রওনক জাহান পুষ্প
প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৫ ১৩:৪৮ পিএম
সম্প্রতি বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার ২৫টি ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য জিআই সনদ পেয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো সিলেটের কমলগঞ্জের মণিপুরি শাড়ি। অনেক দিন ধরেই বাংলাদেশের নারীদের ফ্যাশনে মণিপুরি শাড়ি বেশ ভালো একটা জায়গা করে নিয়েছে। এখন জিআই সনদ পাওয়ার মাধ্যমে আরও পাকাপাকিভাবে বাংলা সংস্কৃতিতে স্থায়ী হয়ে গেল মণিপুরি শাড়ি।
সিলেটের মণিপুরি তাঁতের শাড়ি ও পোশাকের ঐতিহ্য বাংলাদেশে ৩০০ বছরেরও পুরোনো। অনেক আগে থেকেই মণিপুরি জনগোষ্ঠী তাদের প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড় নিজেরাই বুনে থাকেন এবং এ কাজে তারা বেশ দক্ষও। বলা হয়, একসময় বিয়ের ক্ষেত্রে মণিপুরি নারীদের যোগ্যতা হিসেবে তাঁত শিল্পে দক্ষতাকে বেশ গুরুত্ব দেওয়া হতো। প্রায় সব ঘরেই দেখা যায় হাতে চালানো তাঁত।

আদি ইতিহাস
মণিপুরিরা মূলত স্বাধীন রাজ্য মণিপুরের বাসিন্দা ছিলেন। তবে বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে অনেক বছর ধরেই তাদের বসবাস। মজার ব্যাপার হচ্ছে, মণিপুরিদের পোশাকের তালিকায় কোথাও শাড়ি নেই। তাদের প্রধান পোশাক ছিল লাহিক বা ফানেক, যেটা কোমরে প্যাঁচ দিয়ে পরতে হয়। সঙ্গে ফুরিৎ বা ব্লাউজ এবং ফিতুপ অথবা ইনাফি, যাকে ওড়না বলা যায়। জন্মলগ্ন থেকেই মণিপুরি নারীরা তাঁত চালনায় ছিলেন দক্ষ। এমনকি দ্বাদশ শতাব্দীর দিকে মণিপুরের মৈরাং অঞ্চলের রাজকন্যা থোইবীর হাতের বোনা কারুকাজ করা কাপড় এখনও মণিপুরের জাদুঘরে শোভা পায়।
ফিতুপ অথবা ইনাফির উন্নত সংস্করণ হলো মৈরাংফি। মৈরাং এ রাজকন্যার জন্য অনেক কারুকাজখচিত এবং রাজকীয়ভাবে বিশেষ ওড়না বোনার ফলে এর নাম দেওয়া হয় মৈরাংফি। এর বিশেষত্ব হলো পাড়ে বৈচিত্র্যময় মৈরাং ডিজাইন। মূলত মৈরাংয়ের সুপ্রাচীন থাংজিং মন্দিরের নকশার অনুকরণে করা হয় এ ডিজাইন।
মূলত মৈরাংফি থেকেই মণিপুরি শাড়ির প্রচলন। বাংলাদেশের বিখ্যাত ও জনপ্রিয় অন্যান্য শাড়ির সঙ্গে তুলনা করতে গেলে মণিপুরি শাড়ির ইতিহাস অপেক্ষাকৃত নতুন। একটা বড় সময় পর্যন্ত মণিপুরিরা ছিলেন স্বাবলম্বী। এমনকি তুলার চাষ করে সুতা কেটে নিজেরাই বানিয়ে নিতেন নিজেদের পরিধেয়। তবে ৯০ দশকের শুরুর দিকে ধীরে ধীরে তারা নিজেদের পণ্য বাজারজাতকরণের দিকে যেতে থাকেন। শাড়ি বোনা শুরু হয়েছিল মূলত বাঙালি ক্রেতাদের জন্য। আদি মৈরাংফিকেই আরও বড় করে শাড়ি বানানোর কাজ করা হয়। শাড়ি ছাড়াও তাদের পণ্যের সাজিতে রয়েছে শাল, ওড়না, থ্রিপিস, গামছা, ফতুয়া, পাঞ্জাবি, বিছানার চাদর ইত্যাদি। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা ও হিউয়েন সাং তাদের ভ্রমণ কাহিনীতে মণিপুরি তাঁত শিল্পের কথা উল্লেখ করেছেন।
