লাবিবা ইরম
প্রকাশ : ২২ এপ্রিল ২০২৫ ১৩:৪৭ পিএম
কথিত আছে, নার্সিসাস নামে এক অসম্ভব সুন্দর গ্রিক শিকারি তার নিজের প্রতিবিম্ব পানিতে দেখে নিজের প্রেমে পড়েই বাকি জীবন কাটিয়ে দিয়েছিলেন। নার্সিসাসের মতো না হলেও দিনের কোনো না কোনো সময় আমরা আয়নার সামনে দাঁড়াই আর নিজেদের প্রতিবিম্ব দেখি, কখনও মুগ্ধ হই, কখনও হয়তো আনন্দিত, কখনও বা গুনগুন করে গানই গেয়ে ফেলি। অনেক সময়ে নিজেরা নিজেদের কবিতা পড়ে শোনাই বা নিজেদের প্রতিচ্ছবির সঙ্গে কথাও বলি। আয়নার সঙ্গে আমাদের এমনই এক সখ্য। আয়না দেখলেই আমাদের ভালো লাগে। এ ছাড়া আয়নার রিফ্লেকশন পাওয়ারের জন্য ইন্টেরিয়র ডিজাইনার ও আর্কিটেক্টরা বর্তমানে নানাভাবে আয়নাকে বাসার বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন আঙ্গিকে ব্যবহার করে পুরো বাসার চেহারাটাই বদলে ফেলছেন। চলুন আজ তবে একটু ঘুরে আসি আয়নার জাদুময় দুনিয়া থেকে।

ঘর সাজাতে কেমন আয়না
ঘর সাজানোর অনুষঙ্গ হিসেবে নানা ধরনের আয়না ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে আয়নার হাজার রকমফের। টেরাকোটা থেকে শুরু করে কাঠ, বাঁশ, বেত, মেটাল ফ্রেমসহ নানানরকম ও সাইজের আয়না দেখতে পাওয়া যায়। সাধারণত সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি আয়না সঠিক জায়গায় রাখতে পারলে ঘর বড় দেখায়। এ ছাড়া আলোর প্রতিফলন হবে এমন জায়গা বুঝে রাখলে একটি আয়নাই পুরো ঘর আলো ঝলমলে করে তুলতে পারে। তাই আপনার ঘরের সাজসজ্জা ও প্রয়োজন বুঝে সঠিক আয়নার ব্যবহার ঘরের শোভা বাড়ানোর পাশাপাশি নানানরকম উপকারও করবে।
কোথায় কেমন আয়না
সব ঘরের অবস্থান যেমন এক নয়, তেমন যেকোনো জায়গায় যেকোনো আয়নাও মানানসই হবে না। জায়গা ও অবস্থানভেদে একেক জায়গায় একেক রকম আয়নার ব্যবহার করতে হবে।
সিঁড়ি ও করিডোর
সিঁড়ির পাশের দেয়ালে এবং করিডোর আয়না দিয়ে সাজাতে অনেকেই পছন্দ করেন। এসব ক্ষেত্রে ছোটবড় বিভিন্ন সাইজের ও ফ্রেমের আয়না অথবা ছোট ছোট একই রকম আয়না দিয়ে পুরোটা জায়গা ঘিরে দিলে দেখতেও সুন্দর লাগে আর জায়গাটা ছোট মনে হয় না। অনেক সময় আয়নাগুলো নির্দিষ্ট দূরত্বে বসিয়ে মাঝে অন্যান্য শোপিস, পেইন্টিং কিংবা ছোট ছোট ঝুলন্ত গাছ রাখলেও দেখতে দারুণ লাগে।
'এ কিচিরমিচির ক্রিয়েশন' এর আয়না
ড্রইংরুম
সাধারণত অতিথি এলে ড্রইংরুমে বসেন। আর ড্রইংরুমের সাজসজ্জা আমাদের রুচির পরিচয় বহন করে। বর্তমানের বাসাগুলো আগের মতো অনেক বড় হয় না, অনেক সময়ই নানা জিনিস দিয়ে সাজিয়ে আমরা ঘরগুলো আরও ছোট করে ফেলি। এ সমস্যার সমাধান হতে পারে একটি বড় আয়না। বড় একটি আয়না এমন কোথাও যদি বসানো যায় যেখানে আলো রিফ্লেক্ট করবে তবে তাতে ঘর আলোকোজ্জ্বল হওয়ার পাশাপাশি তুলনামূলক বড় দেখাবে। এ ক্ষেত্রে বাকি সব আসবাবের সঙ্গে মিলিয়ে