জহুরুল ইসলাম জহির
প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৫ ১২:৫৪ পিএম
একসময় বরিশালের গৌরনদী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী পাবলিক লাইব্রেরির পাঠক বা সদস্য হওয়া ছিল গর্বের। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের এ লাইব্রেরির পাঠক হওয়া ছিল স্বপ্নের মতো। রাজনীতিকরণের ফলে প্রায় অর্ধশত বছরের গৌরবময় প্রতিষ্ঠান গৌরনদী পাবলিক লাইব্রেরিটি ধ্বংস হয়ে গেছে। উধাও হয়ে গেছে লাইব্রেরির ভারতীয় উপমহাদেশ, জাতীয়, আন্তর্জাতিক ইতিহাসের ধারকবাহক দুর্লভ কয়েক হাজার বইসহ আসবাব, ইতিহাস-ঐতিহ্যের রেকর্ডপত্র ও জমির দলিল। গৌরনদী পাবলিক লাইব্রেরির এ দুরবস্থা মেনে নিতে পারছেন না প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ। লাইব্রেরি ভবনটি সংস্কার, সংরক্ষণ ও পুনরায় লাইব্রেরি চালুর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠাকালীন কয়েকজন সদস্য জানান, স্বাধীনতা-পূর্ব উত্তর বরিশালের সর্ববৃহৎ বিদ্যাপীঠ ঐতিহ্যবাহী গৌরনদী কলেজে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য পড়াশোনা করতে আসতেন বরিশালের গৌরনদী, উজিরপুর, মুলাদী, হিজলা, মেহেন্দীগঞ্জ; মাদারীপুরের কালকিনি, গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়াসহ আশপাশের শিক্ষার্থীরা। ক্লাসের ফাঁকে অবসর সময়ে কলেজসংলগ্ন ধোবাবাড়ীর সামনে বৃক্ষরাজির ছায়ায় শিক্ষার্থীরা বই পড়ে সময় কাটাতেন। এলাকার যুবক, ছাত্র-শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জ্ঞান আহরণের কথা চিন্তা করে স্বাধীনতা-উত্তর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভগ্নীপতি শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত ওই স্থানে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মরণে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি সংসদ ও শহীদ স্মৃতি পাঠাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেন। আবদুর রব সেরনিয়াবাত কৃষি, সেচ ও বন্যানিয়ন্ত্রণ মন্ত্রী থাকাকালে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের পাশে সরকারি গৌরনদী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ও সরকারি গৌরনদী পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যবর্তী স্থানে প্রতিষ্ঠানের নামে ১৪ শতাংশ জমি সাফ কবালা দলিল করে ১৯৭৫ সালের ৭ মে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে উদ্বোধন করেন। পরে খুলনা উন্নয়ন করপোরেশনের উদ্যোগে ১৯৭৯ সালে ৬৫০ বর্গফুটের বিশাল পাঠক রুম, শৌচাগারসহ আরও পাঁচ কক্ষবিশিষ্ট একটি পাকা ভবন নির্মাণ করেন।