মণিপুরি শাড়ির বৈশিষ্ট্য

বাংলাদেশের অন্যান্য বিখ্যাত তাঁতের শাড়িগুলোর মতো মণিপুরি শাড়িরও রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। মণিপুরি শাড়ি দেখলেই একে আলাদা করা যায় এর পাড়ের অনন্য নকশার কারণে। মণিপুরি শাড়ির পাড়ে মৈরাং টেম্পল বা মন্দিরের নকশা থাকে, যা সংখ্যায় কমবেশি হলেও প্রায় সব রেঞ্জের শাড়িতেই দেখা যায়। এ ছাড়াও শাড়িগুলো বোনা হয় বিশেষ পোশাক মৈরাংফির অনুকরণেই অত্যন্ত উজ্জ্বল রঙের সুতায়। মণিপুরিরা যেহেতু নিজেরাই তুলা থেকে সুতা উৎপাদন করে, তাই বেশিরভাগ সময় দেশীয় সুতি সুতা দিয়েই এই শাড়ি বোনা হয়, যার ফলে এই শাড়িগুলো জামদানি অথবা মসলিনের মতো একদম মিহি নয় বরং একটু মোটা। তা ছাড়া প্রায় সব ক্ষেত্রেই পাড়ের রঙ জমিনের বিপরীত হয়ে থাকে, যার ফলে পাড় ও জমিন আলাদাভাবে চোখে পড়ে।
নকশার ক্ষেত্রে মণিপুরিরা প্রাকৃতিক নকশাকেই বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। এ কারণে গোলাপ ফুল, জবা ফুল, পাতা পাখি এ ধরনের ডিজাইনের ব্যবহার জমিনে বেশ দেখা যায়। এ ছাড়াও জ্যামিতিক নকশা, যেমন- রেখা টানা, বৃত্ত, ছোট নকশা এসবও মোটিফ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ভিন্ন ভিন্ন প্রাইস রেঞ্জের মণিপুরিতে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের নকশার ব্যবহার দেখা যায়। শাড়ির ডিজাইনগুলো সম্পূর্ণই মণিপুরিরা নিজেরা করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে কোনো ক্যাটালগ বা আলাদা ডিজাইন ছাড়াই নিজেদের মনমতো নকশায় তারা তৈরি করেন সুন্দর এই কাপড়গুলো। বংশপরম্পরায় বছরের পর বছর ধরে তারা এই ডিজাইনগুলো ব্যবহার করে আসছে। তবে বর্তমানে বিভিন্ন প্রয়োজনে বা অর্ডার অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন ডিজাইনের কাপড়ও তারা তৈরি করে থাকে।
জানা যায়, পাড়ের ডিজাইনটিকে সাধারণভাবে মৈরাং বলা হলেও এর মধ্যেই আছে আলাদা আলাদা নাম ও ডিজাইন। মূলত তিন ধরনের পাড় করা হয়ে থাকে মণিপুরি শাড়িতে। এগুলো হলো তাজমহল মৈরাং, কেওয়া মৈরাং ও ফুরা মৈরাং। ফুরা মৈরাং হচ্ছে মূলত সোজা ত্রিভুজাকৃতিরÑ যে মৈরাং পাড় আমরা শাড়িতে দেখতে পাই। কেওয়া মৈরাং পাড়ে সামান্য খাঁজকাটা থাকে, যা সরাসরি মন্দিরের চূড়াকে নির্দেশ করে। এই দুটোই মণিপুরিদের ঐতিহ্যবাহী ডিজাইন। তাজমহল মৈরাং অপেক্ষাকৃত আধুনিক ডিজাইন, যাতে পাড়ের খাঁজগুলো ত্রিভুজাকৃতি নয় বরং তাজমহলের গম্বুজের মতো আকৃতিতে নকশা করা হয়।
যেভাবে তৈরি হয়