বানিয়ে বা কিনে নিতে পারেন আয়না। এ ছাড়া ড্রইংরুমের ওয়ালে ছোট ছোট নানা ধরনের আয়না দিয়ে ঘর সাজিয়ে ফেলতে পারেন। একটু আভিজাত্য প্রকাশের জন্য মুঘল বা ভিন্টেজ ডিজাইনের ভারী কাঠের ফ্রেমের আয়না, দেশি সাজসজ্জার জন্য বাঁশ, বেঁত বা টেরাকোটার ফ্রেমের আয়না কিংবা নিজস্ব ডিজাইনে হাতেও তৈরি করে নিতে পারেন নানানরকম আয়না। আপনার ড্রইংরুমের সাজসজ্জার আবহ সঠিকভাবে কেমন আয়না ধরে রাখতে পারবে তা বিবেচনা করেই আয়না নির্বাচন করুন।
শোবার ঘর
শোবার ঘরের আয়না মানেই সাধারণত আমরা ড্রেসিং টেবিল বুঝি। বর্তমানে নানা ডিজাইনের ড্রেসিং টেবিল, ভ্যানিটি পাওয়া যায় যা আপনার শোবার ঘরে এনে দিতে পারে অন্যরকম আভিজাত্য। এ ছাড়া শোবার ঘরের দেয়ালে আয়না লাগাতে চাইলে জানালার বিপরীতে অথবা আলোর প্রতিফলন হয় এ রকম জায়গায় সেট করতে পারেন। এতে সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি ঘরে হবে আলোর ছড়াছড়ি।

ডাইনিং স্পেস
সাধারণত ডাইনিং স্পেসে হাত ধোয়ার জন্য বেসিন থাকে আর সঙ্গে থাকে আয়না। আপনি চাইলে এ আয়নাটি বেসিনের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারেন। সাধারণত এসব ক্ষেত্রে ওভাল বা চার কোনা আয়নাই বেশি ভালো লাগে। এ ছাড়া যদি বড় আয়না রাখতে চান তবে আয়না এমনভাবে সেট করুন যে টেবিলে খেতে বসলে সবার মুখের প্রতিচ্ছবি সুন্দরভাবে দেখা যায়। এ ছাড়া চাইলে ছোট ছোট আয়না দিয়ে ডাইনিং স্পেসের ওয়াল সাজিয়ে ফেলতে পারেন।
বাথরুম
বাথরুমে আয়না তো থাকবেই। কিন্তু অনেক সময় আমরা এ আয়না নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ভুল করে ফেলি। সাধারণত বাথরুমে লাগানো হয় লম্বা আয়না, যার ফলে পানি লেগে নষ্ট হয়ে যায়। বাথরুমে চওড়া আয়না লাগালে নিচে থেকে পানি কম লাগে ফলে আয়না দীর্ঘদিন ভালো থাকে। এ ছাড়া বর্তমানে লাইটেড আয়না পাওয়া যায়, যাদের বাথরুমে আলো একটু কম তারা এগুলো লাগিয়ে নিলে বাথরুম অন্ধকার হলেও আয়না দেখতে অসুবিধা হবে না। বাথরুমের আয়নার একটু বেশি যত্নের প্রয়োজন হয়।
ব্যালকনি বা বারান্দা
বর্তমানের বাসাগুলোতে ছোটবড় নানানরকম ব্যালকনি ও বারান্দা থাকে। অনেকেই খুব শখ করে এগুলো সাজিয়ে থাকেন। বিকালবেলায় এক কাপ চা হাতে বারান্দায় বসে প্রকৃতি উপভোগ করা সেরা একটি অনুভূতি। তাই ব্যালকনি বা বারান্দার এক পাশের দেয়ালেও লাগিয়ে নিতে পারেন আয়না। ছোট থেকে মাঝারি ধরনের আয়নাই মানায় বেশি। এ ছাড়া বর্তমানে লিপ্পন আর্ট আয়নাও জনপ্রিয় হচ্ছে, যা আয়নার পাশাপাশি আপনার শিল্পীমনের পরিচয়ও তুলে ধরবে।
এ ছাড়া ঘরের বিভিন্ন স্পেস, যেগুলো একটু আটকা বা ছোট, সেগুলোতে নানাভাবে আয়না ব্যবহার করা হয় এখন। আপনার পছন্দ ও বাজেট অনুযায়ী ঘরের বিভিন্ন স্থানে বসিয়ে নিতে পারবেন মানানসই সব আয়না।
কোথায় পাবেন?
