সাদিয়া সিদ্দিকা
প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৫ ১৩:৪৪ পিএম
দরজায় কড়া নাড়ছে ঈদুল আজহা। এই ঈদে জামা বানানো নিয়ে ব্যস্ততা একটু কম থাকলেও একদম থেমেও থাকে না। ঈদের দিন না হলেও ঈদের পরদিন আড্ডা বা দাওয়াতে নতুন জামা তো অবশ্যই পরা চাই। তবে এই গরমে পোশাকের বাহুল্যতা খুব একটা কেউ পছন্দ করে না। সেজন্য আরামদায়ক পোশাক বানিয়ে নেওয়া হয় গজ কাপড় দিয়েই। আর ঈদের আগে নিজের পছন্দের নকশা দিয়ে জামা বানানোর সময় প্রায় শেষ। কারণ দর্জিবাড়িতে ভিড় শুরু হয়ে গেছে। এখন জামা বানাতে না দিলে ঈদে হয়তো পছন্দের জামাটাই বানানো হবে না। ঈদের পোশাকে নিজস্ব ফ্যাশন স্টাইল আর স্বকীয়তা প্রকাশ করতে নিউমার্কেট, গাউছিয়া আর চকবাজারের গজ কাপড়ের দোকানগুলোতে ঢুঁ মারার এখনই সময়।
রঙিন গজ কাপড়ের দোকান
ঢাকার নিউমার্কেট, চাঁদনি চক কিংবা গাউছিয়া মার্কেট এখন ঈদের আগে যেন গজ কাপড়ের রঙিন রাজ্য। দোকানে দোকানে থরে থরে সাজানো সুতি, শিফন, জর্জেট, লিলেন, অরগাঞ্জা কিংবা ভিসকসÑ সব ধরনের গজ কাপড়। ডিজাইনেও রয়েছে বৈচিত্র্য : বাটিক, ব্লক, স্ক্রিন প্রিন্ট, অ্যামব্রয়ডারি, স্প্যানিশ লেইস কিংবা মেশওয়ার্ক- যা ঈদের জামাকে করে তোলে একেবারে আলাদা। ঈদের আগে নিউমার্কেট হয়ে ওঠে রঙ আর কাপড়ের এক রাজ্য। শিফন, জর্জেট, লিনেন, কটন, মসলিন, সিল্ক, নেট, অরগাঞ্জা, থ্রিডি অ্যামব্রয়ডারি কিংবা ডিজিটাল প্রিন্টেড ফেব্রিক- সবই রয়েছে এখানে।

প্রি-স্টিচড ব্র্যান্ডেড জামা বা শাড়ির তুলনায় গজ কাপড়ে জামা বানানো অনেকটাই সাশ্রয়ী। ৪০০ থেকে ১০০০ টাকার মধ্যেই মানসম্মত কাপড় পাওয়া যায়, যা একজন দর্জির হাত ধরে হয়ে ওঠে অনন্য এক পোশাক। আর তাই গজ কাপড় মানেই কম দামে স্টাইল আর স্বকীয়তার অনন্য মেলবন্ধন।
কথা হচ্ছিল চাঁদনি চকের রাজু নামের একজন দোকানির সঙ্গে। রাজু জানালেন, ‘এবার মেটালিক শেডের কাপড় যেমন গোল্ডেন, ব্রোঞ্জ, কপার, সিলভার অনেক চলছে। অনেকে শারারা আর কেপ কামিজের জন্য গ্লসি নেট নিচ্ছেন। শিফনের ওপরে সিক্যুইনের কাজ করা কাপড়ও জনপ্রিয়।’
দামের দিক থেকে জানা গেল, সাধারণ কটন শুরু ৮০-১০০ টাকা গজ, শিফন-জর্জেট ১৮০ থেকে ৪৫০ টাকা গজ, থ্রিডি বা অ্যামব্রয়ডারির কাপড় ৫০০-৭০০ টাকা পর্যন্ত।
চলতি ফ্যাশন ট্রেন্ডে যা থাকছে
এবার ঈদে পোশাক ট্রেন্ডে এসেছে এক নতুন ঢেউ। ফিউশন ডিজাইন আর মিনিমাল লুক বেশি জনপ্রিয় হয়েছে এবার। পোশাক বানানোর আগে খেয়াল রাখা হচ্ছে আবহাওয়ার দিকে।
লং কেপ কামিজ : হালকা নেট বা অরগাঞ্জা দিয়ে বানানো হয় লং কেপ কামিজ, নিচে থাকে স্লিভলেস কামিজ বা স্লিপড্রেস।
ফ্রক স্টাইল কামিজ : কোমর কাটা ও ঘেরওয়ালা ফ্রক কামিজ আবারও ফিরে এসেছে। অফিসে বা ইউনিভার্সিটিতে পরার জন্য এই কামিজগুলো বেশ আরামদায়ক।
