ভক্তপুর, নেপাল
জান্নাতুল ফেরদৌস স্নিগ্ধা
প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২৫ ১২:৩৪ পিএম
ভক্তপুরকে বলা হয় একটি ‘জীবন্ত ঐতিহ্য’ বা ‘জীবন্ত জাদুঘর’
ভক্তপুরকে নিয়ে খুব প্রাথমিক তথ্য হলো এটি নেপালের রাজধানী কাঠমাণ্ডু থেকে মাত্র ১৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, এক প্রাচীন শহর; যা ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যশৈলী এক অপূর্ব মিলনস্থল। ‘ভক্তপুর’ শব্দের অর্থ- ‘ভক্তদের শহর’।
এটি নেপালের ত্রয়ী রাজধার্মিক শহরের অন্যতম এবং ইতিহাসপ্রেমী ও ইতিহাস অনুরাগীদের জন্য এক আকর্ষণীয় গন্তব্য। ভক্তপুরকে বলা হয় একটি ‘জীবন্ত ঐতিহ্য’ বা ‘জীবন্ত জাদুঘর’। ভ্রমণপিপাসুদের জন্য একটি মাস্ট ভিজিট প্লেস। ৫০০ নেপালি রুপির টিকিট হাতে নিয়ে জাদুঘরের জীবনীশক্তি অতিরঞ্জিতভাবে বিক্রি করার চেষ্টা বলে মনে হতে পারে। প্রবেশপথের বিশাল পাথরের ফটক প্রথম নজরে- আকার, আকৃতিতে বিশেষ মনোমুগ্ধকর নাও লাগতে পারে। কিন্তু ভক্তপুরের প্রকৃত রূপ নিহিত আছে সময়ের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা এর আত্মায়, এখনও বেঁচে থাকা কিংবদন্তি ও গল্পে, ফেলে আসা অতীতের ছায়ায়। যা প্রকাশ পায় এর ঐতিহ্য, গঠনশৈলী, স্থাপত্য ও জীবনধারার মাধ্যমে।

ভক্তপুরের আবেদন বোঝা যায় তার সীমানায় পা দেওয়ার পর। প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই চোখে পড়েছে বিশাল পাথরের তৈরি দুটি প্রহরী সিংহ; যার গঠনশৈলী সহজেই দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাদের বিশাল দেহ ও হিংস্র মুখাবয়ব যেন সতর্কবার্তা বহন করছে- এই স্থান পবিত্র এবং তারা সদা জাগ্রত, দেব-দেবীর সুরক্ষায় নিয়োজিত। এই সিংহ দুটির মাধ্যমে শিল্পীর নিপুণ হাতের ছোঁয়া স্পষ্ট হয়ে ওঠে; নিষ্প্রাণ পাথরেও যেন প্রাণের স্পন্দন জাগে। পশুরাজদের দৃষ্টি অতিক্রম করলেই চোখে পড়ছে মূর্তিমান দেব-দেবীদের প্রতিকৃতি। ভৈরব- হিন্দু দেবতা শিবের এক ভয়ংকর রূপ; যিনি ক্রোধ, শক্তি ও ধ্বংসের প্রতীক। তার পাশেই অবস্থান করছেন দেবী দুর্গার রূপে পার্বতী, যিনি শক্তি, করুণা ও স্নেহের প্রতিরূপ।
বিশ্বাস করা হয়, শিবের উগ্র তাণ্ডব ও ভয়ংকর রূপকে প্রশমিত এবং সাম্য বজায় রাখতেই পার্বতী সর্বদা তার সহচরী। এই যুগল মূর্তির মাধ্যমে শক্তি ও স্থিতির এক মহাজাগতিক ভারসাম্য প্রতিফলিত হয়। ভক্তপুর নামটির যথার্থতা যেন স্পষ্ট হয়ে উঠে এখানকার প্রতিটি ইট, প্রতিটি শিলালিপিতে। রাজাদের আদেশ হোক কিংবা শিল্পীর নিপুণ হাতের ছোঁয়াÑ সবখানেই প্রকাশ পায় তাদের গভীর বিশ্বাস ও ঈশ্বরপ্রেম। ভক্তপুর শহরের ইতিহাস যেন এক জীবন্ত কাহিনী, যার প্রতিটি মোড়ে ছড়িয়ে আছে অতীতের গৌরব। শহরটির গোড়াপত্তন হয় ১২০০ শতকে, মল্ল রাজবংশের শাসনামলে। একসময় এটি ছিল নেপালের রাজধানী- রাজনীতি, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। মল্ল যুগকে নেপালের ‘সোনালি যুগ’ বলা হয়, কারণ এই সময়েই শিল্প, সাহিত্য, সংগীত ও নৃত্যের অসাধারণ বিকাশ ঘটে। আমি হাঁটছিলাম ভক্তপুরের প্রাচীন পাথরের পথে।

