ইকবাল খন্দকার
প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৫ ১২:৫৬ পিএম
অলংকরণ : মেহেরুন্নিসা, সপ্তম শ্রেণি, রানী নীহার দেবি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, মানিকছড়ি, খাগড়াছড়ি
আজকের আবহাওয়াটা তেমন ভালো না। ঝড়ো বাতাস বইছে। আকাশে মেঘও দেখা যাচ্ছে। যেকোনো সময় বৃষ্টি শুরু হয়ে যেতে পারে। আর ঝড়ো বাতাসটা রূপ নিতে পারে ভয়ংকর ঝড়ে। এমন দিনে উড়োজাহাজদের আকাশে ওড়া মানা। তাইতো ওড়েনি উড়োজাহাজটা। বসে আছে চাকার ওপর ভর করে।
হঠাৎ কে যেন খোঁচা মারে উড়োজাহাজটাকে। পাখি না তো? সে তাকিয়ে দেখে একটা ঘুড়ি পড়ে আছে। রঙিন ঘুড়ি। দেখতে বেশ সুন্দর। উড়োজাহাজটা বলেÑ চারপাশে কত জায়গা! ওদিকে পড়লে না। পড়লে এসে একেবারে আমার গায়ের ওপর। কাজটা কি ঠিক হলো?
উড়োজাহাজ ভেবেছিল ঘুড়িটা দুঃখ প্রকাশ করবে। ক্ষমাও চাইতে পারে। কিন্তু সে এসরের কিছুই করে না। বরং বুক ফুলিয়ে বলতে থাকেÑ কোথায় পড়ব না পড়ব, সেটা আমার ইচ্ছা। এটা নিয়ে এত কথা বলার তো কিছু নেই। তাহলে কেন শুধু শুধু বকবক করছ?
ঘুড়ির কথায় কষ্ট পায় উড়োজাহাজ। অবাকও হয়। তাই সে আর কিছু বলে না। কেবল তাকিয়ে থাকে ফ্যালফ্যাল করে। ঘুড়ি বলেÑ বুঝলে ভাই উড়োজাহাজ, তোমার জন্য আমার খুব মায়া হয়। করুণাও হয় বলতে পারো। কত বড় শরীর তোমার! অথচ নিজের কোনো ক্ষমতা নেই।
ঘুড়ির কথা ঠিক বুঝতে পারে না উড়োজাহাজ। তাই সে তাকিয়ে থাকে আগের মতোই। এবার ঘুড়ি বলেÑ আমার কথা তোমার মাথায় ঢুকছে না, তাইতো? ঠিক আছে, সহজ করে বলছি। তোমার অনেক নামডাক শোনা যায়। কিন্তু তুমি নিজে নিজে উড়তে পারো না। মানুষের সাহায্য নিয়ে উড়তে হয়, চলতে হয়। অথচ আমাকে দেখো।
এবার মুখ খোলে উড়োজাহাজ। আর মনে করিয়ে দেয়, ঘুড়িও নিজে নিজে উড়তে পারে না। মানুষের সাহায্য-সহযোগিতার দরকার হয়। ঘুড়ি হেসে বলেÑ তোমার মাথায় তো দেখছি বুদ্ধিসুদ্ধি কিছুই নেই। কী বলি আর কী বোঝো! নাকি বুঝেও না বোঝার ভান করছ?
