× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সাইকেলে ৫০০০ মাইল

আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল

প্রকাশ : ০৫ মে ২০২৫ ১২:৪৭ পিএম

আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল সাইকেলে করে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্য ঘুরে বেড়াতে পাড়ি দিয়েছেন ৫ হাজার মাইল পথ

আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল সাইকেলে করে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্য ঘুরে বেড়াতে পাড়ি দিয়েছেন ৫ হাজার মাইল পথ

ভ্রমণ ও সাইকেল দুটিই সঙ্গী হয়ে আছে নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে। সেই ধারাবাহিকতায় ভূ-পর্যটক আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল ঘুরে বেড়িয়েছেন ছয় মহাদেশের ৬২ দেশ। সাইকেলে করে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্য ঘুরে বেড়াতে পাড়ি দিয়েছেন ৫ হাজার মাইল পথ। সেই অভিজ্ঞতা ঘুরিয়া পাঠকদের জন্য তুলে ধরেছেন আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল

ভ্রমণ ও সাইকেল দুটিই সঙ্গী হয়ে আছে নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে। ভ্রমণ আর নেশা নয়, ইবাদত হয়ে গেছে। এ ইবাদতনামায় যুক্ত হয়েছে বর্তমানে ছয় মহাদেশের ৬২ দেশ। ভ্রমণের ডাক যিনি শুনেছেন, তার কি বন্ধ খাঁচা ভালো লাগে? ভ্রমণ এক নেশার মতো। সে নেশায় বুঁদ আমি ও মুনতাসীর মামুন। দুজনে মিলে ১১ জুন যাত্রা করি সিয়াটল থেকে এবং ৬৬ দিন পর ১৪ আগস্ট ওয়াশিংটন ডিসিতে যাত্রা শেষ করি। পথমধ্যে পাড়ি দিয়েছি যেসব স্টেট সেগুলো হলো ওয়াশিংটন, আইডাহো, মন্টানা, ওয়াইওমিং, সাউথ ডাকোটা, নেব্রাস্কা, আইওয়া, ইলিনয়, ইন্ডিয়ানা, ওহাইয়ো, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া, ভার্জিনিয়া। সব মিলিয়ে ৫ হাজার মাইলের পথ। প্রথমে পেয়েছি পাহাড়ি রাস্তা, তারপর কিছুটা সমতলভূমি এবং সবশেষে আবার পাহাড়ি পথ। তবে কষ্টকর পাহাড়ি পথ হলেও ভার্জিনিয়া ছিল সবচেয়ে সুন্দর।

আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল ও তার ভ্রমণসঙ্গী মুনতাসীর মামুন

আমাদের ট্যুরের উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা। যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোয় প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়েছে; কিন্তু সেভাবে বাড়ছে না রিসাইক্লিংয়ের প্রবণতা। আমাদের মতো সমুদ্রসমতলের খুব কাছের দেশগুলোর জন্য বিষয়টি হুমকিস্বরূপ। ইমরান ও তার এমআইটির বন্ধুরা মিলে আমাদের সাইকেল সফর শুরুর আগেই একটি বিশেষ স্মার্টফোন অ্যাপ্লিকেশন বানিয়ে দিল। আমরা সাইকেল চালাতাম আর পথে প্লাস্টিকের জিনিস দেখতে পেলেই তার হিসাব রাখতাম মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে। আর সঙ্গে সঙ্গে সে গণনা গুগল ম্যাপের মাধ্যমে ওয়েবসাইটে চলে যেত।

আমাদের পুরো ভ্রমণে আমরা থেকেছি সরকারি পার্ক, ক্যাম্পগ্রাউন্ড এবং শেষের দিকে মোটেলে। ক্যাম্পগ্রাউন্ডে সব ধরনের সুযোগসুবিধা রয়েছে। কেনাকাটার জন্য দোকানও রয়েছে। আমরা অল্প কদিন ছাড়া পুরো ভ্রমণপথে নিজেরাই রান্না করেছি। রান্নার সব সরঞ্জাম বহন করতাম নিজেরাই। বেশি খাবারদাবার সঙ্গে নিয়ে ওজন বাড়াতাম না। কারণ প্রতিটি শহর বা ক্যাম্পগ্রাউন্ডে খাবার কিনতে পাওয়া যেত। আর সব সময় ব্যাগে থাকত কিছু এনার্জি বার, খেজুর ইত্যাদি। আমরা যে সাইকেলে যুক্তরাষ্ট্র ঘুরেছি তার নাম টেনডেম সাইকেল। এটি বাইক ফ্রাইডের তৈরি। এ সাইকেলের দাম শুরু হয় ১ হাজার ২০০ ডলার দিয়ে। এ সাইকেলের সুবিধা হলো, আপনি যেখানেই যান না কেন এটি খুলে একটি স্যুটকেস বা বাক্সের ভেতর নিয়ে যাওয়া যায়।