মনে হচ্ছিল, যেন সময়ের পাতায় পা রাখছি, প্রতিটি ধাপে ইতিহাসের ছোঁয়া। রাস্তার দুই ধারে চোখে পড়ে রাজপ্রাসাদ, মন্দির, পাথরে খোদাই করা গল্প- সবকিছুতেই ফুটে উঠেছে রাজাদের সংস্কৃতি, তাদের বিশ্বাস ও সৌন্দর্যবোধ। আমি অনুভব করেছি মল্ল রাজারা বিশ্বাস করতেন, শাসনকালের সীমানা পেরিয়ে টিকে থাকে কীর্তি; যা মানুষ যুগের পর যুগ মনে রাখে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন- ‘আমিও রেখে যাব কয় মুষ্টি ধূলি / আমার সমস্ত সুখ-দুঃখের শেষ পরিণাম–/রেখে যাব এই নামগ্রাসী, আকারগ্রাসী, সকল-পরিচয়-গ্রাসী / নিঃশব্দ মহাধূলিরাশির মধ্যে।’
তাই তারা শুধু শাসন করেননি, নির্মাণ করেছেন এমন স্থাপত্য ও শিল্পকর্ম; যেগুলো আজও মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে। ভক্তপুরে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ে ৫ তলা নিয়াতপোল মন্দিরÑ কাঠ ও ইটে তৈরি এই বিশাল স্থাপনাটি ভূমিকম্প প্রতিরোধী, নির্মাণ করেছিলেন রাজা ভূপতি মল্ল। জনশ্রুতি আছে- তিনি নিজ হাতে তিনটি ইট বহন করেছিলেন, যেন প্রজাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও অনুপ্রেরণা জাগে। দেবী সিদ্ধি লক্ষ্মীর উদ্দেশে উৎসর্গ করা এই মন্দির শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, বরং নেপালি প্যাগোডাশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। কিছুদূর এগোতেই দেখা মেলে ৫৫ জানালার প্রাসাদ। রাজা জয় রঞ্জিত মল্ল নির্মিত এই প্রাসাদের এক পাশে সারিবদ্ধ ৫৫টি কাঠের জানালা- প্রতিটিতে সূক্ষ্ম খোদাই, যেন কাঠের ওপর লেইসের কাজ। রাজপ্রাসাদের নারী সদস্যরা এখান থেকেই দেখতেন বাইরের অনুষ্ঠান অথচ থাকতেন অদৃশ্য।

ভক্তপুরে আসা মানেই শুধু স্থাপত্য দেখা নয়, এটা যেন এক পুরনো শহরের হৃৎস্পন্দন অনুভব করার মতো। এখানে প্রতিদিনই কোনো না কোনো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে প্রাণ ফেরে শহরের অলিগলিতে। আপনি হেঁটে চলেছেন আর হঠাৎই দেখতে পেলেন নেওয়ারি নারী-পুরুষ ঐতিহ্যবাহী পোশাকে পূজার থালি হাতে মন্দিরমুখী, দূরে কোথাও ভজন চলছে, বাজছে মৃদু মৃদু মৃদঙ্গ। দত্তা (ধার্মিক দান), পূজা, নৃত্য, ভজন, ঐতিহ্যবাহী নেওয়ারি সংগীত কিংবা স্থানীয়দের আচার-অনুষ্ঠান- সবকিছু এত স্বাভাবিকভাবেই এখানকার জীবনে মিশে আছে যে, মনে হবে যেন শতাব্দী প্রাচীন কোনো নাটকের জীবন্ত অংশ আপনি নিজেই। বিশেষ করে উৎসবের মৌসুমে (যেমন বিস্কেট জাত্রা, গাই জাত্রা বা মহাসপ্তমী), পুরো শহর যেন রঙ, আলো আর সুরের মেলায় ভরে ওঠে। এই শহরে প্রতিটি দিনই যেন একটি ছোট উৎসব; যেখানে আপনি শুধু দর্শক নন, বরং একেবারে অংশীদার।স্থানীয় বাসিন্দারা যেভাবে এই ঐতিহ্য রক্ষা করে চলেছেন, তা নিছক একটি সংস্কৃতির চর্চা নয়, বরং এক জীবন্ত ইতিহাস সংরক্ষণের দৃঢ় সংকল্প।

রোদ থেকে পাথরের আড়ালে বসে মনে হলো- সময় বদলেছে, কিন্তু এই শহরের প্রাণ এখনও আগের মতোই রয়ে গেছে। রোদে গরম হয়ে ওঠা পাথরের হাতি আর সিংহের গায়ে হাত রাখতেই মনে হলো, যেন গতকালের জীবন এখনও একটু উষ্ণ হয়ে আছে। ভক্তপুরের বিশেষ জুজু ঢাও (local yogurt) খেতে খেতে হঠাৎই চোখে পড়ে নেওয়ারি পোশাকে একদল নারী-পুরুষ, হাতে পূজার থালা। তাদের দেখে এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো- আমি যেন সময় ভুলে গেছি, বর্তমান কোথায় হারিয়ে গেছে! এটি এমন একটি শহর, যেখানে ইতিহাস শুধু বইয়ে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের জীবনে, সংস্কৃতিতে, স্থাপত্যে ও প্রতিদিনের জীবনযাপনে সেটি প্রবহমান।