দিলরুবা নীলা
প্রকাশ : ১৫ মে ২০২৫ ১৪:১৯ পিএম
অলংকরণ : মিথিলা ভৌমিক নবম শ্রেণি ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা
শীতের শুরু তখন। উঠানে সকালের রোদে পিঠ মেলে দিয়ে রুপু মুড়ি খাচ্ছিল। হঠাৎ কোত্থেকে একটা সোনালি সারস উড়ে এসে রুপুর সামনে দাঁড়াল। এমন সুন্দর সারস সে কখনই দেখেনি। রুপুর মন খুশিতে ভরে উঠল। পরক্ষণেই দেখে ওর একটা পা ভাঙা। একপায়ে দাঁড়িয়ে আছে সারসটা।
রুপু একমুঠো মুড়ি ছড়িয়ে দিল ওর সামনে। সারসটা লম্বা ঠোঁট দিয়ে মুড়ি খেতে থাকল। ওর চোখ দুটো কেমন মায়া-মায়া। রুপুর মনে হলো ওর একটা নাম দেওয়া দরকার। সে গলা দুলিয়ে ডাকল, মিনু...। সারসটা কি ওর কথা বুঝল? ডাকতেই কাছে এসে রুপুর গায়ে ঠোঁট বুলোতে লাগল।
রুপা আদর করে ওকে কোলে তুলে নিল। রুপু ওকে ঘরে নিয়ে গেল। ডেটলে তুলো ভিজিয়ে ওর বাঁ পায়ের ক্ষতস্থানে ভালো করে বুলিয়ে দিল। এরপর মায়ের পুরোনো শাড়ির পাড় ছিঁড়ে পায়ে জড়িয়ে দিল।
রুপু ওর যত্ন নেয়। ঠিকমতো খাওয়ায়। বাবা হাসান আলী হাট থেকে ছোটো ছোটো পাবদা, পুঁটি, চ্যালা মাছ মিনুর জন্য কিনে আনেন। মিনু খুব মজা করে খায়।
দিনে দিনে মিনু সুস্থ-সবল হয়ে ওঠে। সে সব সময় রুপুর কাছে কাছে থাকে।
রুপু দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। ওর বিদ্যালয় পাশের পাড়ায়। পাঁচ মিনিটের পায়ে হাঁটা পথ।
সকালে বিদ্যালয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলে মিনু কাছ থেকে সরে না। কিন্তু রুপু চায় না মিনু ওর সঙ্গে যাক। পথে রাসুদের বাঘা কুকুরটা দাঁড়িয়ে থাকে। হয়তো মিনুকে ধরে বসবে। রুপু ওকে মায়ের কাছে রেখে যায়।
মিনুকে দেখতে প্রতিদিন গ্রামের ছোটো ছেলেমেয়েরা ভিড় করে। রুপু তখন মিনুকে নিয়ে খেলায় মেতে ওঠে। রুপু মিনু বলে ডাকলে সে ডানা তুলে কাছে ছুটে যায়। রুপু হাত-পা দুলিয়ে নাচে। তখন মিনুও ওর সঙ্গে নাচতে থাকে।
মিনুর প্রতি সবার একটা মায়া ধরে গেছে। কিন্তু রুপুর মা চান মিনু তার মায়ের কাছে ফিরে যাক। হয়তো ওই মৈঠালি বিলেই ওর মা আছে। নিশ্চয় মিনু কোনো বাজপাখির শিকার হতে হতে পা ভেঙে এখানে এসে পড়েছিল। রুপুর বাবাও ভাবেন মিনুকে বিলে ছেড়ে দিয়ে আসবেন।
রুপুর মা একদিন উঠানে বসে চাল বাছছিলেন। তখন দেখেন মিনু ডানা তুলে উড়বার চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না। মা রুপুর বাবাকে জানান ওর উড়তে না-পারার কথাটা।
রুপুর বাবা মিনুকে নিয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে যান। অফিসার সব শুনে বললেন, মানুষের কাছে বেড়ে ওঠার কারণে ও ওড়ার স্পৃহা হারিয়েছে। ওকে উড়তে শেখাতে হবে। উড়তে শিখলেই বিলে ছেড়ে দিতে হবে। আইনে বন্য প্রাণী, পাখপাখালি শিকার বা পোষা নিষেধ।
সপ্তাহখানেক চেষ্টার পর মিনু একটু একটু উড়তে শিখল।
একদিন ভোরবেলা ঘুম ভেঙে রুপু দেখে ভেজা ডানায় মিনু তার পাশে ঠোঁট উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার ঠোঁটে একটা লাল ঝিনুক। সুন্দর ঝিনুকটা পেয়ে রুপু খুব খুশি হয়।
রাতে ঝিনুকটা বালিশের নিচে রেখে রুপু শুয়ে পড়ে। ঘুমাতেই স্বপ্নে হারিয়ে যায় সে। কী সুন্দর ফুল ফুটে আছে পথের দুপাশে! কত যে রঙিন পাখি ডানা মেলে উড়ছে!
রুপুর স্বপ্নে সোনালি সারসটা উড়ন্ত পাখিদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে।
এমন সময় রুপুর ঘুম ভাঙে। দেখে মাথার কাছে মা দাঁড়িয়ে। মা বলেন, উঠে পড়ো। বসন্তবৌরি ডাকছে। আজ বসন্তের প্রথম দিন।
রুপু বিছানা ছেড়ে উঠে আঙিনায় গিয়ে দাঁড়ায়। উঠানের পাশজুড়ে হলুদ চন্দ্রপ্রভা আর নীলমণি লতায় মৃদু বাতাসের দোলা দেখে মুগ্ধ হয় রুপু।
মুগ্ধতা কাটলেই মনে পড়ে মিনুর কথা। মিনু তখন অনেক দূরে মৈঠালী বিল পেরিয়ে তার মাকে খুঁজে ফিরছে।