আরফাতুন নাবিলা
প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২৫ ১৪:৩০ পিএম
ইটকাঠের নগরজীবনে প্রকৃতির মাঝে বিলীন হওয়ার সময় ও সুযোগ খুব কম। অথচ শরীর ও মন ভালো রাখার জন্য সবুজের মাঝে থাকা খুব জরুরি- এটা তো বিজ্ঞানও বলছে। জীবনকে খানিকটা স্বস্তি দিতে অনেকেই বাগান করছেন ছাদে, বারান্দায় বা একটুকরো উঠোনে। সঠিকভাবে যত্ন না নিলে সেই বাগানও নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কীভাবে শখের বাগানের যত্ন নেবেন জানাচ্ছেন আরফাতুন নাবিলা
বাগান মানেই মন ভালো করার জায়গা। বারান্দার বাগান হোক কিংবা ছাদ বাগান- সারা দিনের ব্যস্ততা শেষে এক কাপ চা হাতে এক কোণায় বসলে ক্লান্তি দূর হতে পারে নিমেষেই। ফুল গাছের ফুল যেমন মন ভালো করে দিতে পারে, তেমনই বাগান থেকে নিজ হাতে ফল বা সবজি ছিঁড়লে সেটার আনন্দ অন্যরকম। প্রকৃতি সেজেছে বর্ষার রঙে। মেঘ আর রোদের এই লুকোচুরিতে গাছ যেমন ভালো থাকে, আবার যত্নের খানিক ভুলে এই গাছই মরে যেতে পারে। তাই শখের বাগান ভালো রাখতে ঋতু ও সময় বুঝে গাছের যত্ন নিতে হবে।
ছবি - নগ
বর্ষায় গাছ কেন বেশি সজীব থাকে
বর্ষা ঋতু আসলেই গাছগুলো কেমন সজীব হয়ে ওঠে। গাছে গাছে সবুজ পাতা গজায়, ফুলে ফুলে ভরে যায় গাছ, ফলের গাছগুলোও নিজেদের মেলে ধরে সানন্দে। পাতাবাহার জাতীয় গাছগুলো আরও সজীব হয়, মুগ্ধ করে তোলে প্রকৃতিপ্রেমীদের। এর কারণ হচ্ছে গাছের জন্য বৃষ্টির পানি খুবই উপকারী, কারণ এতে আছে- নাইট্রোজেন, পটাশিয়াম, সোডিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, সালফেট ও নাইট্রেট আয়রন। আমরা সাধারণত কল থেকে পানি নিয়ে গাছে দেই। এই পানির চেয়ে বৃষ্টির পানি বেশি পুষ্টিসমৃদ্ধ। বৃষ্টি-বাদলের এই সময়ে গাছগুলো তাই আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠে, মন ভরিয়ে দেয় সবুজ সতেজতায়। নতুন চারাগাছ লাগানোর সময়ও এটা। ফুলের মধ্যে বাগানবিলাস, গন্ধরাজ, শিউলি, কাঠগোলাপ, প্লুমেলিয়া, জবাসহ বিভিন্ন ফুলগাছ লাগাতে পারেন। যদি চান ফল গাছ লাগাবেন তাহলে বেছে নিতে পারেন আম, বাউ আম, বারি পেয়ারা, থাই পেয়ারা, বাউ কুল, আপেল কুল, কাগজি লেবু, আমড়া, থাই করমচা, ডালিম, বারি কমলা ও মাল্টা, লাল ও সাদা ড্রাগন ফল ইত্যাদি।
এই বাদলা সময়ে নার্সারিতে নানারকম বাহারি গাছ পেয়ে যাবেন অনায়াসেই। ছাদ বাগানে সব ধরনের সবজি গাছই লাগানো যায়। বারান্দার পরিসর কিছুটা কম হলেও সঠিক জায়গা নির্বাচন করে সেখানেও চাষ করা যায় সবজির। সব ধরনের শাক, লতানো কয়েক ধরনের সবজি যেমন- লাউ, কুমড়া, শিম থেকে শুরু করে মূলা, গাজর, ফুলকপি, ব্রোকলি, ক্যাপসিকাম, মরিচ, বেগুন সবই লাগানো সম্ভব। পাশাপাশি মসলা জাতীয় গাছ যেমনÑ মরিচ, আদা, পুদিনা পাতা, ধনিয়া পাতা, রসুন, পার্সলে, লেমন ঘাস ইত্যাদিও সহজেই লাগাতে পারেন। নিজেদের সুস্থতার জন্য বাগানে দু-চারটি ঔষধি গাছ রাখলেও মন্দ হয় না।

গাছের জন্য উপযুক্ত জায়গা
