অরুণিতা ঘোষাল
প্রকাশ : ২২ এপ্রিল ২০২৫ ১৩:২৭ পিএম
খাদ্য আমাদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা শুধু শারীরিক নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য একে অন্যের পরিপূরক। যখন আমরা মানসিক চাপ বা উদ্বেগে ভুগি, তার প্রভাব আমাদের খাদ্যাভ্যাসে পড়ে। যেমন রুচি কমে, খাওয়ার সময় অনিয়ম হয়, যা ধীরে ধীরে শারীরিক অসুস্থতায় রূপ নেয়। আবার নিয়মিত, সুষম খাবার মানসিক সুস্থতা আনতেও সাহায্য করে। এ সম্পর্কটি আরও ভালোভাবে বোঝার জন্যই একটি গবেষণার শাখা গড়ে উঠেছে ‘নিউট্রিশনাল সাইকিয়াট্রি’ নামে।
মানবদেহে সেরোটোনিন নামক একটি নিউরোট্রান্সমিটার মেজাজ, ঘুম, ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। আশ্চর্য হলেও সত্য, শরীরের প্রায় ৯৫% সেরোটোনিন তৈরি হয় অন্ত্রে। অন্ত্রের ভেতর থাকা গাট বা আন্ত্রিক ব্যাকটেরিয়া শুধু হজমেই সাহায্য করে না, তারা সরাসরি মস্তিষ্কে সংকেত পাঠিয়েও মুড ও মানসিক অবস্থায় প্রভাব ফেলে। তাই এখন গাটকে মানবদেহের সেকেন্ড ব্রেন বলা হয়। এ ছাড়া ব্লাড সুগার বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্ট অবস্থাও মানসিক অবস্থার ওপর প্রভাব ফেলে।
চিনি ও চিনিযুক্ত খাবার, অতিরিক্ত ক্যাফেইন, প্রসেস্ড ফুড, লবণাক্ত খাবারের সোডিয়াম ও ভাজাপোড়া খাবার অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এগুলো প্রদাহ ও অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বাড়িয়ে সেরোটোনিন উৎপাদন বাধাগ্রস্ত করে, যার ফল মেজাজ খারাপ হওয়া, উদ্বেগ বা বিষণ্নতা। অন্যদিকে ফাইবার ও ভিটামিনযুক্ত খাবার যেমন ফল, শাকসবজি, হোল গ্রেইন, ওমেগা-৩সমৃদ্ধ খাবার যেমন চিয়া সিড, মাছ, বাদাম, ভিটাবিন বি, ট্রিপটোফ্যান, ফারমেন্টেড, প্রোবায়োটিক খাবার যেমন দই, হোল গ্রেইন যেমন ওটস জাতীয় খাবার গাট ব্যাকটেরিয়াকে পুষ্টি দিয়ে মানসিক স্থিতি বজায় রাখতে সাহায্য করে।
প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ওটস, লাল চাল, কুসুমসহ ডিম, কলা, সাইট্রাস ফল, তাজা শাকসবজি, সামুদ্রিক মাছ, তৈলাক্ত মাছ, চিয়া সিড, ডাল, বিচিজাতীয় খাবার যেমন বাদাম, শিম-কুমড়ার বীজ, পালং শাক, দই রাখা উচিত। ট্রিপটোফ্যান একটি অ্যামাইনো অ্যাসিড যা সব ধরনের প্রোটিন জাতীয় খাবারেই কমবেশি উপস্থিত এবং সেরোটোনিনের পাশাপাশি মেলাটোনিন উৎপাদনে সরাসরি ভূমিকা রাখে যা আমাদের ঘুম এবং স্বাভাবিক শারীরিক-মানসিক ছন্দ বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণায় দেখা গেছে, মেডিটারিয়ান ও জাপানি ট্র্যাডিশনাল ডায়েট অনুসরণকারীদের মধ্যে বিষণ্নতার হার ওয়েস্টার্ন ডায়েট অনুসরণকারীদের তুলনায় ২৫-৩৫% কম। কারণ এসব ডায়েটে ওয়েস্টার্ন ডায়েটের থেকে প্রসেস্ড ফুডের পরিমাণ কম, কিন্তু প্রাকৃতিক ও ফাইবারসমৃদ্ধ খাদ্যের পরিমাণ বেশি। নারীদের জন্য পিরিয়ড চলাকালে হরমোন পরিবর্তনের সময় সুষম খাদ্য যেমন কলা, কুসুমসহ ডিম মুড সুইংয়ে সহায়ক হতে পারে। কলার পটাশিয়াম ও ভিটামিন বি৬ এবং ডিমের কোলিন, ট্রিপটোফ্যান ও অন্যান্য নিউট্রিয়েন্ট মস্তিষ্ককে তাৎক্ষণিক শক্তি ও স্থিতি দেয়। শুধু খাবারই নয়, সঠিক সময়মতো খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান, ঘুম এবং কোনো বেলার খাবার না বাদ দেওয়াও আন্ত্রিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সমান জরুরি। কারণ খালি পেটে থাকার কারণে বা ডিহাইড্রেশনের জন্য অনেক সময় খিটখিটে মেজাজ, ক্লান্তি বা অযাচিত রাগ তৈরি হয়।
সবশেষে সুস্থ মন চাইলে আমাদের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় সতর্ক হতে হবে। খাদ্য-পুষ্টি শুধুই শরীরের জ্বালানি নয়, এটি মন ও আবেগেরও নিয়ন্ত্রক। সুস্থ অন্ত্র মানেই সুস্থ মন এটি মেনে নিজের এবং পরিবারের খাবার বেছে নেওয়ার সময় আমাদের সচেতন হতে হবে।
অ্যাসোসিয়েট রেজিস্টার্ড নিউট্রিশনিস্ট
এএফএন, ইউকে