প্রতিষ্ঠাকালীন আজীবন সদস্য, সরকারি গৌরনদী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. মোসলেম উদ্দিন শিকদার জানান, পাকা ভবন হওয়ার পর লাইব্রেরিটি আরও জমজমাট হয়ে ওঠে। প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ পাঠক লাইব্রেরিতে এসে বই পড়তেন এবং আরও শতাধিক সদস্য নিবন্ধন করে বাড়িতে পড়তে বই নিয়ে যেতেন। যে কারণে শিক্ষাবিদ, সচিবসহ দেশের ৫ শতাধিক গুণিজন এককালীন অনুদান দিয়ে লাইব্রেরির আজীবন সদস্যপদ গ্রহণ করেছিলেন। লাইব্রেরির সাধারণ সদস্যও ছিলেন ৩ হাজারের মতো। যারা নিয়মিত বই পড়তেন ও বই বিনিময় করতেন। যুক্তরাজ্য, চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ দেশবিদেশের খ্যাতিমান লেখকের বাংলা, ইংরেজি, আরবি, ফারসি ভাষার দুর্লভ বই সংগ্রহ করেছিলেন কর্তৃপক্ষ। তা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের ২২ খণ্ড দলিল, বাংলাদেশের সংবিধান, গল্প-উপন্যাসসহ ২৫ হাজারের বেশি বই এ লাইব্রেরিতে ছিল। প্রতিষ্ঠাতা লাইব্রেরিয়ান, গৌরনদী গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক সিনিয়র সহকারী শিক্ষক প্রাণতোষ কুমার দাস জানান, লাইব্রেরির স্থায়ী কোনো আয় ছিল না। জাতীয় গ্রন্থাগার থেকে প্রতি বছর নগদ ৭ হাজার টাকা ও ৭ হাজার টাকার বই ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে বছরে নগদ অনুদান-বইসহ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ ছিল। ওই নগদ টাকার সঙ্গে সদস্যদের চাঁদায় মেটানো হতো পত্রিকা বিল, দুজন লাইব্রেরিয়ান, নৈশপ্রহরীসহ কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পদাধিকারবলে সভাপতি ও সদস্যদের থেকে সম্পাদকসহ নির্বাচিত কমিটির মাধ্যমে লাইব্রেরিটি পরিচালিত হতো।
রবিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ভবনটির প্রধান ফটকের কলাপসিবল গেটে তালা ঝুলছে। অযত্ন-অবহেলায় ভবনের চারপাশে লতাগুল্ম বাসা বেঁধেছে। বর্ষার পানিতে ছাদে ও ভবনের গায়ে শ্যাওলা জন্মে অনেকটা ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। জানালাগুলো ভেঙে ঝুলে আছে। ভাঙা জানালা দিয়ে দেখা গেছে, ভেতরটা নোংরা, ধুলাবালুতে ভরা। বইয়ের আলমারি ও গ্যালারিগুলো উধাও হয়ে গেছে। নেই পাঠকের বই পড়ার জন্য রাখা বিশাল বিশাল টেবিল ও চেয়ারগুলো। মেঝেতে পড়ে আছে ছেঁড়া বই। লাইব্রেরির জুনিয়র লাইব্রেরিয়ান রফিকুল ইসলাম ও নৈশপ্রহরী গোলাম মাওলা বলেন, ‘লাইব্রেরিটি বন্ধ হওয়ার আগে আমাদের ৮-১০ বছরের বেতন-ভাতা পাওনা। তবে বেতন-ভাতা না পাইলেও পাঠকদের পড়াশোনার জন্য ও ঐতিহ্যবাহী লাইব্রেরিটি বাঁচিয়ে রাখতে আমরা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করে আসছি। ২০১৭ সালে পৌর মেয়র লাইব্রেরির দায়িত্ব নিয়ে আমাদের বাদ দেন। পরে তিনি লাইব্রেরিটি পরিচালনার জন্য আওয়মী লীগ নেতা মো. শামীম মিয়াকে দায়িত্ব দেন।’ শামীম মিয়া বলেন, ‘আমি কয়েক মাস পরিচালনার পরে মেয়রের নির্দেশে এক ঠিকাদারকে চাবি বুঝিয়ে দিই।’
২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ঠিকাদার মো. আফজাল হোসেন গৌরনদী অডিটোরিয়ামের নির্মাণকাজ করতে এসে তার ২০-২৫ জন শ্রমিককে লাইব্রেরিতে থাকতে দেন। প্রায় তিন বছর নির্মাণশ্রমিকরা বসবাসের সময় লাইব্রেরি থেকে একের পর এক বইসহ আসবাব খোয়া যায়। এ প্রসঙ্গে আফজাল হোসেন বলেন, ‘আমার লোকজন থাকাকালে লাইব্রেরির বইপত্র সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল। পরে কে বা কারা সেগুলো বিনষ্ট করেছে তা আমার জানা নেই।’