হাসনাত মোবারক
প্রকাশ : ০৪ জুন ২০২৫ ১৫:৪৯ পিএম
বাংলার প্রকৃতিতে উজ্জ্বল রঙের ঋতু হিসেবে সমাদৃত গ্রীষ্ম। এ বছরও নয়ন মনোহর ফুলে ফুলে ভরে গেছে গাছপালা। চড়া রোদের শাসনে প্রকৃতি হয়ে উঠেছে আরও রঙিন। কিন্তু শেষ গ্রীষ্মে বহু বর্ণিল প্রকৃতি সিক্ত করতে বইছে অবিরল জলধারা। অর্থাৎ বর্ষণ সিক্ত এবারের গ্রীষ্ম। রোদের পরই নামছে মেঘ। এতে অবশ্য প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের মনপ্রাণ শান্ত হলেও দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের অন্তত ১৪ জেলার মানুষের জীবনের ওপর বয়ে গেল অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। এই দুর্যোগ-দুভোর্গের রেশ কাটতে না কাটতেই দেশে পালিত হবে ঈদুল আজহা।
শহর-গ্রাম সর্বত্র চলছে এই উৎসব উদ্যাপনের ব্যস্ততা। মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের বছরের সবচেয়ে বড় দুটি উৎসব, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। ঈদুল ফিতরের চেয়ে ঈদুল আজহা যাপনে রয়েছে কিছুটা তফাত। পশু কোরবানি এ ঈদের অন্যতম ঐতিহ্য। এই ঈদে যেহেতু পশু কোরবানির বিষয় যুক্ত তাই প্রথমে নিয়ত এবং পরে তা যথাযথভাবে পালনের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন পড়ে পূর্বপ্রস্তুতির। শহরে পশু কোরবানি করতে কিছুটা ধকল পোহাতে হয়। এজন্য জীবিকার তাগিদে শহরে থাকা মানুষগুলো শেকড়ের টানে ছুটে যায় গ্রামে। এ কারণে রাস্তাঘাটে থাকে উপচে পড়া ভিড়। এক্ষেত্রে পরিবহন ব্যবসায়ীদেরও থাকে বাড়তি প্রস্তুতি। বছরের অন্য উৎসবের চেয়ে এই ঈদে বেশিসংখ্যক মানুষকে বাড়িতে যেতে দেখা যায়। শহর অনেকটাই ফাঁকা হয়ে যায় এ সময়। এ বছর ঈদুল আজহার উৎসব পালনে সরকারি-বেসরকারি পেশাজীবীরা যেহেতু পাচ্ছেন লম্বা ছুটি। এতে নাগরিকের ঈদযাপনে যুক্ত হয়েছে নানা পরিকল্পনা। আর যারা শহরের স্থায়ী বাসিন্দা তাদের কোরবানি পালনের জন্য নির্ভর করতে হয় গ্রামের মানুষদের ওপর। যেমন গ্রামের কৃষক, খামারিদের পালন করা পশু; যারা গরু-ছাগল শহরে নিয়ে আসে। ঈদুল আজহা উপলক্ষে বিক্রি করতে চাওয়া পশুদের লালন-পালনের জন্য কৃষক খামারিদের অবশ্য থাকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
দেশের রাজধানীসহ বড় বড় নগরের মোড়ে মোড়ে বসে পশু বেচাকেনার হাট। এই হাটের রাখালি করার জন্য গ্রাম থেকে কিছুসংখ্যক মানুষ শহরে আসেন। অবশ্য গ্রামে পশুর বেচাকেনার হাটগুলো জমে ওঠে ঈদের দু-তিন সপ্তাহে আগে থেকেই। এ বছরও এর ব্যতিক্রম হয়নি। জমজমাট হাট বসেছে। চলছে ধুম বেচাকেনা। সেই পশুগুলোই হাতবদল হয়ে ঈদের কয়েক দিন আগে শহরে চলে আসে। এ বছরও শহরের রাস্তায় রাস্তায় বসেছে সে হাট। ক্রয়কৃত পশু শহরের বাসাবাড়িতে পৌঁছে দিতে সমাজের অবস্থাসম্পন্নদের নির্ভর করতে হয় শ্রমজীবী মানুষের ওপর। কোরবানির পশুর রক্ষণাবেক্ষণ এবং খাওয়ানোর জন্য ঘাস বিক্রি পেশাতেও নিয়োজিত থাকে কিছুসংখ্যক মানুষ। আবার ঈদুল আজহা উপলক্ষে রেফ্রিজারেটরসহ রান্নার সরঞ্জামাদিরও একটা বাণিজ্য চলে। সঙ্গে মসলাপাতির ব্যবসা তো আছেই। ঈদুল ফিতরের চেয়ে এই ঈদে অবশ্য নতুন কাপড়ের প্রতি মানুষের চাহিদা অপেক্ষাকৃত কম। এই ঈদে মুখ্য বিষয় থাকে পশু কোরবানির প্রতি।