ছাদ হোক বা বারান্দা যেখানেই গাছ রাখুন না কেনÑ সেই জায়গা অবশ্যই গাছের জন্য সঠিক ও উপযুক্ত হতে হবে। তপ্ত রোদের ধকল থেকে বাঁচতে গাছ এমন স্থানে রাখতে হবে যেখানে আলো-বাতাসের কোনো কমতি নেই, আবার রোদও কড়া নয়। টবে লাগানো গাছগুলোর যথাযথ খেয়াল রাখতে হবে। চড়া রোদ পড়ে এমন জায়গায় গাছ না রাখাই ভালো।
ছাদে যেখানে গাছ রেখেছেন সেখানে যদি চড়া রোদ পড়ে তাহলে রোদের তীব্রতা কমাতে গ্রিনশেড দিয়ে নিন। যদি শেড দেওয়ার ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে বাজার থেকে ঘন তারজালি বা নেট কিনে সেগুলোকে লোহা বা কাঠের নির্দিষ্ট ফ্রেমের ওপর লাগিয়ে দিতে পারেন। যদি তাও সম্ভব না হয় তাহলে ঘরে থাকা পুরনো চাদর, পুরনো জানালার পর্দা বা পুরনো কাপড় দিয়ে ঢেকে দিলেও সেটা ছাউনি হিসেবে কাজ করবে। কভারগুলো যেন গাছ থেকে কয়েক ইঞ্চি ওপরে হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন, নইলে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। যদি পদ্ধতি সঠিক থাকে, তাহলে সূর্যের চরা রোদের তীব্রতা অনেকটাই ঠেকানো সম্ভব। এতে গাছগুলো শীতলও থাকে, রোদে মরে যাওয়ার আশঙ্কা কমে যায়।
নগর কৃষি ও নগর সবুজায়ন নিয়ে শহরের মানুষকে ২০১৯ সাল থেকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে ‘গ্রিন মি’ নামের প্রতিষ্ঠানটি। এই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ নিয়েছিলেন রাশিদ শিমুল। বর্ষার এই মৌসুমে কীভাবে ছাদ বাগানের যত্ন নিতে হবে এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বর্ষাকালে ছাদবাগানের যত্নে প্রথমেই খেয়াল রাখতে হবে কোনো জায়গায় পানি জমে আছে কি না। কারণ নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভালো না হলে টবে বা জিও ব্যাগে রাখা গাছগুলো পানির সংস্পর্শে এসে ক্ষতির সম্মুখীন হয়। পানি বেশি থাকার কারণে গাছে শিকড় পচে যায়। তা ছাড়া ছাদ ড্যাম হওয়ার আশঙ্কাও বেড়ে যায়। পানি জমে থাকলে মশা বা পানিবাহিত রোগের সংক্রমণও বেড়ে যায়।

বর্ষাকালে টবের মাটি ধুয়ে বা পাতা পড়ে ড্রেনের মুখ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে ড্রেনেজ সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই এই বিষয়গুলোর দিকে খেয়াল রাখতে হবে।
বর্ষার পানিতে অনেক ধরনের নিউট্রিয়েন্ট থাকে। অতি বর্ষায় প্রোপারলি ড্রেনেজ সিস্টেম না থাকলে গাছের গোড়া ও শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বৃষ্টির পানিতে পাতা হলুদ হয়, সবুজ হয়। আবার ছত্রাকের সংক্রমণও বাড়ে। পাতায় দাগ হয়। গাছ রক্ষা করতে হলে এই ঋতুতে বালাইনাশকের তেমন একটা দরকার হয় না। কারণ এগুলো পানিতে ধুয়ে যায়। আর বর্ষায় সার ব্যবহার করার দরকার নেই। সার মেশালে নিউট্রিয়েন্ট বা কেমিক্যাল পানিতে ধুয়ে যায়। বর্ষা শেষ হয়ে গেলে দেওয়া যাবে। অনেকের ছাদে সবজি বা লতানো গাছ থাকে। বর্ষার সময় বাতাসের চাপ বেশি থাকায় গাছ যেন পড়ে না যায়, তাই বেঁধে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। বরবটি, মিষ্টি কুমড়া, করলা, লাউ, চিচিঙ্গা, ঝিঙাÑ এই লতানো গাছগুলোর মাচা মজবুতভাবে করতে হবে, এতে ভেঙে পড়ার চান্স কম থাকবে। ভালোভাবে গাছগুলো বাঁধতে হবে। সেই সঙ্গে নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার করা জরুরি।

