ঘানদ্রুক, নেপাল
গোলাম কিবরিয়া
প্রকাশ : ১৯ মে ২০২৫ ১২:৩৩ পিএম
আপডেট : ২১ মে ২০২৫ ১২:২৪ পিএম
সাড়ে ছয় হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত ছবির মতো সুন্দর গ্রাম ঘানদ্রুক ছবি : লেখক
পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছি। রাস্তার এক ধারে ঘন সবুজ পাহাড়, অন্য ধারে হাজার হাজার ফুট নিচে ফেলে আসা মোহময় ফেওয়া হ্রদ। গন্তব্য সাড়ে ছয় হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত ছবির মতো সুন্দর এক গ্রাম ঘানদ্রুক
-682acdfae1bfa.jpeg)
সাড়ে ৬ হাজার ফুট উঁচুতে থাকা গ্রাম ঘানদ্রুকে যাত্রা আমাদের। নাগরকোট থেকে কাঠমান্ডু এলাম। ঘানদ্রুকের পারমিট নিলাম নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড থেকে। তার পর আগে থেকেই বুকিং দিয়ে রাখা রাতের বাসে পোখারা যাত্রা। ভোরে পৌঁছে রিজার্ভ কার নিয়ে ঘানদ্রুকের উদ্দেশে ছুট। সাধারণত খুব কম বাংলাদেশি ট্যুরিস্ট সেখানে যায়। তবে যারা অন্নপূর্ণা ট্রেকিং করেন, তারা এ গ্রাম ঘুরে যায় নতুবা থেকে যায়। ঘানদ্রুক গ্রামে যেতে উঠতে হবে সোজা পাহাড় বেয়ে ওপরে। পোখারা থেকে ঘানদ্রুক যাওয়ার জন্য গাড়ি রিজার্ভ করেছি আমরা। চাইলে শেয়ার জিপ বা বাসেও যাওয়া যেত। তবে কিমচে পয়েন্ট থেকে আরেকটু উচ্চতায় গাড়ি নিয়ে যাবে আমাদের।
পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছি। অপার বিস্ময়ে প্রকৃতির রূপ উপভোগ করছি। রাস্তার এক ধারে ঘন সবুজ পাহাড়, অন্য ধারে হাজার হাজার ফুট নিচে ফেলে আসা মোহময় ফেওয়া হ্রদ। আমাদের ডান পাশ ঘেঁষে বয়ে চলেছে খরস্রোতা মাদি নদী। আরেকটু ওপরে উঠে বাঁয়ে পড়ল সুন্দর এক জলপ্রপাত। ওটা পেরিয়েই অন্নপূর্ণা রেঞ্জের প্রবেশপথ।
-682ace99859a8.jpeg)
তবে তখনও বিস্ময়ের মূল আকর্ষণ বাকি। গাড়ি থেকে নামার পর হাঁটা শুরু। লাগেজ বেশি থাকায় পোর্টার নিতে হলো। প্রেম আমাদের পোর্টার। ভারী লাগেজ নিয়ে হাঁটা উচু-নিচু পাহাড়ি পথের যাত্রা। ক্লান্ত শরীর, তবে চোখ যেন ক্লান্ত হয় না চারদিকের রূপ-রঙ দেখে। ঘণ্টাখানেক হেঁটে ক্লান্ত শরীরে আমাদের হোটেলে পৌঁছালাম। ক্লান্ত-শ্রান্ত শরীরের মনপ্রাণ জুড়িয়ে গেল, যখন হোটেলে এসে চারদিকের পরিবেশ দেখলাম।
-682aced157885.jpeg)
দূর থেকে ঝাপসা হয়ে আসা সুউচ্চ পর্বত নিজের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে হঠাৎ। তখনও জানি না পরদিন আমাদের জন্য কি চমক অপেক্ষা করছে। এরপর গ্রাম ঘুরে দেখা। পাহাড়ি এই গ্রামের অলিগলিতে ফুলগাছের সমাহার। ঘুরং সম্প্রদায়ের বাড়ি, জাদুঘর দেখা হলো।
-682acee478949.jpeg)