ক্যাম্পগ্রাউন্ডের মধ্যে ক্যাম্পগ্রাউন্ড অব আমেরিকা (কেওএ) হচ্ছে সবচেয়ে জনপ্রিয়। গোটা যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে তাদের সুবিশাল নেটওয়ার্ক। মিজোলায় আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সাইক্লিংয়ের সংগঠন অ্যাডভেঞ্চার সাইক্লিং অ্যাসোসিয়েশনে যাই। সেখানকার সবার সঙ্গে পরিচিত হই এবং আমাদের ভ্রমণ সম্পর্কে তাদের অবহিত করি। তারা আমাদের ছবি তুলে হল অব ফেমে ঝুলিয়ে রাখল এবং আমাদের জিনিসপত্র, সাইকেলসহ ওজন মাপল। তাদের ভাষ্যমতে এত ওজন নিয়ে কেউ ক্রস ইউএসএ সাইক্লিং করেননি এবং জানালেন, টেনডেম সাইকেল নিয়েও কেউ যুক্তরাষ্ট্র পাড়ি দেননি।

এসিএর মতে আমরাই নাকি প্রথম মুসলমান যারা সাইকেলে ইউএসএ পাড়ি দিচ্ছি। সাইক্লিংয়ের সংগঠন এসিএর অফিস বিশাল বড়। অনেক লোক কাজ করেন সেখানে। এসিএর অফিসে যাওয়ায় এবং ক্রস ইউএসএ সাইক্লিং করার কারণে তারা আমাদের দুজনকে ফ্রি সদস্যপদ দিলেন। আগে থেকেই এসিএর ম্যাপ আমাদের সংগ্রহে ছিল, তাই ম্যাপ আর কিনতে হয়নি। আমরা যে রুট ধরে যুক্তরাষ্ট্র পাড়ি দেব সেটা হচ্ছে সবচেয়ে জনপ্রিয় রুট। তার নাম ট্রান্স-আমেরিকা। ৬৬ দিনের বিশাল ভ্রমণের কিছু টুকরো স্মৃতি তুলে ধরছি পাঠকের জন্য।

ডার্বি থেকে উইসডম ৫৮ মাইলের পথ। ২০ মাইল চালানোর পর হালকা বিশ্রাম নিলাম। ডার্বি শহরটি ৪ হাজার ফুট উচ্চতায়। আমাদের পাহাড় ঠেলে ৭ হাজার ফুট উচ্চতায় যেতে হলো। ১৩ মাইল যেতে লাগল ৫ ঘণ্টা। ভীষণ কষ্ট ও পরিশ্রমের দিন পার করেছি তখন। আমরা সাইকেলসহ দুবার পড়ে গেলাম। এডউইনের ওখানে বিশ্রাম নিই এবং দুজন কানাডিয়ান সাইক্লিস্টের সঙ্গে কথা হলো। একজন ছেলে ও একজন মেয়ে। সম্ভবত প্রেমিক-প্রেমিকা। বিদায় জানিয়ে আবার রওনা হলাম। বিশাল আকাশ, ফসলের জমিতে অনেক গরু এবং কিছুক্ষণ চালানোর পর লক্ষ করলাম, মৌমাছির মতো ঝাঁকে ঝাঁকে মশা। আমরা সাইকেল চালাচ্ছি এবং পেছন পেছন মশারা অনুসরণ করছে। অতিদুষ্টু মশারা কানে কামড় দিচ্ছে। হাতে-হাঁটুতে, ঘাড়ে সর্বত্র বিচরণ করছে। মশার সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে এগিয়ে চললাম। জীবনে মশার এমন একত্র আক্রমণ কখনও দেখিনি। উইসডমে পৌঁছার পর রাস্তার সঙ্গে যে ক্যাম্পগ্রাউন্ড পেলাম তাতে থাকা যাবে না। পানি নেই, রেস্টরুমের দেখা নেই। সর্বোপরি মশার যন্ত্রণা। খুবই ছোট শহর উউসডম।