আয়নার গল্প তো হলো তবে এসব কোথায় পাবেন? আয়নার দারুণ সব কালেকশন পেয়ে যাবেন আড়ংয়ে। বাঁশ, বেত, কাঠসহ নানানরকম ডিজাইন ও দামের আয়নার জন্য আড়ং বেশ জনপ্রিয়। এ ছাড়া ঢাকার গুলশান ডিসিসি মার্কেট, নিউমার্কেট, দোয়েল চত্বর, স্টেডিয়াম মার্কেট, চকবাজার ঘুরে নানানরকম ও ডিজাইনের আয়না পেয়ে যাবেন সহজেই। তা ছাড়া বর্তমানে অনলাইনের হোম ডেকোর পেজগুলোতেও পেয়ে যাবেন নান্দনিক সব আয়না। অনলাইন স্টোরে এ কিচিরমিচির ক্রিয়েশনের কর্ণধার ইমরোজা তাম্মিম কাজ করছেন কাঠ ও ফাইবারের তৈরি আয়না নিয়ে। তিনি জানালেন, ‘আমি মূলত সচরাচর ডিজাইন থেকে একটু ভিন্ন আয়নার ফ্রেম তৈরি করি। বিভিন্ন হেয়ার স্টাইলের ডিজাইন আছে আমার কিছু আয়নায়। কালারগুলো অ্যান্টিক টাইপের। আবার ক্যানভাসের মতো খুব কালারফুল ফ্রেমও বানাই। আমার আয়না বানানোর মূল উদ্দেশ্য সচরাচর ডিজাইন থেকে বেরিয়ে আসা। আর নিজেকে আয়নায় দেখলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে। এখন পর্যন্ত প্রায় ১০০+ ডিজাইনের আয়না তৈরি করেছি আমি। এবং আমি আরও বড় পরিসরে কাজ করব এটা নিয়ে ইনশাল্লাহ। আমার আয়নার যারা কাস্টমার আছেন তাদের কাছে এগুলোর চাহিদা খুবই ভালো। সবাই চান নিজের ঘরে একটা সুন্দর আয়না থাকুক। আর এ ধরনের আয়না ঘরে ভিন্ন ধরনের সৌন্দর্য নিয়ে আসে।’যদি কিনে নিতে না চান তাহলে নিজেও কাঠমিস্ত্রি ডেকে ডিজাইন করে নিতে পারবেন পছন্দমতো আয়না। আর হাতে বানানো আয়নার জন্য যেতে হবে ক্রাফট স্টোরগুলোতে।
আয়নার যত্ন-আত্তি
আয়নায় খুব সহজেই ধুলোবালি, ময়লা বা পানির দাগ বসে যায়। তাই আয়নার নিয়মিত যত্নের প্রয়োজন। নরম সুতির পরিষ্কার কাপড় দিয়ে প্রতিদিন আয়না মুছে ফেলা ভালো। প্রতিদিন না পারলেও অন্তত একদিন পরপর অবশ্যই। এ ছাড়া বাথরুমের আয়না অবশ্যই সপ্তাহে অন্তত একবার গ্লাস ক্লিনার দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। অন্যান্য আয়নাও দুই সপ্তাহে একবার বা মাসে অন্তত একবার গ্লাস ক্লিনার দিয়ে ক্লিন করে ফেলা ভালো।