সাইফুল হক মোল্লা দুলু
প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০২৫ ১৪:০১ পিএম
জীবন মানেই বেঁচে থাকার এক যুদ্ধ। জীবনের পড়ন্ত সময়ে এসেও বেঁচে থাকার অদম্য চেষ্টা চালাচ্ছে মানুষ। দুই পা অচল তবু মানুষের কাছে হাত না পেতে অদম্য মনোবল ও মানসিক শক্তি দিয়ে বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টাটুকু করে যাচ্ছেন খুরশিদ মাঝি। তবু থেমে নেই তার জীবন। নদীর পানি আর শেষ সম্বল একটি নৌকাই যেন তার শেষ ভরসা।
৩০ বছর ধরে খেয়া পারাপার করে চলছেন তিনি। একটি নৌকা চালিয়ে চলছে তার জীবন-জীবিকা। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের চরপুক্ষিয়া গ্রামের মাঝি খুরশিদ। বাড়ির পাশের নদীতে খেয়া পারাপার করে যা উপার্জন করেন, তাই দিয়ে খুঁড়িয়ে চলছে তার জীবন। বর্তমানে যানবাহন চলাচলের উন্নতি হওয়ায় গুরুত্ব কমেছে নদীপথের। তবু নদীতেই কাটছে তার দিন। ছেলেসন্তান থাকার পরও তারা খোঁজ নেয় না পিতা-মাতার। বাধ্য হয়ে নিজ উপার্জনে বেঁচে থাকার প্রয়াস। স্বামী-স্ত্রী মিলে কোনো রকমে কাটছে একাকিত্ব দিনগুলো।
-686e21c6ee1e0.jpg)
সরেজমিনে দেখা যায়, খুরশিদ মাঝির প্যারালাইজডে দুই পা অচল থাকায় দড়ি টানা নৌকা দিয়ে মানুষ পারাপার করেন। অধিকাংশ সময় যাত্রীরাই দড়ি টেনে নদী পার হন। এভাবেই প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলছে খুরশিদ মাঝির দিনগুলো। নদীর একপাশে কটিয়াদীর অংশ ও অপর পাশে নরসিংদী জেলার মনোহরদীর অংশ স্পর্শ করেছে। একসময় এই খেয়াঘাটের জৌলুস থাকলেও বর্তমানে তেমনটা অতীত। সারা দিনে ৫০-৬০ জনের মতো মানুষ চলাফেরা করেন। জনপ্রতি পাঁচ টাকা দিয়ে পার হয়। এখন যোগাযোগব্যবস্থা আধুনিক থাকার কারণে নদীপথে চলাচল কমেছে মানুষের।
স্থানীয় বাসিন্দা রিফাত বলেন, ছোট থেকেই দেখে আসছি কষ্ট করে স্ত্রীকে নিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন খুরশিদ মাঝি। সমাজের বিত্তবান ও রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকেরা এগিয়ে এলে খুরশিদ মাঝির কষ্টের জীবনের অবসান হবে।
নৌকায় চলাচলকারী ফারুম মিয়া বলেন, খুরশিদ চাচা কারও কাছে হাত পাতেন না। তিনি কাজ করে খান। তার দুটি পা অচল। তার সাহসিকতা ও কর্মদক্ষতা দেখে আমরা মুগ্ধ হই। সরকারিভাবে যদি তাকে পর্যাপ্ত সহায়তা করা হতো, তাহলে তার জীবনটা আরও সুন্দর ও সুখের হতো।
স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থী লাদেন মিয়া বলে, আমরা খেয়াঘাটে এলে সব সময় তাকে পাই। তিনি আমাদের সাবধানে নদী পার করে দেন। আমাদের পড়ালেখার প্রতি উৎসাহ দেন। তাকে দেখে খুব কষ্ট হয়। এত রোদ ও বৃষ্টিতে তিনি নৌকা চালান। আবার মাঝে মাঝে অসুস্থ হলেও পারাপার না করে পারেন না।
-686e21d375d54.jpg)
খুরশিদ মাঝির স্ত্রী ফিরোজা খাতুন বলেন, সকালে আমি নিয়ে আসি এবং বিকালে নৌকা থেকে তুলে নিয়ে যাই। অভাবে কাটছে আমাদের জীবন। নৌকায় খাওয়া-দাওয়া হয়।
জীবনযুদ্ধে হার না মানা মাঝি খুরশিদ বলেন, ৩০ বছর ধরে দুই পা অচল। স্ত্রী সকালে একবার দিয়ে যায় এবং সন্ধ্যায় আবার ধরে বাড়ি নিয়ে যায়। সন্তান থাকলেও তারা আলাদা থাকে। আমাদের কোনো খোঁজখবর নেয় না। অভাবের কারণে আমার সঠিক চিকিৎসাও করতে পারেনি। সরকারিভাবে কোনো রকম সহযোগিতা এখন পর্যন্ত পাইনি। তবে আমি পরিশ্রম করে সংসার চালিয়ে নিচ্ছি, কিন্তু সরকারিভাবে আমাকে সহযোগিতা করা হলে আমি একটু ভালোভাবে চলতে পারব। প্রতিবন্ধিত্ব আমাকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। কারও কাছে হাত না পেতে নিজের জীবিকার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করি। সেই থেকে এগিয়ে চলার অদম্য শক্তি নিয়ে এখনও একটি নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছি।
এ বিষয়ে কটিয়াদী উপজেলার সমাজসেবা অফিসার আবুল খায়েরের সঙ্গে ফোনে কথা হলে তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, খুরশিদ প্রতিবন্ধী ভাতার আওতায় রয়েছে। শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও নিজের উপার্জনে সংসারের হাল ধরে রেখেছে। পরবর্তীতে কোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধা এলে তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।