মাত্র ৫০ হাজার লোকের বসবাস। কে থাকে এত মশার মধ্যে? দুটি বার, একটি দোকান পেলাম। যদিও দোকানটি সন্ধ্যার আগে বন্ধ হয়ে গেছে। বারে গিয়ে ক্যাম্পগ্রাউন্ড ও লজের খোঁজ করলাম। যদিও পাশে হোটেল ছিল; কিন্তু সেটার কথা তারা বলল না। সেখানে যাই এবং ভদ্রমহিলার সঙ্গে কথা বা দরকষাকষি করে ৬৫ ডলারে রফা করি। এ ৬৫ ডলার আমাদের জন্য অনেক টাকা। কারণ ক্যাম্পগ্রাউন্ডে আমরা বেশ সস্তায় থাকতে পারতাম। কিন্তু ওখানে কোনো চয়েস নেই। সন্ধ্যাও হয়ে গেছে এবং মশার উপদ্রবও বেড়ে চলেছে। লজটি খুবই সুন্দর। দুটি রুম। কিচেন, বাথরুম সবই আছে। রান্না হলো, প্রচুর খেলাম এবং টিভি দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়লাম। ট্যুরের মধ্যে সবচেয়ে দামি লজে ছিলাম। সেদিন ঘুম হলো সবচেয়ে কম। ইমরান তার পায়ের ব্যথায় অস্থির। রাত ৩টার দিকে ঘুম থেকে উঠে তার পায়ে ম্যাসাজ করে দিলাম। ৪টা ৪০ মিনিটে ঘুম থেকে উঠে রওনা দিলাম উইসডম থেকে জ্যাকসনের উদ্দেশে। মাত্র ১৮ মাইলের পথ। পুরো ভ্রমণে এটিই ছিল সবচেয়ে কম পথের জার্নি। খুবই সুন্দর পথ।

দুই পাশে পাহাড়, মাঝেমধ্যে গরুর খামার এবং বাছুর-গরু দেখলাম। শরীর ক্লান্ত তাই জ্যাকসনে এসে ক্যাম্পগ্রাউন্ডে উঠলাম। এখানে একটিই ক্যাম্পগ্রাউন্ড রয়েছে। বিশাল বড় হলরুম। অফিস থেকে জানাল, বিকালে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। একটি পরিবার পুরো ক্যাম্পগ্রাউন্ড ভাড়া নিয়েছে। তাদের আবার সুইমিং পুল রয়েছে। অনেকক্ষণ সাঁতার কাটলাম। ক্যাম্প সাইটের বিপরীতে একটি মাত্র গ্রোসারি। দোকানে কর্মরত মহিলা জানালেন, এ শহরে মাত্র ৩৪ জন লোক থাকেন। দোকান থেকে হালকা কিছু খাবার কিনলাম। প্রচুর সাইক্লিস্ট এসেছেন ক্যাম্পগ্রাউন্ডে। একটি পরিবারের একজনের সঙ্গে পরিচয় হলো। তারা বললেন, তাদের পরিবারের ৪০ জন এসেছেন বিভিন্ন স্টেট থেকে এবং তারা আজ সবাই ৩০ মাইল সাইকেল চালিয়েছেন। তাদের সঙ্গে কম বয়সি ছেলেমেয়েও রয়েছে। তারাও সঙ্গ দিয়েছে সাইকেল চালিয়ে। মহিলাটি জানালেন, প্রতি বছর তারা পরিবারের সবাই একত্র হয়ে সাইকেল চালান এবং ক্যাম্পগ্রাউন্ডে অবস্থান করেন। আঃ কী আনন্দ! আরেকটি গ্রুপে পাঁচজন সাইক্লিস্টকে আসতে দেখলাম। তাদের সঙ্গে পরিচিত হলাম। রজার ফ্রাঙ্কের সঙ্গেই আমার বেশি আলাপ হলো। রজার বললেন, প্রতি বছর আইওয়াতে র‌্যাগবেরি অর্থাৎ সাত দিনব্যাপী সাইক্লিং হয়। সারা বিশ্ব ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাইক্লিস্টরা এখানে আসেন এবং সাত দিন একত্রে সাইকেল চালান। শুনেই তো ভালো লাগল এবং ইমরানকে বললাম আইওয়ার এ সাইকেল ইভেন্টের কথা।

