গোলাম কিবরিয়া
প্রকাশ : ০২ জুন ২০২৫ ১২:০৫ পিএম
আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২৫ ১৭:০৯ পিএম
প্রকৃতির অকৃত্রিম, অফুরন্ত সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশ। আর বাংলার এই অবিচ্ছেদ্য সৌন্দর্যের অংশ সুনামগঞ্জ জেলার হাওর। দূরে মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়, ঝরনা থেকে নেমে আসা স্বচ্ছ পানি, অগণিত পাখির কলতান আর করচ-হিজল বনের অপরূপ সৌন্দর্যের সমাহার দেখা যাবে টাঙ্গুয়ার হাওরে। লিখেছেন গোলাম কিবরিয়া

‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর’— জীবনানন্দ দাশের এই পঙক্তির সৌন্দর্য যেন নতুন করে হৃদয়ে বাজে যখন আপনি হাওরের বুক চিরে এগিয়ে চলেন, আর দূরে পাহাড়ের কুয়াশা-ঢাকা রেখা আপনাকে টেনে নেয় এক অন্য বাস্তবতায়। যান্ত্রিক শহরের ক্লান্তিকর জীবন থেকে মুক্তি পেতে আমরা পাঁচজন বন্ধু এক সন্ধ্যায় হুট করেই সিদ্ধান্ত নিলাম—এইবার একটু ভিন্ন কিছু হোক। ঢাকার কোলাহল ছেড়ে ছুটলাম সুনামগঞ্জের দিকে, আমাদের চূড়ান্ত গন্তব্য: টাঙ্গুয়ার হাওর।

রাত সাড়ে ১২টা। গন্তব্যের দিকে ছুটছে আমাদের বাস। জানালার বাইরে শুধু আঁধার আর মাঝে মাঝে হেডলাইটের আলোয় ঝলকে ওঠা রাস্তার দাগ। গন্তব্য কাছাকাছি এলেই পথ যেন রূপকথার মতো বদলে যেতে থাকে। দুই পাশে কাঁচা জলরাশি, মাঝখানে আঁকাবাঁকা পিচঢালা রাস্তা, আর চারপাশে নির্জন এক প্রশান্তি।

সকালে তাহিরপুর ঘাটে পৌঁছে অপেক্ষা করি হাউসবোটের। সকালের হালকা নাস্তা সেরে যেই না নৌকায় উঠলাম, তখন থেকেই যেন অন্য এক জগতে প্রবেশ করলাম। বিশাল জলরাশি, হালকা হাওয়া, দূরে মেঘে ঢাকা পাহাড় আর দিগন্তজোড়া আকাশ—সব মিলিয়ে এক অপার্থিব অনুভূতি।

চোখের সামনে কেবল পানি আর পানি। মাঝে মাঝে চোখে পড়ে ছোট ছোট চর, যেখানে কিছু মানুষ গবাদিপশু কিংবা হাঁস-মুরগি চড়াচ্ছেন। হাওরের মানুষদের জীবন যেন পানির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়ানো—বর্ষায় মাছ ধরা, শুষ্ক মৌসুমে চাষাবাদ, আর এই মাঝের সময়টুকুতে পর্যটকের আনাগোনা। দুপুরের দিকে আমরা পৌঁছে যাই হাওরের এক পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে। সেখানকার পানি এতটাই স্বচ্ছ যে ডুবে যাওয়া পাতার রেখাও পরিষ্কার দেখা যায়। গোসল, খাওয়া আর বিশ্রাম শেষে ছোট ছোট ডিঙি নৌকায় উঠে ঘুরে বেড়াই হিজল করচ বনের ভিতর। শিশুরা হেসে এগিয়ে আসে, কেউ কাঁচা আম, কেউবা লেবু বিক্রি করছে। সহজ সরল মুখগুলোর হাসি আপনার ভ্রমণকে করে তোলে আরও অর্থবহ।
সেদিন বিকেলে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল নীলাদ্রি লেক। এক সময়ের চুনাপাথরের খনিকে প্রকৃতি রূপ দিয়েছে এক অদ্ভুত নীল জলে ভরা হৃদয়ে। স্থানীয়রা একে ‘শহীদ সিরাজ লেক’ বললেও পর্যটকদের কাছে এটি ‘নীলাদ্রি লেক’ নামেই বেশি পরিচিত। সীমান্তঘেঁষা এই লেকের গভীর নীল পানি যেন আপন মনে কথা বলে। পরিত্যক্ত রেলকোচ আর পুরোনো ক্রেন আজও স্মৃতির ভার বইছে নিঃশব্দে।
আরেকটু সময় নিয়ে আমরা গেলাম জাদুকাটা নদীর ধারে। সেখান থেকে দেখা যায় মেঘালয়ের মেঘে মোড়া পাহাড়শ্রেণি। সন্ধ্যার সময় বর্ডার এলাকায় সোডিয়াম লাইটের ম্লান আলোয় পুরো এলাকা হয়ে উঠল মায়াময়, যেন রূপকথার কোনো গ্রাম। রাতটা কেটেছে হাউসবোটে। পূর্ণিমার রাতে হাওরের জলে চাঁদের প্রতিবিম্ব—সে এক অপার্থিব দৃশ্য। গল্প, গান, হাসি আর স্মৃতির সঞ্চয় নিয়ে আমরা ঘুমিয়ে পড়ি প্রকৃতির কোলে। সকালের আলো গায়ে মেখে ফিরতি পথ ধরি আমরা। কিন্তু মনের ভিতর এখনো রয়ে গেছে হাওরের নিরব জলরাশি, পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া কুয়াশা আর নীল জলরঙে আঁকা প্রকৃতির এক দুর্লভ সৌন্দর্য।