রাতে ভালোই ঘুম হলো। আগে উঠতে হবে, কারণ খুব ভোরে দেখতে হবে অন্নপূর্ণা। সব সময় এর দেখা পাওয়া যায় না। মেঘের কোলে মুখ লুকায়। তবে ভাগ্য সুপ্রসন্ন। এ যেন কল্পনাকেও হার মানায়। অপার বিস্ময়ে উপভোগ করলাম অন্নপূর্ণা সাউথ, মাছুপুছরে, গংগাপূর্ণা এবং হিমছুলি পর্বত। চারটি পর্বত একসঙ্গে এভাবে পরিষ্কার দেখব আশা করিনি। নিজ চোখের বিস্ময়ে ছবিতে ফুটিয়ে তোলা দুষ্কর। ঘণ্টা দুয়েক এ দৃশ্য উপভোগ করলাম।

ভোরে সূর্যোদয়ের সময় এই বরফ ঢাকা পর্বতশৃঙ্গগুলোর রঙ বদলানো এক অভাবনীয় দৃশ্য। ধীরে ধীরে পর্বতগুলো মেঘের কোলে মুখ লুকাছে। মনে মনে বললাম, সৃষ্টিকর্তার কী অপরূপ সৃষ্টি, আলহামদুলিল্লাহ।
ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনধারা
ইতিহাসবিদদের মতে, মঙ্গোলিয়ানরা তিব্বতের পথ ধরে নেপালে প্রবেশ করে এবং ঘানদ্রুকে তাদের বসতি হিসেবে গড়ে তোলে। ইতিহাসে ঘানদ্রুক নেপাল ও তিব্বতের মধ্যকার প্রাচীন বাণিজ্য পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিরতির স্থান হিসেবে পরিচিত। এই গ্রাম গুর্খা সৈন্যদের গৌরবময় ইতিহাস বহন করে, যারা ব্রিটিশ ও ভারতীয় সেনাবাহিনীতে সাহসিকতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে সেবা করেছেন। ‘ঘানদ্রুক’ শব্দটি গুরুঙ্গ ভাষার নয়। মনে করা হয়, এটি ‘ঘনা’ (যার অর্থ বড় বা ঘন) এবং ‘দ্রুক’ (গাছ) Ñ এই দুটি নেপালি শব্দ থেকে এসেছে। সম্ভবত গ্রামটি প্রতিষ্ঠার সময় এর পাশে এক বা একাধিক বিশাল গাছ ছিল, যেখান থেকে এর নামকরণ হয়েছে।
ঘানদ্রুক গ্রাম অন্নপূর্ণা পর্বতমালার পশ্চিম ঢালে অবস্থিত, লুমলে ও ডাঙ্গসিং গ্রামের মাঝখানে। ঘানদ্রুক থেকে ঘোড়েপানি ও উল্লেরি পর্যন্ত পর্বতের চূড়াগুলো বনভূমিতে আবৃত। ঘানদ্রুক তুলনামূলকভাবে সহজেই পৌঁছানো যায়। পোখারার নয়াপুল থেকে প্রতি বিশ মিনিটে একটি বাস ঘানদ্রুকের উদ্দেশে ছাড়ে। নয়াপুল থেকে দূরত্ব আনুমানিক ৭২ কিলোমিটার। চাইলে আপনি পোখারা থেকে প্রায় ছয় ঘণ্টা ট্রেক করেও ঘানদ্রুকে পৌঁছাতে পারেন। ঘানদ্রুক সাতটি ছোট গ্রাম নিয়ে গঠিতÑ কোটগাঁও, মাঝগাঁও, তোগাঁও, ডান্ডাগাঁও, ধ্যাগোয়ারগাঁও, আদবদাইয়ারগাঁও ও গাইরিগাঁও। এখানে প্রায় এক হাজার পরিবার বসবাস করে। গ্রামের শিশুদের জন্য নেপাল সরকার ‘শ্রী মেশ্রম বরাহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়’ পরিচালনা করে, যেখানে ৫ থেকে ১৮ বছর বয়সি শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে।
-682acfc4c310c.jpeg)
