। যা হলো শ্রীলঙ্কার একটি জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ, যা ব্রিটিশ শাসন থেকে শ্রীলঙ্কার স্বাধীনতার, স্মরণে নির্মিত হয়েছিল। মূলত ১৯৪৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি যে স্থানে গ্লুচেস্টারের ডিউক প্রিন্স হেনরি কর্তৃক প্রথম সংসদ উদ্বোধনের মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসনের সূচনা উপলক্ষে আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেই স্থানেই এই স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মিত হয়েছিল। মূলত আমাদের মতো ব্রিটিশ শাসনে থাকা শ্রীলঙ্কা যার কি না তৎকালীন নাম। সিলন আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে এবং ৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৮।
কলম্বো লোটাস টাওয়ার হলো শ্রীলঙ্কার কলম্বো শহরে অবস্থিত একটি টাওয়ার। বর্তমানে এটি দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ টাওয়ার। এই টাওয়ারটি প্রথমে নির্মাণের কথা ঠিক হয় পেলিয়াগোডা এলাকায়, পরে শ্রীলঙ্কা সরকার এটি কলম্বোতে নির্মাণ করেন। ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ এটি উদ্বোধন করা হয়। যদি চান তবে উঠে পড়তে পারেন দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ এই ভবনেও। তবে তা কিন্তু ফ্রি তে নয়। যদি চান লোটাস টাওয়ারে উঠতে তবে খরচ করতে হবে জনপ্রতি ৬০০০ শ্রীলঙ্কান রুপি। যা কি না বাংলা টাকায় ২৫০০ টাকার সমতুল্য।

শ্রীলঙ্কার এই কলম্বো শহরে বিখ্যাত বিচ হলো, গল ফেস বিচ, যা কি না গল ফেস গ্রিনের সঙ্গেই লাগোয়া। ১৮৫৯ সালে গভর্নর স্যার হেনরি জর্জ ওয়ার্ড এই স্থানটি তৈরি করেছিলেন। এককালে যা ব্যবহৃত হতো রেসকোর্স ও গলফ কোর্স হিসেবে। বর্তমান এই স্থানটি উন্মুক্ত সবার জন্য। প্রতি বছর শ্রীলঙ্কার জাতীয় দিবস উদযাপনের স্থান হিসেবেও ব্যবহৃত হয় এই স্থানটি। এই স্ট্রিপের সীমানায় দুটি বড় হোটেল রয়েছে : সিলন ইন্টার কন্টিনেন্টাল হোটেল এবং অন্যটিতে গল ফেস হোটেল, শ্রীলঙ্কার প্রাচীনতম এবং সর্বাধিক জনপ্রিয় হোটেলগুলোর মধ্যে যা অন্যতম।

গল ফেস বিচ ঘুরে ঢুকে পড়লাম পুরনো কলম্বো দেখতে সেই সঙ্গে ঘুরতে শ্রীলঙ্কার ব্যাংকপাড়া। ঘুরতে ঘুরতে চলে এলাম রেড মসক নামে বিখ্যাত Jami Ul-Alfar Mosque মসজিদে। এলাকাটা অনেকটাই আমাদের পুরান ঢাকার মতোন। এলাকাটি মূলত মুসলিম অধ্যুষিত বাণিজ্যিক এলাকা। যদি চান কেনাকাটা করতে, তবে কম দামে কেনাকাটা করার জন্য অন্যতম সেরা জায়গা এটি। কিছুটা পথ পার হয়েই ঢুকে পড়লাম York রোডে।
কলম্বো সিটি ঘুরতে ঘুরতে দুপুর পেরিয়ে বিকাল হয়ে এলো এবার যে ফিরতি পথ ধরার পালা। কারণ আজ রাত ৯টা ৩০ মিনিটে আমাদের ফ্লাইট ঢাকার উদ্দেশে। তাই দিনের আলো নেভার আগেই পথ ধরলাম এয়ারপোর্টের উদ্দেশে। কলম্বো শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে এয়ারপোর্ট।