উড়োজাহাজ চুপ থাকে। আর ঘুড়ি বলেÑ তুমি যতক্ষণ আকাশে থাক, ততক্ষণই মানুষের সাহায্য নিতে হয়। কী যে নাম মানুষটার! ও, মনে পড়েছে। পাইলট। পাইলটের সাহায্য ছাড়া তুমি অচল। এই মানুষটা তোমাকে যেদিকে নিয়ে যায়, তুমি সেদিকেই যাও। অথচ আমার কী ক্ষমতা দেখো! কেউ যদি আমাকে একবার উড়িয়ে দেয়, আর কারও সাহায্যের দরকার হয় না। আমি নিজে নিজেই উড়তে পারি।
ঘুড়ির বড়াই শুনতে ভালো লাগে না উড়োজাহাজের। তাই সে মুখ ফিরিয়ে নেয়। আর বসে থাকে আগের মতোই। তবে ঘুড়িটা বসে থাকে না। তার সুতা ধরে কেউ টান দিতেই সে লেজ নাড়তে নাড়তে উঠে যায় আকাশে। আর ভেসে বেড়াতে থাকে বাতাসে।
এক দিন পরের ঘটনা। উড়োজাহাজটা আকাশ থেকে মাটিতে নামতেই দেখে ঘুড়িটা পড়ে আছে। সে একবার ভাবে, কথা বলবে না। কারণ, কথা বলতে গেলেই যদি তার বড়াই শুনতে হয়! আবার ভাবে, এটা ঠিক না। পরিচিত যে কারও সঙ্গে অবশ্যই কথা বলা উচিত। তাই সে তাকে ডাক দেয়। জানতে চায় কেমন আছে।
উড়োজাহাজের প্রশ্নের উত্তর দেয় না ঘুড়ি। এমনকি তাকায়ও না। সে মুখ গোমড়া করে রাখে। উড়োজাহাজের সন্দেহ হয়। ঘুড়ি কথা বলছে না কেন? তাহলে কি তার ওপর কোনো কারণে রাগ করল? কিন্তু সে এমন কী করেছে, যার কারণে রাগ করতে পারে?
উড়োজাহাজ আবার ডাক দেয় ঘুড়িকে। জানতে চায় কোনো কারণে মন খারাপ কি না। ঘুড়ি অস্পষ্ট শব্দে বলেÑ ‘না’। কিন্তু তার কথা বিশ্বাস হয় না উড়োজাহাজের। তাই সে জানতে চায় কী কারণে মন খারাপ। এবার ঘুড়ি বলেÑ যার যেখানে থাকার কথা, সেখানে যদি থাকতে না পারে, তাহলে মন তো খারাপ হবেই।
ঘুড়ির কথাটা খুব কঠিন মনে হয় উড়োজাহাযের কাছে। তাই সে তাকে সহজ করে বলার অনুরোধ করে। ঘুড়ি কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলেÑ জানো, আমার খুব কান্না পাচ্ছে। কারণ, আমি উড়তে পারছি না। মানুষ আমাকে ওড়ানোর জন্য অনেক চেষ্টা করেছে। তবু উড়তে পারিনি। এই জন্য মাটিতে পড়ে আছি।
উড়োজাহাজ অবাক হয়ে বলেÑ গতকালই না তুমি কত বড়াই করলে? বললে আমি যতক্ষণ আকাশে থাকি, ততক্ষণই আমাকে মানুষের সাহায্য নিতে হয়। অথচ তোমাকে একবার কেউ উড়িয়ে দিলেই হলো। আর কারও কোনো সাহায্যের দরকার হয় না। নিজে নিজেই উড়তে পারো। তাহলে আজ কী হলো? মানুষ তোমাকে ওড়ানোর চেষ্টা করার পরও কেন উড়তে পারোনি?
ঘুড়ি বলেÑ কীভাবে উড়ব বলো? আজ তো বাতাস নেই। আর বাতাস না থাকলে মানুষ যত চেষ্টাই করুক, আমাকে ওড়াতে পারবে? এটা কি কখনও সম্ভব?
উড়োজাহাজ বলেÑ সম্ভব। তবে মানুষের পক্ষে না। একমাত্র প্রকৃতির পক্ষে সম্ভব। প্রকৃতি চাইলে এখনোই বাতাস ছুটতে পারে ঝড়ের বেগে। আর তুমি উড়ে বেড়াতে পারো আকাশে।
এবার ঘুড়ি চারপাশে তাকায়। উড়োজাহাজ বুঝতে পারে, সে প্রকৃতি দেখছে।