আমরা সবাই জানি, মণিপুরি শাড়ি তাতে বোনা হয়। তবে সব তাঁতে শাড়ি হয় না। মণিপুরিরা মূলত তিন ধরনের তাঁত ব্যবহার করে। তাদের ভাষায় তাঁতকে বলা হয় ইয়োং। এই ইয়োং আবার তিন ধরনের হয়ে থাকে- খোয়াং বা কোমর তাঁত, পাং ও থোয়াং। কোমর তাঁতে মূলত ফানেক, বিছানার চাদর, শাল, গামছা এসব তৈরি করা হয়। মূলত মোটা সুতার কাপড়গুলোই এই তাঁতে তৈরি করা হয়। এ তাঁতের কাপড় দেখতে সুন্দর হলেও কাজ করা বেশ শ্রমসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ হওয়ায় অনেক তাঁতিই বর্তমানে এ তাঁতের কাজ ছেড়ে দিয়েছে। সুতা টানা দিয়ে তাঁতে বসে পিছনে বেঁধে নিয়ে শুরু হয় এই তাঁতের কাজ। এরপর সুতো ওপরে-নিচে টেনে বুনানো হয় সুন্দর সুন্দর কাপড়।

অন্যদিকে অনেকটা দেশি চিত্তরঞ্জন তাঁতের মতো পাং তাঁত ব্যবহৃত হয় মণিপুরি শাড়ি, পাতলা বিছানার চাদর, গামছা, ওড়না ইত্যাদিতে। চিকন সুতার কাপড় তৈরি করা হয় বলে এই তাঁতে করা কাজগুলো বেশ হালকা ও নরম হয়। লাভজনক বলে বেশিরভাগ মণিপুরি তাঁতিই এখন এই তাঁতের কাজের দিকে ঝুঁকছেন।
তবে, কাপড় বোনার সুতা চিনতে সর্বপ্রথম যে কাঠের মেশিনটি ব্যবহৃত হয় সেটির নাম ড্রাম। এখান থেকেই বোঝা যায় এই সুতার ধরন, এটিতে শাড়ি ভালো হবে না বিছানার চাদর।
এ শাড়ির বুনন পদ্ধতিও আমাদের দেশি তাঁতের শাড়ির চাইতে খুব একটা আলাদা নয়। প্রথমে সুতা কেটে মাড় দিয়ে শুকিয়ে নিতে হয়, এরপর চরকার গুটিতে নিয়ে টানা বেঁধে শাড়ি বোনা শুরু হয়। রঙ ও নকশার ওপর ভিত্তি করে একটি শাড়ি বুনে শেষ করতে ৪-৫ দিন থেকে ১৪-১৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগে।
জনপ্রিয়তা
বর্তমানে বাঙালি নারীদের কাছে খুবই পছন্দের শাড়ি মণিপুরি। সম্প্রতি জিআই স্বত্ব পাওয়ার কারণে এর জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে। নরম তুলা থেকে তৈরি দেশি সুতি সুতা দিয়ে বোনার কারণে গ্রীষ্মকালে পরার জন্য এই শাড়ি বেশ আরামদায়ক। এ ছাড়াও এর উজ্জ্বল রঙ সহজেই নজর কেড়ে নেয়। মণিপুরির পাড়ে জমিন থেকে আলাদা এবং একটু মোটা সুতা ব্যবহার করায় পাড় ভারী হয়। ফলে শাড়ি সামলানো সহজ হয়। বর্তমানে শাড়ি ও সালোয়ার কামিজ ছাড়াও মণিপুরি কাপড় দিয়ে তৈরি হচ্ছে ওয়েস্টার্ন ফিউশনধর্মী পোশাক। এ ছাড়াও ব্যাগ, টেবিল ক্লথ ইত্যাদিও চলছে সমান তালে। জামদানি বা মসলিনের তুলনায় মণিপুরি শাড়ির দামও হাতের নাগালে। ১০০০ বা ১২০০ থেকে শুরু হয়ে আট দশ হাজারের মধ্যেই পাওয়া যায় মনের মতো শাড়ি। রঙবেরঙের এই শাড়ি চমৎকারভাবে মানিয়ে যায় উৎসব-পার্বণেও। তাই ধীরে ধীরে বাঙালি নারীদের মধ্যে বেড়েই চলেছে মণিপুরি শাড়ির চাহিদা। সিলেটে গিয়ে সরাসরি কেনা, দোকান থেকে কেনার বুননেও রয়েছে অনেক পার্থক্য। পাশাপাশি বর্তমানে অনলাইনেও মণিপুরি শাড়ির বাজার জমজমাট। বিভিন্ন দেশীয় পণ্যের উদ্যোক্তারাও কাজ করছেন মণিপুরি শাড়ি নিয়ে।