কোরবানির পশু জবাই, চামড়া ছিলানো এবং মাংস কাটার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনতে শরণাপন্ন হতে হয় কামারপাড়ায়। এ সময় কামারদেরও যেন দম ফেলার ফুরসত নেই। আবার পশু কোরবানির জন্য সমাজের অবস্থাপন্নদের নির্ভর করতে হয় কসাইদের ওপর। গভীর রাত পর্যন্ত চলে তাদের ব্যস্ততা। এই পেশার মানুষের এ সময় সমাজের মানুষের কাছে কদর বেড়ে যায়। খুব সহজভাবে বলা যায়, ঈদুল আজহা কেন্দ্র করে সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষের মধ্যে দূরত্ব ঘুচে যায়। উচ্চস্তরের মানুষদের সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসেন সমাজের ভিন্ন ভিন্ন পেশার মানুষ। ধর্মীয় অনুশাসন অনুযায়ী কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রির অর্থ সমাজের দরিদ্র শ্রেণির মানুষকে দিতে হয়। ধর্মীয় এই রীতি পালনে ধনিশ্রেণিকেও নির্ভর করতে হয় সমাজের অনগ্রসরদের ওপর। আবার শহরের এক চিলতে জায়গাতে কোরবানির পশু জবাইয়ের পর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কেননা পশুর রক্ত ও বর্জ্য পরিবেশদূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়।
তাই এ উৎসব মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান হলেও এর ঢেউ সমাজের সব পেশা-শ্রেণির ওপর পড়ে। অর্থাৎ কোরবানি মানে আত্মত্যাগ, আত্মোৎসর্গের পাশাপাশি নৈকট্য অর্জনের বিষয়টি প্রতীয়মান হয় প্রবলভাবে।
এ তো গেল ঈদুল আজহার পশু কোরবানি সংক্রান্ত আলোচনা। এখন ফিরি ঈদুল আজহা যাপন প্রসঙ্গে। ঈদুল আজহা ধর্মীয় উৎসব হলেও উৎসবমুখর বাঙালি যাপনসূত্রে এক ও অভিন্ন। বাঙালিদের হৃদয়যাপনের সচিত্র ক্যানভাস হিসেবে উপস্থিত হয় একেকটি উৎসব। আর এই উৎসব কেন্দ্র করে সবাই মিলিত হয় অভিন্ন সুরের মোহনায়। এককথায় বলা যায়, আমরা উৎসবপ্রিয় জাতি। বাঙালি মুসলমানদের ‘ঈদ’ ধর্মীয় উৎসব হলেও তা পরিণত হয়েছে সামাজিক উৎসব হিসেবে। সমাজ ছাড়া মানুষ কল্পনা করা যায় না। আবার মানুষ ছাড়া সমাজও গড়ে উঠতে পারে না। অর্থাৎ সমাজ-সম্প্রীতির জন্যই রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে। ঈদের ছুটিতে এখন মানুষ ভিন্ন সামাজিক উৎসব পালন করছেন। ভ্রমণপিপাসু মানুষ ঈদের ছুটিতে পছন্দের স্থানগুলোও যাচ্ছেন। আবার সামাজিক বন্ধনকে শক্তিশালী ও দৃঢ় করতে বিভিন্ন উৎসব উপস্থিত হয়েছে আমাদের মাঝে। যাকে কেন্দ্র করে পরিবার থেকে শুরু করে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী সবার সঙ্গে যোগাযোগ অক্ষুণ্ন থাকে। ধনীতে-গরিবে, হিন্দুতে-মুসলমানে সবার মাঝে হার্দিকতা বৃদ্ধি পায়। এটা অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই। একটা উৎসব যাপন করতে হলে সমাজের সমগ্র মানুষের মানসিক একটা সম্মতি থাকতে হয়। সেটা যে উৎসবই হোক না কেন। তা যাপন করতে আপামর সমাজ কোনো না কোনোভাবে জড়িত থাকে। একটা ঘর তৈরিতে যেমন উপকরণ লাগে, তেমনি উৎসবের বেলায়ও তাই। তবেই সে উৎসব হয়ে ওঠে বহু বর্ণিল, কল্যাণময়, আনন্দমুখর।
ঈদের ধর্মীয়রীতি অনুযায়ী ঈদগাহ মাঠের নামাজ আদায়, কবরস্থান জিয়ারত এবং পশু কোরবানি পর্যন্ত বিশ্বের মুসলমানদের সঙ্গে সাদৃশ্য পাওয়া যায়। এর পরই কিন্তু আমাদের চিরায়ত বাঙালির উৎসবে পরিণত হয়। ঈদযাপনকে কেন্দ্র করে আহার-বিহারের কথা যদি বলা হয়, সেক্ষেত্রে ওই একই কথা। কোনোভাবেই মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমানদের খাবারের মেন্যুর সঙ্গে বাঙালি মুসলমানের খাবারের মিল পাওয়া যাবে না। সেই অর্থে ঈদ উদযাপন ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি সামাজিক উৎসবও বটে। একটা সময় ঈদুল আজহার দিনে শুধু পশু কোরবানিতে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন কিন্তু উৎসবের এ দিনে লক্ষ করা যায়, কোরবানির পশুর বাইরেও খাবার-দাবারের নানান পদ রান্না করতে। কেননা মানুষ আগের চেয়ে এখন অনেকটাই স্বাস্থ্যসচেতন। আবার ঈদ উৎসবে অন্য ধর্মের লোকজনের জন্য বাড়তি খাবারের আয়োজন করা হয়।
আরেকটি বিষয়ে ফিরি। এই যেমন ঈদ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আয়োজন করা হয় নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। যা ঈদ উৎসব ঘিরেই আয়োজিত হয়। যেমনÑ জারি, সারি, কিসসা, ভাটিয়ালি, পালাগানসহ নানা রকমের গানের আসর বসে এই ঈদ যাপন ঘিরে। ঈদের দিন অথবা ঈদের পরে গ্রামাঞ্চলে লাঠিখেলা, ঘোড়দৌড়, দাড়িয়াবান্ধা, বলীখেলা, মোরগ লড়াই, ষাঁড় লড়াইসহ হাজারো গ্রামীণ খেলার আয়োজন করা হয়। এ উৎসবগুলো সামাজিক সম্প্রীতি বাড়ায়। আবার চিরায়ত বাঙালির সংস্কৃতিকেও প্রসারিত করে। দেশের উত্তরাঞ্চলে রমণীরা ঈদ সামনে রেখে লাল মাটি দিয়ে, মাটির দেয়ালে নকশা তোলে। লাল মাটির সঙ্গে নীল, হলুদ মিশিয়ে নানান রঙের ফুল, পাখি, যুদ্ধে ব্যবহৃত সমরাস্ত্র আঁকতে দেখা যায়। আবার লাল মাটির ওপর গ্রাম্য ছড়া কেটে লিখে রাখে, ‘বাড়ির পাশত ইরি ধান/লম্বা লম্বা শীষ/তুমি বন্ধু বিদ্যাশ গেলে/আমি খাব বিষ’Ñ এগুলো কিন্তু আমাদের লোকজ সংস্কৃতিরই অংশ। তবে এখন বাঙালি মুসলমানদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নের ফলে মাটির ঘরের পরিমাণ অনেকটা কমে গেছে। তবে ইটের তৈরি দেয়ালেও বাঙালি রমণীরা নকশা তুলছেন। এভাবেই বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাঙালির ঈদ যাপনে এসেছে পরিবর্তন। এবারের এই ঝড়-জলের দিনরাত্রিতে মাথায় নিয়ে পালিত হচ্ছে ঈদুল আজহা। এই উৎসবের ঢেউ আন্দোলিত করুক সমগ্র বাঙালির মনেপ্রাণে। দূর হোক মনের সংকীর্ণতা।