মাসুম বিল্লাহ
প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৫ ১৭:২৩ পিএম
আঁকা : সুবাইতা বিল্লাহ, সপ্তম শ্রেণি, সরকারি করোনেশন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, খুলনা
মা বাঘ বলে, সে অনেক অ-নে-ক দিন আগের কথা। অমনি হালুম বলে ওঠে, ‘তোমার সব গল্পই কি অনেক অনেক দিন আগের, মাম্মি?’
‘উঃ হু, সব রূপকথার গল্পই অনেক অনেক দিন আগের কথা দিয়েই শুরু করতে হয়!’ মা বাঘ খানিকটা বিরক্তি নিয়ে বলল।
‘এটা কেমন কথা, মাম্মি?’ হালুম চোখ পিটপিট করে জানতে চাইল।
‘রূপকথার গল্পের এটাই নিয়ম।’
‘ও আচ্ছা আচ্ছা।’
‘তুই আজকাল বড্ড প্রশ্ন করিস রে হালুম!’
এ কথায় হালুম মায়ের কান কামড়ে ধরে। বলে, ‘কেন, প্রশ্ন করা কি খারাপ কিছু?’
‘না, তা নয়, তবে গল্প বলার সময় কেউ বারবার প্রশ্ন করলে গল্প বলে শান্তি পাওয়া যায় না।’ মা বাঘ বলে।
‘ও, ও বুঝেছি, বুঝেছি...।’ হালুম মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলল।
সত্যি সত্যি হালুম দিন দিন বেশ দুষ্টু হয়ে উঠছে। হালুমের বয়স মাত্র তিন মাস। সারাক্ষণ মায়ের সঙ্গে দুষ্টুমি করে বেড়ায়। কখনও মায়ের কান কামড়ে দেয়, কখনও পিঠে উঠে বসে থাকে। মা বাঘ কখনও খুব খুশি হয় ছেলের এই দুষ্টুমিতে, কখনও কখনও আবার বেশ বিরক্ত হয়। দুষ্টুমির সঙ্গে মায়ের কাছে গল্প শুনতেও হালুমের খুব ভালো লাগে। দিন নেই রাত নেই কেবলই ‘আমাকে গল্প শোনাও’ বলে বলে মাকে অস্থির করে ফেলে হালুম।
একবার তো মা বাঘ বলেই ফেলল, ‘হ্যাঁ রে হালুম, সারাক্ষণ গল্প শুনতে তোর ভালো লাগে?’
‘হ্যাঁ, খুব ভালো লাগে।’ হালুম মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলে।
‘আশেপাশে গিয়ে একটু ঘুরেটুরেও তো আসতে পারিস, নাকি?’ মা বাঘ বলে।
‘এইটুকু জায়গার ভেতর আবার ঘুরে বেড়ানো যায় নাকি?’ হালুম বেশ বিরক্তি নিয়ে বলল।
হালুমের কথায় মায়ের এবার মন খারাপ হয়ে যায়। আর কিছু না বলে হালুমকে নিজের কোলের কাছে টেনে নিয়ে আদর দিতে থাকে।
এভাবেই মা ও ছেলের দিন-রাত কেটে যায়।
এই সময় বাইরে একদল ছেলে-মেয়ের চিৎকার, হই-হুল্লোড় শোনা গেল। হালুম ভয় পেয়ে গেল। মায়ের শরীরের সঙ্গে আরও লেপ্টে রইল। তখন একটা ছেলে আঙুল উঁচিয়ে হালুমকে দেখিয়ে বলে ওঠে, ‘ওই দেখ বাঘের বাচ্চা, বাঘের বাচ্চা...।’
আরেকটা ছোট্ট মেয়ে ছুটে এসে বলে, ‘কোথায় কোথায়, দেখি দেখি...।’
‘ওই যে ওই দিকে দেখো... ওই যে বাঘের বাচ্চা...।’ ছেলেটি বলে।
‘ওমা তাই তো, এ তো দেখি সত্যি সত্যি বাঘের বাচ্চা!’
‘হুম, বাঘের বাচ্চা কত কিউট!’
‘ইশ আমার যদি এমন একটা বাঘের বাচ্চা থাকত!’ মেয়েটি বলল।
ওদের কথায় হালুমের ভয় বেড়ে দ্বিগুণ হলো। সে মায়ের বুকের ভেতর মাথা লুকোনোর চেষ্টা করে। মা বাঘ হালুমের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, ‘ভয় পাস না বাবা। আমি তো আছি।’
ছোট্ট হালুম তবু ভয়ে জড়োসড়ো। সে মুখ বাড়িয়ে ছেলে-মেয়েগুলোকে দেখার চেষ্টা করে। কী সুন্দর ফুটফুটে সুন্দর ওরা। হালুমের এবার বেশ ভালো লাগল। ফিসফিস করে মাকে প্রশ্ন করে, ‘মাম্মি, ওরা বুঝি আমাদের ভয় পায় না?’
‘এ কথা তোকে কে বলল?’ মা বাঘ বেশ অবাক হয়ে গেল হালুমের কথায়।
‘দেখছো না, মানুষের বাচ্চাগুলো কেমন আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে!’ হালুম বলল।
‘হুম।’ মা বাঘ মাথা নাড়ল। বলে, ‘খাঁচায় বন্দি বাঘকে কেউ ভয় পায় না বাবা।’
‘আমরা কেন খাঁচায় বন্দি, মাম্মি?’ হালুম মায়ের কাছে জানতে চায়।
‘আমি জানি না বাবা!’ হালুমের মা খুব মন খারাপ করে বলল।
‘মাম্মি তুমি কি কোনো অপরাধ বা অন্যায় করেছিলে?’
‘হঠাৎ এ কথা বলছিস কেন বাবা?’
‘আমি শুনেছি কেউ যখন কোনো অপরাধ করে, অন্যায় করে, তখন তাকে জেলে ঢুকিয়ে দেয় শাস্তি হিসেবে।’
‘না রে বাবা, আমি কোনো অন্যায় করিনি। অপরাধও করিনি। তারপরও কেন যে আমরা এই খাঁচার ভেতর বন্দি জীবন কাটাচ্ছি জানি না!’
‘তাহলে আমাদের কেন এই খাঁচার ভেতর বন্দি করে রেখেছে?’ হালুম জানতে চাইল।
‘এটা চিড়িয়াখানা। চিড়িয়াখানায় আমাদের মতো বিভিন্ন রকমের পশুপাখি খাঁচার ভেতর আটকে রেখেছে যাতে করে মানুষেরা এসে আমাদের খুব কাছ থেকে দেখতে পারে!’ হালুমের মা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল।
মায়ের কথা শেষ হতেই হালুম বলল, ‘আমরাও যদি মানুষকে এভাবে খাঁচার ভেতর বন্দি করে রাখি তাহলে কেমন হবে?’
‘না না বাবা, বিনা কারণে, বিনা অপরাধে কাউকে খাঁচাবন্দি করে রাখা অন্যায়।’ মা বাঘ হালুমের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে।
হালুম আর কিছু বলে না। কিন্তু সে মনে মনে স্বপ্ন দেখেÑ একদিন সে বড় হবে, তারপর এই খাঁচা ভেঙে মাকে নিয়ে এখান থেকে পালাবে। বানরের সঙ্গে এ ব্যাপারে তার কথা হয়েছে। বানর তাকে সাহায্য করবে।