আপনি কি জানেন, গাছই গাছের বন্ধু? ছাদ বা বারান্দায় থাকা বেড বা হাফ ড্রামে থাকা বড়, শক্ত-সমর্থ গাছপালার গোড়ায় যদি বিভিন্ন সবজি বা ছোট গাছ লাগান যায় তাহলে সেগুলো বড় গাছ থেকেই ছায়া পায়। যার কারণে সেগুলোর আলাদা করে বাড়তি যত্নের প্রয়োজন হয় না।
গাছের কী কী সমস্যা হতে পারে
গাছের যত্ন নিচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু কোনোভাবেই গাছ বাঁচানো যাচ্ছে না, দিন দিন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে- এগুলো হতেই পারে। এমন হলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। তাই আপনাকে ধরন দেখে বুঝতে হবে গাছ আসলে কোন সমস্যায় ভুগছে। যদি গাছের পাতা বেশ রসালো সেগুলো রোদের তীব্রতায় শুকিয়ে যেতে থাকে। ফ্যাকাশে বিবর্ণ হয়ে যেতে থাকে। বেশি রোদে পাতা ও কাণ্ড রুক্ষ ও হলুদ হয়ে যেতে পারে। বাঁকা হয়ে পাতা শুকিয়ে যেতে পারে। বেশি গরমে পাতা, ফুল বা ফল সবই ঝরে পড়ে। খেয়াল রাখুন, রোদের তীব্রতা আপনার বারান্দায় এত বেশি কি না। যদি হয়, তাহলে কীভাবে রোদ থেকে গাছ বাঁচাবেন সিদ্ধান্ত নিন। বৃষ্টির সময় যদি টবে বেশি পানি জমে থাকে তাহলে গাছের পাতা হলুদ হয়ে যেতে পারে বা কুঁকড়ে যেতে পারে। তাই পানি নিষ্কাশনেও জোর দিতে হবে। যেসব গাছে এই সমস্যা হচ্ছে, সেগুলোর মাটি বদলে দিতে পারেন। মাটিতে হালকা বালু মিশিয়ে দিতে পারেন।
বর্ষায় স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় ছত্রাক বা পোকার আক্রমণ বেশি হয়। গাছে পোকা হলে দ্রুত সেগুলো অন্য গাছেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ ধরনের সমস্যা হলে গাছ বাকি গাছ থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে। পানির সঙ্গে নিমতেল মিশিয়ে গাছে স্প্রে করতে পারেন। সুস্থ গাছেও স্প্রে করলে পোকা বা ছত্রাকের আক্রমণ এড়ানো যায়।

রাশিদ শিমুল বলেন, ‘বর্ষাকালে পাতার চেয়ে মাটির রোগ বেশি হয়। মাটি বেশি স্যাঁতসেঁতে থাকলে অতিরিক্ত কেঁচো, ক্যারা, শামুকÑ এগুলোর বিস্তার বেশি দেখা দেয়। গাছের জন্য এগুলো ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।’
গাছের প্রুনিং করুন সঠিক সময়ে
আম গাছের ক্ষেত্রে ফল সংগ্রহের পরপরই খানিকটা ছেঁটে দেওয়া হয়। এই সময়কাল সাধারণত জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত হয়ে থাকে। কাঁঠাল গাছেরও এই সময়ের মধ্যেই ফল দেওয়া শেষ হয়ে যায়। জুলাই থেকে আগস্টের মধ্যে প্রুনিং করে ফেলা যায় এই গাছের। লেবু গাছ রোপণ করার এক বছর পর থেকে প্রতি মাসে শাখা প্রশাখা পাতলা রাখতে হবে এবং পরের তিন বছর পর্যন্ত ২-৩ মাসে একবার প্রুনিং করতে হবে।
ছবি : গ্রিন মি