এই গ্রামে মূলত গুরুঙ্গ জনগোষ্ঠী বসবাস করে, যারা তাদের স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আতিথেয়তার জন্য পরিচিত। তবে এখানে মাগার, কামি, সার্কি, ব্রাহ্মণ, ছেত্রী এবং নিউার জাতিসত্তার লোকজনও বাস করে। ঘানদ্রুকে এমন অনেক পরিবার আছে যাদের অন্তত একজন সদস্য ব্রিটিশ সেনাবাহিনী, ভারতীয় সেনাবাহিনী, নেপালি সেনা বা পুলিশের সঙ্গে যুক্ত। তবু কিছু পরিবার এখনও কৃষিকাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। নেপালের অধিকাংশ পাহাড়ি অঞ্চলের মতো ঘানদ্রুকের কৃষিজমিও সিঁড়ির মতো ছাদবিশিষ্ট। কৃষকরা ধান, ভুট্টা, কোদো, শাকসবজি, আলু এবং সবুজ চা চাষ করেন। এ ছাড়া ভেড়া পালন বাড়ছে, তবে প্রধান আয়ের উৎস হলো বাহিনীতে কর্মরত সদস্যদের পাঠানো অর্থ।
-682acfd834d7e.jpg)
আতিথেয়তা খাতও বর্তমানে ঘানদ্রুকে কেন্দ্র করে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। পর্যটকদের আনাগোনা, ট্রেকিং ও হোমস্টে সংস্কৃতি এই শিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করছে। ঘানদ্রুক গুরুঙ্গ সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী গ্রাম। এখানে আপনি স্থানীয়দের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, নাচ-গান, এবং ঘরবাড়ির স্থাপত্যশৈলীর একঝলক দেখতে পাবেন। গ্রামে একটি গুরুঙ্গ জাদুঘরও আছে, যেখানে এই সম্প্রদায়ের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অনেক কিছু সংরক্ষিত আছে।
-682acfeb69ce8.jpeg)
স্থানীয় খাবার
ঘানদ্রুকে ঘিরে থাকা হোমস্টে ও গেস্টহাউসগুলোতে স্থানীয় খাবার যেমন ডাল-ভাত-তরকারি, গুরুঙ্গ পা (Gurung bread) ও নেপালি আলু চানা পরিবেশন করা হয়। ঠান্ডা আবহাওয়ায় গরম চা ও স্থানীয় খাবার এক অনন্য অভিজ্ঞতা এনে দেয়।
সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
ঘানদ্রুক একটি জীবন্ত গুরুঙ্গ ঐতিহ্য হিসেবে সাংস্কৃতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামটি গুরুঙ্গদের ঐতিহ্যবাহী ঘরবাড়ি দিয়ে সাজানো, যা সাধারণত পাথরের তৈরি এবং কাঠে খোদাইকৃত জানালা ও দরজার জন্য বিখ্যাত। পর্যটকরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করে, ঐতিহ্যবাহী নৃত্য দেখার সুযোগ পায় এবং গুরুঙ্গ রীতিনীতি ও আচার-অনুষ্ঠান সম্পর্কে সরাসরি জানার সুযোগ পায়।
ঘানদ্রুকের গুরুঙ্গরা তাদের দক্ষ হস্তশিল্পের জন্য পরিচিত, বিশেষ করে তাঁত ও হস্তনির্মিত সামগ্রী তৈরিতে। আপনি এখানে দেখতে পাবেন মহিলারা ঐতিহ্যবাহী তাঁতে নিপুণভাবে জটিল নকশা বুনছেন, যা তাদের বর্ণময় সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে। ঘানদ্রুকের ঘরবাড়িগুলো পাথর দিয়ে তৈরি এবং স্থানীয়ভাবে ‘পাথরের গ্রাম’ বলা হয়। পুরো গ্রামটি পাথরের পাত দিয়ে বাঁধানো আর পাশেই রয়েছে সবুজ শাকসবজির ক্ষেত, যা স্থানীয় হোটেল ও রেস্তোরাঁয় সবজি সরবরাহ করে। গুরুঙ্গদের ঘরের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো এর কম্প্যাক্ট নকশা। এই ঘরগুলো সাধারণত পাথরের স্ল্যাব, কাঠ ও মাটি দিয়ে তৈরি, ছাদ হয় স্লেটের। বেশিরভাগ গুরুঙ্গ ঘর দোতলা এবং আয়তকার আকৃতির হয়ে থাকে। সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, ঘানদ্রুকে প্রায় ৬০টি হোটেল/লজ রয়েছে, যার মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ২০০ জন।