পরে ওদের সঙ্গে কথা বলে ঠিক হলো আমরা ওদের সঙ্গে আইওয়া পর্যন্ত যাব। আমাদের প্রাথমিক রুট পরিবর্তন করতে হলো আইওয়া যাওয়ার জন্য। র‌্যাগবেরি হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো, বৃহত্তম ও দীর্ঘতম বাইসাইকেল ট্যুরিং ইভেন্ট। চলতি বছরে (২০১৯ সাল) তারা ৪৭তম বছরে পদার্পণ করবেন। অর্থাৎ এটি চলছে ১৯৭৩ সাল থেকে। মোটামুটি এটি ৪৬৮ মাইল দীর্ঘ একটি পথ, যা সব সময় সমতল নয়। এটি আইওয়ার পশ্চিম বর্ডার মিসৌরি নদীর তীরবর্তী কোনো এক জায়গা থেকে শুরু হয়। তবে তারা প্রতি বছরই রুট পরিবর্তন করে থাকেন। র‌্যাগবেরিতে প্রতিদিন গড়ে ৬৭ মাইল সাইকেল চালানো হয়। ইভেন্টে রেজিস্ট্রেশন করে সাইকেল চালাতে হলে এক সপ্তাহের রাইডের জন্য আপনাকে গুনতে হবে ১৫০ ডলার। অথবা দিন হিসেবে রেজিস্ট্রেশন ২৫ ডলার করে। যখনই সমতলভূমি থেকে ওপরে উঠতে হতো তখনই আমার ভীষণ কষ্ট হতো। মনে হতো শ্বাস নিতে পারছি না। সাইকেল থেকে নেমে হেলমেট খুলে সাইকেলের পেছন ঠেলতে ঠেলতে ওপরে উঠতে হতো।

জ্যাকসন থেকে ডিলনের পথে অনেক সাইক্লিস্টকে দেখলাম। পথে সাইকেল থামিয়ে কথা হলো অস্ট্রেলিয়ান এক সাইক্লিস্টের সঙ্গে। তিনি পুব থেকে যাত্রা করেছেন এবং পশ্চিমে গিয়ে শেষ করবেন। জানতে চাইলাম এ ভ্রমণটা শেষ করার জন্য কোন জিনিসটা সবচেয়ে জরুরি। ভদ্রলোক বললেন, অলওয়েজ বি পজিটিভ। তাতেই হবে। তার কথা পুরোপুরি সত্য ছিল। আজ ট্যুর শেষে সেটা বেশ ভালোভাবে বুঝতে পারছি। আমার গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা ছিল এবং বেশ ক্ষুধা পেত ট্যুরের আগে। তখন ভেবেছিলাম এত কম খেয়ে কীভাবে ভ্রমণ করব। অথচ পজিটিভ মনোবলই সবকিছু দূর করে দিল। খুব কম খেয়েও যথাসময়ে খাবার গ্রহণের ফলে কিন্তু কোনো সমস্যাই হয়নি। পথে আরও কিছু সাইক্লিস্টের সঙ্গে কথা হলো। তারা জানালেন, মন্টানায় ক্যানসারের জন্য তারা অর্থ সংগ্রহ করছেন। পথে মার্কিন মুলুক এফোঁড়-ওফোঁড় করেছেন এমন যত সাইক্লিস্টের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল তাদের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক ছিলেন রজার। তার বয়স ষাটের ওপরে। ডিলনের কেওএতে আমরা সবাই একসঙ্গে ছিলাম।

ক্যাম্পগ্রাউন্ডের মালিক বব এবং তার স্ত্রী। গোটা যুক্তরাষ্ট্রে ৫০৬টি কেওএ রয়েছে। আমরা ছয়জনের জন্য ভাড়া দিলাম ৪০ ডলার। বেশ বড় ক্যাম্পগ্রাউন্ড। বব বেশ মজার এবং নিখাদ ভদ্রলোক। আমার সঙ্গে তার বেশ জমে গেল। ক্যাম্পগ্রাউন্ডে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার পাশাপাশি কানাডিয়ান পতাকাও সগর্বে উড়ছে। এর কারণ জানতে চাইলে বব জানালেন, প্রতি বছর কানাডা থেকে সাড়ে ৩ লাখের বেশি পর্যটক অনেক লম্বা সময়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে বেড়াতে আসেন। কানাডার কুইবেকে শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্য বিপুলসংখ্যক কানাডিয়ান বুড়োবুড়ি যুক্তরাষ্ট্রের গরম প্রদেশগুলো বিশেষ করে ফ্লোরিডায় এসে বসবাস করেন। বব জানালেন, এই যে বিপুলসংখ্যক লোক কানাডা থেকে এখানে আসেন, তারা যাতে মার্কিনিদের বন্ধু মনে করেন এবং নিজেদের পতাকা দেখে ভাবেন যে কানাডাতেই আছেন; এমন চিন্তা থেকেই মার্কিন পতাকার পাশাপাশি কানাডার পতাকাও ঝোলানো হয়েছে। এটি একটি ব্যবসায়িক পলিসি। বব জানালেন, অ্যাডভেঞ্চার সাইক্লিং অ্যাসোসিয়েশন বা কেওএর সদস্যদের তারা ডিসকাউন্ট দিয়ে থাকেন।