হাওরে হাউসবোট
টাঙ্গুয়ার হাওরের অন্যতম আকর্ষণ হলো নৌকায় থাকার দিনগুলো। এই অভিজ্ঞতাটিই টাঙ্গুয়ার হাওরের ট্যুরকে আলাদা করে অন্য সব ট্যুর থেকে। বৃষ্টির সময়ে নৌকায় বসে চায়ের চুমুকে দূর মেঘালয়ের পাহাড়গুলোর দৃশ্য যেন জাগিয়ে তুলে যে কারও ভেতরের কবিকে। একসময় মনে করা হতো এই হাওরে হয়তো শুধু বন্ধুবান্ধবের সঙ্গেই ঘুরতে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু বর্তমানে থাকার জন্য আধুনিক ও আরামদায়ক নৌকা প্রচলিত হওয়ায় এখন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও অনায়াসে এই হাওর ঘুরে আসা সম্ভব।
এমনই একটি হাউসবোট হলো ‘জলছবি’। এ হাউসবোটে যা যা সুবিধা পাবেন তা হলো- ছয়টি কেবিন অ্যাটাচ ওয়াশরুম (হাই কমোড), একটি ডিলাক্স কেবিন, রুফটপ ডাইনিং। বুকিং করতে কিংবা যেকোনো তথ্যের জন্য যোগাযোগ করুন: মোবাইল ফোন-০১৮৭১২১৬৪০৮।

এ ছাড়াও নিতে পারেন জলতরঙ্গ-Joltarongo প্যাকেজ। প্যাকেজে থাকবে হাওরের সম্পূর্ণ খাবার ও জলতরঙ্গ বোটে দুই দিন এক রাত থাকা। এ ছাড়া নীলাদ্রি লেক, শিমুল বাগান, ওয়াচ টাওয়ার, টেকেরঘাট, জাদুকাটা নদী, টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণ তো থাকছেই। যোগাযোগ-০১৮২৫-৬৯৭১১৭। জনপ্রতি মাত্র ৫,৫০০ টাকায় ট্যুর প্যাকেজ নিয়ে টাঙ্গুয়ায় ঘুরে আসতে পারেন টিজিবির সিন্দাবাদ তরী হাউসবোট নিয়ে। বোটে রয়েছে ৮টি কেবিন, যার ৬টি-ই অ্যাটাচ বাথসহ। বিস্তারিত জানতে: ০১৮৯৬১৭৮১৫০।
বর্ষাকালে টাঙ্গুয়ার হাওর হয় দেশের অন্যতম জনপ্রিয় স্পট। চারদিক বিস্তৃত জল, তার মাঝে ছোট ছোট গাছগাছালি ভরা ডুবোচর আর দূরের মেঘ-পাহাড় যেন স্বপ্নের মতো মনে হয়। সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের দৃশ্য এখানে অবর্ণনীয়, লাল আভায় রাঙা আকাশ আর জলের প্রতিফলন মিলেমিশে সৃষ্টি করে এক অপার্থিব সৌন্দর্য। জলের বুকে ভেসে চলা এক রোমাঞ্চকর অনুভব, যেখানে প্রকৃতি, প্রশান্তি আর বিলাসিতা একসাথে মিশে যায়। হাওরের নীরব সৌন্দর্যে হারিয়ে যাওয়ার জন্যই যেন তৈরি হয়েছে ফ্যালকন দা আইকনিক হাউসবোট।
হাওরে সাধারণত যে হাউস বোটগুলো আছে, সেগুলোর স্বত্বাধিকারী পুরুষ। প্রচলিত এধারা ভেঙেছে Behula- The Houseboat। এই হাউসবোটের স্বত্বাধিকারী ও পরিচালনাকারী সবাই নারী। এই বোটে মোট ৮টি কেবিন রয়েছে। আছে সিঙ্গেল ও কাপল প্যাকেজ। যোগাযোগ : ০১৮৩৪-৬৮২৭৬২। হাওরে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদী, নালা ও খাল বর্ষায় মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। পানি, মেঘ আর পাহাড়ের এমন রূপে মুগ্ধ হয়ে প্রতিবছর টাঙ্গুয়ায় ঘুরতে যান হাজারো পর্যটক। এই পর্যটকদের জন্য কয়েক বছর হলো হাওরে ভাসছে বিশেষায়িত সব নৌযান। ‘হাউসবোট’ নামে পরিচিত বিলাসবহুল এসব নৌকাঘর ভ্রমণপিপাসুদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।
কীভাবে যাবেন
টাঙ্গুয়ার হাওরে যাওয়ার জন্য প্রথমে যেতে হবে সুনামগঞ্জ জেলায়। ঢাকা থেকে সড়কপথে সরাসরি সুনামগঞ্জে যাওয়া যায়। এ ছাড়া বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে সিলেট হয়ে সেখান থেকেও সহজেই সুনামগঞ্জ যাওয়া যায়। সুনামগঞ্জ থেকে তাহেরপুর যেতে হবে লেগুনা কিংবা অটোরিকশায়। এ ছাড়া এ পথে মোটরবাইকেও যাত্রী পরিবহন করা হয়। তাহেরপুর থেকে টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণের জন্য বিভিন্ন রকম হাউসবোট পাওয়া যায়। তাছাড়া আপনি চাইলে ঢাকা থেকেও প্যাকেজ নিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর ঘুরে আসতে পারেন।