-682acffe6b80f.jpeg)
গুরুঙ্গদের পোশাক
পুরুষরা পরেন ভাংড়া, কচ্ছাদ, কাম্লো, রাড়ি-পাখি, ভোঁতো, কালো ভাদগাউলে টুপি, কালো ইস্তকোট, খুকুরি ও শিকাগাপুরি বেল্ট। নারীরা (গুরুঙ্গনি) পরেন মখমলি বা সুতির চোলো (সামনে বেঁধে পরার ধাঁচে), গাঢ় লালচে রঙের শাড়ি, লুঙ্গি মুগিয়া ও জরির কাপড়, মখমলি চোলো, পাতুকা, ঘালেক, মাজেত্রো, সাদা পাচারি, টিকিস, জনতার, কণ্ঠাশ্রী ও নুগেডি নামক গহনা।
সংগীত ও নৃত্য
গুরুঙ্গরা সংগীতকে জীবনের অংশ হিসেবে দেখে। ঘানদ্রুকে আপনি দেখতে পাবেন তাদের ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র যেমনÑ বাঁশি, ধুম্পু, ধ্যাংরো, গিরলিং, ঝুর্মা, শঙ্খ, কর্নাল, দামাই বাজা ও মাদল। গুরুঙ্গদের আরেকটি ঐতিহ্য হলো ‘রূঢ়ি’। শহরাঞ্চলের নেপালি তরুণ সমাজে জনপ্রিয় হলেও এর মূল উৎপত্তি ঘানদ্রুকের গুরুঙ্গদের মধ্যেই। রূঢ়ি হলো এমন একটি পাবলিক ঘর, যেখানে তরুণ-তরুণীরা একত্রিত হয়ে গান ও নৃত্যের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হয়। এই পরিবেশ অনেকটা ফ্লার্টিং বা প্রেম বিনিময়ের জন্য উপযোগী। রূঢ়ির মৌসুম জানুয়ারি/ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়ে এপ্রিল/মে পর্যন্ত চলে। এই ঐতিহ্য অতীতে বিয়ের সম্পর্ক গড়ে তোলার বড় মাধ্যম ছিল। ঘানদ্রুকের সবচেয়ে বড় উপাসনালয় হলো ‘মেশ্রম বরাহ মন্দির’। ছবির মতো সুন্দর এ গ্রাম বিদায় দেওয়ার সময় চলে আসে।
-682ad0286ab21.jpeg)
যাওয়ার আগে একজনের কথা না বললেই নয়। প্রথম দেখাতে রকস্টার মনে হলো। শরীরে ট্যাটু করা বিভিন্ন রকমের। কথা কম বলে। ঘানদ্রুকে যাওয়ার পথে প্রেমের সঙ্গে পরিচয়। আমাদের পোর্টার। ভারী সব লাগেজ নিয়ে এতটা পথ পাড়ি দেওয়া অনেক কষ্টকর হতো প্রেম না থাকলে। ১ ঘণ্টার পথ ভারী লাগেজ নিয়ে গ্রামে দিয়ে আসে। যেদিন নেমে আসি মায়াবী এ গ্রাম থেকে সেদিন প্রেমও আমাদের সঙ্গে লাগেজ নিয়ে নেমে আসে। বিদায় দেওয়ার মুহূর্তে অদ্ভুত এক মায়া কাজ করে। প্রেম আমাকে জড়িয়ে ধরে। দ্রুত তাকে বিদায় করি। অদ্ভুত সব মায়াজালে জড়িয়ে পড়া আমার অভ্যেস। মায়াবী এ গ্রাম ঝাপসা হয়ে আসে।
-682ad08b710fb.jpg)
টিপস : মার্চ থেকে মে এবং সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর- এই সময় ঘানদ্রুক ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। হালকা ট্রেকিং গিয়ার এবং গরম কাপড় সঙ্গে রাখা জরুরি।
ছবি : লেখকের সৌজন্যে