ডিলন থেকে মন্টানা ধরে এগোনোর পথে টুইন ব্রিজ পার হওয়ার পর উল্টো দিক থেকে এত বেশি বাতাস আসছিল যে, সাইকেল চালানোই বেশ কষ্টকর ছিল। পথে এক সাইক্লিস্টের সঙ্গে দেখা। তিনি জানালেন, মিডওয়েস্টে অনেক জায়গায় চার্চ, ফায়ার স্টেশনে থাকা যায়। টুইন ব্রিজে ঢোকার পর ক্যালকাটা ডাইনার নামে একটি রেস্টুরেন্ট চোখে পড়ল আমাদের। কিছু দূর সাইকেল চালানোর পর হঠাৎ এক বাড়ি থেকে কুকুর ঘেউ ঘেউ করে তেড়ে এলো। আমরা ভয়ে জোরে পা চালালাম প্যাডেলে। মাইল ছয়েক যাওয়ার পর আবারও সেই ভয়ানক উল্টো বাতাস শুরু হলো। অনেক কষ্টে অলডারের কেওএতে পৌঁছি এবং এ কেওএতে কেটেছে আমাদের ভ্রমণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সময়। অলডারে কেওএর মালিক এডউইন বয়স্ক লোক। প্রথম পরিচয়েই তার সঙ্গে ভাব জমে গেল। তিনি আমাদের গাছের ছায়ার নিচে ক্যাম্প করতে বললেন।

আমি তার অফিসে মোবাইল চার্জ দিলাম এবং কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস কেনাকাটা করলাম। রজারদের গ্রুপের তিনজন এলেন এবং বাকি দুজন মোটেলে উঠেছেন। ক্যাম্পগ্রাউন্ডের ভাড়া ছিল মাথাপিছু ১৪ ডলার। আমরা সেটি কমিয়ে ১২ ডলারে আনলাম। এডউইনের সঙ্গে আড্ডা শুরু হলো। জানালেন ১৯৯১ সালে এ ক্যাম্পগ্রাউন্ডটি কিনে নেন তিনি। ৫০ বছরের পুরোনো ক্যাম্পগ্রাউন্ড এটি। ছোট্ট-সুন্দর পুকুর, কাঠের তৈরি বেশ কিছু রুম এবং দোলনা বানিয়ে রেখেছেন। ইমেইল পেলাম ববের কাছ থেকে। তিনি ডিলনের কেওএ থেকে ইমেইল করেছেন। দুপুরে ইমরান রান্না করে সবাইকে খাওয়াল এবং এডউইন রাতে আমাদের ডিনারের দাওয়াত দিলেন। রাতে ডিনারের সময় অনেক গল্প হলো। এডউইন আমাকে এবং ইমরানকে একদিন তার অতিথি হয়ে থেকে যেতে অনুরোধ করলেন। আমাদের জন্য এডউইনের আমন্ত্রণ অপ্রত্যাশিত ছিল। কারণ মার্কিনিরা সচরাচর এমনটি করেন না। আমরা এডউইনের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করতে পারলাম না। এডউইনকে আমার ভালো লেগেছে।

এডউইন খুব সুন্দর করে আমাকে ডাকতেন ‘মোহা মাই ফ্রেন্ড’ বলে। আমার নামের মোহাম্মদ থেকে ‘মোহা। তার কণ্ঠের ডাক আমি এখনও মিস করি। মন্টানা থেকে চলে যাওয়ার পরও তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতাম। কতদিন বাবাকে দেখি না। এডউইনের মধ্যে বাবার আদর-স্নেহ দেখতে পেলাম। অলডার থেকে সঙ্গী সাইক্লিস্ট রজাররা চলে গেলেন। তারা যাবেন ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্কে। আমরা তাদের সঙ্গে সেখানেই দেখা করব। সে গল্প আরেক দিন, অন্য সময়ের জন্য জমা থাকল। সুতরাং আমার গল্প ফুরাল না, নটে গাছটিও মুরাল না।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা