সাইদুর রহমান আসাদ
প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২৫ ১৩:৪৬ পিএম
সুনামগঞ্জ-সিলেট মহাসড়কের ১৩ কিলোমিটারের মাথায় দিরাই সড়ক মোড়। এই চত্বরকে মদনপুর পয়েন্ট হিসেবেই চিনতেন সবাই। সম্প্রতি এই জেলার টাঙ্গুয়ার হাওরসহ পর্যটন এলাকায় আসা হাজার হাজার পর্যটকের মুখে মুখে এই মোড়ের পরিচয় হয়ে উঠছে ‘হাঁস-ভাত চত্বর’ নামে। চত্বরে থাকা পাঁচটি রেস্টুরেন্টের সবকয়টির সামনে বড় সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে, ‘হাঁস-ভাত রেস্টুরেন্ট’।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পর্যটকরা এই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় এখানে গাড়ি থামিয়ে হাঁস-ভাত অর্থাৎ গরম গরম হাঁসের মাংস আর টেপির চালসহ নানা জাতের আলার চালের ভাত খেয়ে রসনা তৃপ্তি ঘটান। দোকানিরা বলেছেন, সবাই মিলে প্রতিদিন আড়াইশ থেকে তিনশ হাঁস জবাই করে রান্না করেন তারা। কোনো কোনোদিন তাতেও পোষায় না। পর্যটক ছাড়াও প্রতিদিনই সিলেট-হবিগঞ্জসহ আশপাশের উপজেলার তরুণরা এখানে হাঁসের মাংস দিয়ে ভাত খেতে ভিড় করেন।
সম্প্রতি এই চত্বরে দুই ঘণ্টা অবস্থান করে দেখা গেছে, সব কয়টি রেস্টুরেন্টের নামের সঙ্গে হাঁস-ভাত যুক্ত আছে। যেমন মডার্ন অ্যান্ড রাফি হাঁস-ভাত রেস্টুরেন্ট, মামু-ভাগ্না হাঁস-ভাত রেস্টুরেন্ট, সাঈদ হাঁস-ভাত রেস্টুরেন্ট, মেহমান বাড়ি হাঁস-ভাত রেস্টুরেন্ট ও ভাটিবাংলা হাঁস-ভাত রেস্টুরেন্ট।

চত্বরে প্রথম গড়ে ওঠা খাবারের হোটেল পাশের মদনপুর গ্রামের আতিকুর রহমানের মডার্ন অ্যান্ড রাফি হাঁস-ভাত রেস্টুরেন্ট। প্রায় আট বছর আগে তিনি একটি হাঁস জবাই করে কিছু ছোট মাছ রান্না করে কয়েকজন গাড়ি চালক-হেলপারকে খাইয়েছিলেন। প্রথম দিন দুজন বাসচালক ও চালকের দুজন সহকারীর কাছ থেকে হাঁস-ভাতের টাকা পান তিনি। এরপর থেকেই একজন-দুজন করে বাড়ছিল তার ক্রেতা। প্রথম দিকে বাসের স্টাফরাই ছিলেন ক্রেতা। যতই দিন গেছে তার নিজ হাতে রান্না করা হাঁসের মাংসের কদরও বেড়েছে। ক্রমান্বয়ে দোকানও বেড়েছে। এখন কেবল আতিকুর রহমানের রেস্টুরেন্টেই প্রতিদিন শতাধিক হাঁস জবাই করে বিক্রয় হয়।
পাঁচ রেস্টুরেন্টে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ হাঁসের মাংস রান্না হয়। খাবার খেতে আসা ক্রেতারা বলছেন, এখানকার হাঁসের মাংসের স্বাদই আলাদা।
সকালে দেশি হাঁসের পাইকাররা হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাঁস নিয়ে আসেন। চাহিদা অনুযায়ী রেস্টুরেন্ট মালিকরা হাঁস কেনেন। ফার্মের হাঁস কখনোই কেনেন না এখানকার রেস্টুরেন্ট মালিকরা। হাওরে হাঁস ছড়িয়ে বা খোলা জলাশয়ে যারা পালন করেন, তাদের হাঁসই কেবল কেনেন এখানকার খাবারের দোকানিরা। এসব হাঁসের মাংসের স্বাদই অনন্য।
অস্থায়ী এসব দোকানে হাঁস জবাই করে প্রথম কাঁচা মাংস প্রস্তুত করা হয়। পরে সেগুলো বড় কড়াইয়ে চুলার উপর বসিয়ে পরিমাণ মতো তেল, মসলা দিয়ে রান্না করা হয়। প্লেটভরা ভাত ও হাঁসের মাংস ১৮০ টাকায় বিক্রয় হয় এখানকার রেস্টুরেন্টগুলোতে। তবে পরিচিত বা নিয়মিত খানাওয়ালাকে কিছু খদরও করেন রেস্টুরেন্ট মালিকরা।
রেস্টুরেন্ট মালিকরা জানান, তারা কোনো মাংস ফ্রিজে রেখে রান্না করেন না। অর্থাৎ বাসি মাংস বিক্রয় হয় না এখানে। প্রতিদিন হাঁস এনে রান্না করা হয়। এজন্য মজাদার হয়, ক্রেতারাও আসেন। ক্রেতাদের অবিশ্বাস হয়, এমন কোনো কাজ তারা করেন না।
সিলেট নগরের লামাবাজারের বাসিন্দা রাজু আহমেদ। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে এখানে হাঁসের মাংস দিয়ে খাচ্ছিলেন। বললেন, খাবারের টেস্টই আলাদা, খুবই ভালো। সিলেটের বাইরে কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে হাঁসের মাংস খেয়েছি। কিন্তু এখানকার টেস্ট অন্যরকম। দামও কম, মাত্র ১৮০ টাকা রেখেছে।
ক্রেতা মো. চান মিয়া বললেন, এখানকার হাঁস-ভাত খুবই ভালো। এজন্য মাঝে মাঝেই এখানে খেতে আসি। দামও অন্যান্য এলাকা থেকে কিছুটা কম।
ক্রেতা মো. শামছুল আলম বললেন, এখানে এলে তৃপ্তি করে হাঁস-ভাত খাওয়া যায়। অনেক দোকান রয়েছে, সবগুলোতেই হাঁসের মাংস সুস্বাদু। মাত্র ১৮০ টাকায় পেট ভরে খাওয়া যায়। নিয়মিত এখানে হাঁস-ভাত খেতে আসি।
সাইদ হাঁস-ভাত রেস্টুরেন্টের মালিক মো. হেলাল মিয়া বলেন, প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা বিক্রয় করতে পারি। সকাল থেকে রাত ২টা পর্যন্ত দোকান খোলা থাকে। হোটেলে ৫ জনের কাজের সুযোগ হয়েছে।
মেহমান বাড়ি রেস্টুরেন্টের মালিক মো. আব্দুল কাইয়ূম বলেন, এখানকার হাঁস-ভাত ‘ভাইরাল’ হয়ে গেছে। এজন্য কাস্টমার বেশি। দামে কম, মানে ভালো, দূরদূরান্ত থেকে মানুষ খেতে আসে। সুনামগঞ্জ-সিলেট শহর থেকে এসে হাঁস-ভাত খেয়ে তৃপ্তি নিয়ে ফিরেন।
পাইকারি হাঁস বিক্রেতা সমর তালুকদার বললেন, সকাল ৮টা থেকে দোকানে দোকানে হাঁস দেওয়া শুরু করি। ২৬০ থেকে ৩০০ হাঁস বিক্রয় করি প্রতিদিন। এই হাঁস আগের দিন দেখার হাওরসহ অন্যান্য হাওরের পাড়ে থাকা গ্রাম থেকে সংগ্রহ করি। আমার সঙ্গে আরও চারজন কাজ করে। তারা ভ্যানগাড়ি দিয়ে হাসগুলো নিয়ে আসে। ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা করে হাঁস গ্রাম থেকে কিনে আনি। সামান্য লাভে রেস্টুরেন্টে বিক্রয় করি। তিনি প্রতিদিন এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকার হাঁস বিক্রয় করেন বলে জানান এই প্রতিবেদককে। তিনি বলেন, সারা দেশেই এখানকার হাঁস-ভাতের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে। এখানকার দোকানিরা বললেন, তারা সড়কের পাশে সড়ক বিভাগের জমিতে অস্থায়ী ঘর করে ব্যবসা করছেন। তাতে বছরে এক-দুবার সমস্যায় পড়তে হয়। দোকান উচ্ছেদ হয়, ক্ষতির মধ্যে পড়েন সবাই। আবার একই স্থানে দোকান করে নতুন করে শুরু করতে হয়। এতে দুই-তিন লাখ টাকা করে বছরে লোকসান হয় তাদের। সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. মোহাম্মদ আহাদ উল্লাহ বললেন, সরকারি জমিতে ঘর বানিয়ে কাউকে ব্যবসা করতে দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে এটি যেহেতু হাওরাঞ্চলের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে যাচ্ছে। পর্যটকরা এখানে নেমে খাওয়া-দাওয়া করছেন, তারা ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে ঘর করেও শুরু করতে পারেন বা আইনের মধ্যে থেকে তাদের কীভাবে সহায়তা করা যায় সবাই মিলে ভাবা যেতে পারে।