কুর্তি-পালাজ্জো সেট : শর্ট বা মিড লেন্থ কুর্তির সঙ্গে ওয়াইড লেগ পালাজ্জোও মেয়েদের কাছে বেশ পছন্দের। গরমে আরামও পাওয়া যায়।
স্লিট কামিজ : সাইড ও ফ্রন্ট স্লিটের কামিজ সঙ্গে পেন্সিল প্যান্ট, স্টাইলিশ ও আরামদায়ক।
ধ্রুপদি শারারা-ঘাগরা : পার্টি লুকের জন্য অনেকে নিচ্ছেন হেভি কাজের গজ কাপড়Ñ ব্রোকারেড বা সিল্ক।
আধুনিক আবায়া : কালারফুল ও ওপেন স্টাইল আবায়ার জন্য নিচ্ছেন মসলিন, লিনেন বা সিল্ক গজ।
গাউন : নরম ও ফ্লোই ফেব্রিক দিয়ে তৈরি গাউন, যেটা একসঙ্গে আরাম ও গ্ল্যামার দেয়।
স্কার্ট-টপস : তরুণীদের পছন্দে স্কার্টের জন্য নিচ্ছেন ডিজিটাল প্রিন্টেড ফেব্রিক বা লিনেন।
বেল স্লিভ কামিজ : স্লিভে ভলিউম এনে সাজানো হচ্ছে বেল স্লিভ স্টাইল, যা হালকা নেট বা অরগাঞ্জায় বেশি মানায়।
দর্জির দোকানে ঈদের ব্যস্ততা
গজ কাপড় কিনে ফিরে দর্জির দোকানে শুরু হয় ঈদের সাজগোজের পরবর্তী ধাপ। চকবাজারের এক দর্জি শামীম বললেন, ‘সবাই এখন স্টাইল বুঝে জামা বানাচ্ছে। কেউ ফোনে ডিজাইন দেখাচ্ছে, কেউ নিজের মতো স্কেচ করে নিয়ে আসছে। ঈদের ১০ দিন আগে থেকেই ১৪ ঘণ্টা কাজ করি।’
তরুণী শারমিন জানালেন, ‘বাজারের ডিজাইনার জামা একঘেয়ে। আমি নিজের ডিজাইনমতো কামিজ বানাই, সঙ্গে কুলার ফেব্রিক বেছে নিই গরমের কথা মাথায় রেখে।’
কেন গজ কাপড়
গজ কাপড় দিয়ে জামা বানানোর সুবিধা অনেক। নিজের শরীর অনুযায়ী মাপ নিতে পারেন। কাপড়, রঙ, কাটিং সব নিজের পছন্দেই পছন্দ করা যায়। দামে তুলনামূলক সাশ্রয়ী। ট্রেন্ডি ডিজাইনেও থাকে ব্যক্তিত্বের ছোঁয়া। তা ছাড়া যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয়, তারা চান ‘নিজস্ব ফ্যাশন’- যেখানে তাদের সাজ থাকবে অন্য রকম।
চাহিদা যেমন, সৃজনশীলতাও তেমন
গজ কাপড় শুধু কাপড় নয়, সেটা একরকমের ক্যানভাসÑ যেখানে একজন নারী নিজের কল্পনা দিয়ে আঁকেন ঈদের পোশাকে। পছন্দের কাপড় বেছে, তার সঙ্গে মিলিয়ে লেইস, বোতাম, ঝালর বা গলা ডিজাইন বাছাই করে গড়ে তোলেন নিজের গল্প।
ঈদ মানেই নিজেকে সাজানো, আর সেই সাজে যদি থাকে নিজের হাতের ছোঁয়া, তবেই তো পূর্ণতা। ডিজাইনার জামা শুধু বাহারি হলেও, গজ কাপড় দিয়ে বানানো পোশাক হয় ব্যক্তিত্বের প্রতিচ্ছবি। তাই ঈদের আগে সুতোয় বোনা প্রতিটি স্বপ্ন যেন হয়ে ওঠে বাস্তব, নতুন কাপড়ের গন্ধে মিশে থাকে এক নতুন আমি। ঈদে গজ কাপড়ের ক্রমবর্ধমান চাহিদা আসলে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিতÑ এখন ক্রেতারা শুধু ফ্যাশন নয়, নিজেদের ভালো লাগা, আরাম ও ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মানানসই পোশাক চাইছেন। গজ কাপড় সেই চাহিদাকে সবচেয়ে ভালোভাবে পূরণ করছে বলেই এর জনপ্রিয়তা এখন ঈদের বাজারে শীর্ষে।