দেশীয় শাড়ি নিয়ে অনেক দিন ধরেই কাজ করছে বেগম বাহার। এই উদ্যোগের স্বত্বাধিকারী টুম্পা রহমান জানান, যেসব ক্রেতা একবার মণিপুরি শাড়ি পরে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন, তারা মণিপুরি শাড়িই বারবার নিয়ে থাকেন। গরমে আরামদায়ক বলে হালকা কটন ও সুতির মণিপুরি এখন বেশ জনপ্রিয়। এ ছাড়াও শাড়ি চেনার ক্ষেত্রে যেসব শাড়িতে ঘন ঘন মৈরাং মোটিফ থাকে সেগুলো এক্সক্লুসিভ হয়, আর যেসব শাড়িতে পাড়ে মোটিফের মধ্যে বেশ কিছুটা দূরত্ব থাকে, সেগুলো তুলনামূলক কম রেঞ্জের হয়। এ ছাড়াও বোনার ধরন আর সুতার ধরনেও শাড়ির মান ও দামে তারতম্য হয়ে থাকে বলে জানান তিনি। মণিপুরি শাড়ি পিওর কটন সুতাতেই সাধারণত বোনা হতো। তবে বর্তমানে শাড়ির দাম সর্বসাধারণের হাতের নাগালে আনার জন্য এর সঙ্গে টেট্রন ও হাফসিল্ক সুতার মিক্স ব্যবহার করা হয় প্রায়ই। এ ছাড়াও ঘন করে বোনা আর একটু ফাঁকা রেখে রেখে হালকা করে বোনাতেও শাড়ির মানে ও দামে পার্থক্য হয়ে থাকে।
ব্যবহার ও যত্ন
মণিপুরি শাড়ি জামদানি বা মেশিনের মতোই তাঁতে বোনা হলেও সুতা অপেক্ষাকৃত মোটা হওয়ায় এর যত্ন নেওয়া সহজ। তিন থেকে চারবার ব্যবহারের পর একে ওয়াশ করা যায়। লন্ড্রিতে ড্রাইওয়াশ করিয়ে নেওয়া যায়, হালকা শ্যাম্পু দিয়ে অল্প কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রেখে আলতো হাতেও ওয়াশ করা যায়। ওয়াশ করার পর মাড় অথবা পাতলা করে এরারুট দিতে হয়। এতে সুতা টেকসই থাকে। তারপর হালকা রোদে দিয়ে বাতাসে শুকিয়ে নিতে হয়। যত্ন করে রাখলে অনেক দিন ব্যবহার করা যাবে পছন্দের মণিপুরি শাড়িটি।
জিআই স্বীকৃতি প্রাপ্তি
বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশের সংস্কৃতিতেই অনেক দিন ধরে মণিপুরি থাকলেও তাঁতের ধরন থেকে শুরু করে বুননেও রয়েছে অনেক পার্থক্য। বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে মণিপুরির ইতিহাস কয়েকশ বছরের বলেই জানা যায়। এ ছাড়াও এর কাঁচামাল থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ তৈরির পদ্ধতি দেশেই হয়। এ কারণে সিলেটের মণিপুরি বাংলাদেশের নিজস্ব পণ্য হিসেবে জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে সঙ্গে বিদেশেও পৌঁছে গেছে এই ঐতিহ্যবাহী কাপড়। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক পরিচয়ের পাশাপাশি অনেক তাঁতির জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম এটি। পরতে আরামদায়ক ও মার্জিত এই শাড়ি সব বয়সের নারীদের কাছেই নিজের জায়গা করে নিয়েছে। অত্যন্ত সাধারণ ঘরের নারী থেকে শুরু করে বড় বড় ব্যক্তিত্বরাও সাদরে গ্রহণ করেছেন মণিপুরিকে। সংস্কৃতি ও রুচিশীলতার চমৎকার মেলবন্ধন বাংলার সিলেটের মণিপুরি শাড়ি।
মডেল - হুমায়রা আনজুম, জয়া গ্লোরিয়া
শাড়ি - আনঅফিশিয়াল প্যান্ডোরা, পালং খ্যিয়ং