প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে বাবর আলীর অন্নপূর্ণা-১ আরোহণ
গোলাম কিবরিয়া
প্রকাশ : ১৫ এপ্রিল ২০২৫ ১৪:২৮ পিএম
আপডেট : ১৫ এপ্রিল ২০২৫ ১৪:৩৩ পিএম
হিমালয় পর্বতমালায় অবস্থিত অন্নপূর্ণা-১ (৮০৯১ মিটার) পর্বতের চূড়ায় এবার বাংলাদেশের পতাকা ওড়ালেন বাবর আলী।
হিমালয় পর্বতমালায় অবস্থিত অন্নপূর্ণা-১ (৮০৯১ মিটার) পর্বতের চূড়ায় এবার বাংলাদেশের পতাকা ওড়ালেন বাবর আলী। ৭ এপ্রিল সকালে তিনি পর্বতশৃঙ্গে পৌঁছেন। বাবর আলীর অন্নপূর্ণা জয়ের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি তুলে ধরা হচ্ছে আজ ঘুরিয়া পাঠকদের জন্য
হিমালয় পর্বতমালায় অবস্থিত অন্নপূর্ণা-১ (৮০৯১ মিটার) পর্বতের চূড়ায় এবার বাংলাদেশের পতাকা ওড়ালেন বাবর আলী। ৭ এপ্রিল সকালে তিনি পর্বতশৃঙ্গে পৌঁছান। বাবরের সঙ্গে ছিলেন গাইড ফুর্বা অংগেল শেরপা। পর্বতারোহী বাবর আলী পেশায় চিকিৎসক। তিনি চট্টগ্রাম ভিত্তিক পর্বতারোহণ ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমার্সের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক। গত বছর প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে একই অভিযানে বিশ্বের সর্বোচ্চ উচ্চতার মাউন্ট এভারেস্ট এবং চতুর্থ সর্বোচ্চ উচ্চতার লোৎসে পর্বত জয় করেন।

মিশন অন্নপূর্ণা-১
অন্নপূর্ণা-১ বিশ্বের দশম সর্বোচ্চ উচ্চতার পর্বত হলেও পর্বতারোহীদের মৃত্যুর হার বিবেচনায় বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক পর্বত হিসেবে পরিচিত। দুর্গম এই পর্বত জয় করতেই গত ২৪ মার্চ বাংলাদেশ থেকে নেপালে যান বাবর আলী। প্রস্তুতিমূলক কাজ শেষ করে কাঠমান্ডু থেকে পোখারা হয়ে ২৮ মার্চ পৌঁছান অন্নপূর্ণা বেজক্যাম্পে। সেখানে এক দিন বিশ্রাম নেন। এর পর উচ্চতার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে ক্যাম্প-১-এ (৫২০০ মিটার) দুই রাত এবং ক্যাম্প-২-এ (৫৭০০ মিটার) এক রাত কাটিয়ে আবার ২ এপ্রিল নেমে আসেন বেজক্যাম্পে।
বাবর আলীর সংগঠন এবং এই অভিযানের আয়োজক পর্বতারোহণ ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমার্সের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, উচ্চতার সঙ্গে নিজেকে খাপখাওয়ানোর পর পর্বতারোহীরা অনুকূল আবহাওয়ার জন্য বেজক্যাম্পে অপেক্ষা করেন। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বাবর আলী জানতে পারেন, সেই অনুকূল আবহাওয়া থাকবে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত। তাই পরিকল্পনা মোতাবেক ৩ এপ্রিল আবার চূড়ার দিকে উঠতে শুরু করেন তিনি। ওইদিন ক্যাম্প-১-এ থেকে পরদিন উঠে যান ক্যাম্প-২-এ। এরই মধ্যে শুরু হয় তুষারঝড়।

প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও বাবর পৌঁছে যান ক্যাম্প-৩-এ (৬৫০০ মিটার)। সাধারণত ৭ হাজার ৪০০ মিটার উচ্চতায় ক্যাম্প তৈরি করে পর্বতারোহীরা চূড়ায় আরোহণের চূড়ান্ত পদক্ষেপ (সামিট পুশ) নেন। কিন্তু আবহাওয়া বিবেচনায় বাবর আলী ক্যাম্প-৩ থেকেই সেই পদক্ষেপ নেন ৬ এপ্রিল রাতে। অবশেষে সব বাধা আর শঙ্কা কাটিয়ে ৭ এপ্রিল সকালে তিনি পর্বতশৃঙ্গে পৌঁছান। বাবরের সঙ্গে ছিলেন গাইড ফুর্বা অংগেল শেরপা।

মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে অনিশ্চয়তার পথে যাত্রা
প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে অন্নপূর্ণা পর্বতশৃঙ্গ জয় করে নিরাপদে বেজক্যাম্পে ৮ এপ্রিল (৪ হাজার ১৩০ মিটার) নেমে আসেন বাবর আলী। সেখান থেকেই জানান, ‘আমি ঠিকঠাক আছি। আজ বিকালে বেজক্যাম্পে পৌঁছেছি।’ বাবর আলী বলেন, ‘অন্নপূর্ণা-১-এর ক্যাম্প ২ ও ৩-এর পথ অনিশ্চয়তায় ভরা। সেখানে প্রতিমুহূর্তে তুষারধস আর ওপর থেকে পাথর পড়ার ঝুঁকি থাকে। আমার অভিযানের সময়ই দুজন শেরপার মৃত্যুর সংবাদ পেয়েছি।’
বাবর আরও বলেন, ‘ঝুঁকি বিবেচনায় অন্নপূর্ণা-১-কে আমি ১০-এ ১০ দেব। যেখানে বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্টকে দেব ১০-এ দুই, আর লোৎসের ক্ষেত্রে ১০-এ চার। আসলে এটি সত্যিই “মাউন্টেনিয়ারস মাউন্টেইন”, যা সবকিছুকে চ্যালেঞ্জ করে।’ ৭ এপ্রিল পর্বত জয় করে ক্যাম্প-২-এ নামার পরিকল্পনা থাকলেও দলের অন্য পর্বতারোহীদের কারণে ক্যাম্প ৩-এ অবস্থান করেন বাবর আলী। সেখান থেকে ৮ এপ্রিল সকালে নামতে শুরু করেন। ক্যাম্প-২ ও ১ হয়ে নেপালের স্থানীয় সময় বিকালে নেমে আসেন বেজক্যাম্পে।

অবিশ্বাস্য ১৭ ঘণ্টা
১০ এপ্রিল ফেসবুকে বাবর আলী রোমাঞ্চকর অভিযান শেষে ফেরার পর বলেন, এক আশ্চর্যজনক অভিযানের পর, পোখরায় পৌঁছেছি। ১৭ দিন ধরে আমি ইলিউশনের মধ্যে ছিলাম, আমি বলতেই পারি! অন্নপূর্ণা-১ আমার প্রতিটি শক্তি, আমার প্রতিটি ইচ্ছাশক্তির পরীক্ষা নিয়েছে। আমি জানতাম এটা কঠিন হবে। কিন্তু কখনও ভাবিনি অন্নপূর্ণা-১ আমাকে এবং এর ঢালে থাকা সবাইকে এভাবে পরীক্ষা করবে!
ক্যাম্প-২ ও ৩-এর মধ্যে মহান কোলোয়ার সবার নিঃশ্বাস কেড়ে নিয়েছিল। ক্যাম্প-৩-এর ওপরে খাড়া ঢালগুলো একের পর এক দুঃস্বপ্নের মতো ছিল। আর এক ধাক্কায় প্রায় ১৭০০ মিটার আরোহণ করা কোনো মজার ব্যাপার ছিল না। চূড়ায় পৌঁছাতে ১৭ ঘণ্টা সময় লেগেছিল! আর মোট চূড়ায় পৌঁছানোর সময় ছিল ২৬ ঘণ্টা! আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘতম।
ফেরার সময় আমার পায়ে একটি পাথরের আঘাত পায়। আমার চোখের ঠিক সামনেই আমারসহ আরোহী তুষারপাতের কবলে পড়ে। এটি তার আত্মবিশ্বাসকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল। যাই হোক আমাকে আপনাদের প্রার্থনায় রাখার জন্য ধন্যবাদ। মানুষ ইতোমধ্যেই আমাকে জিজ্ঞাসা করতে শুরু করেছে, ‘এরপর কী হবে?’ আমার উত্তর হলো- ‘নারী-পুরুষের জীবনে আরও অন্নপূর্ণা আছে!’
১৩ এপ্রিল পোখারায় অবস্থাকালে বাবর আলীর সঙ্গে আলাপকালে জানান, আমি সুস্থ আছি, ভালো আছি। সবাইকে অনেক ধন্যবাদ আমাকে শুভকামনা জানানোয়। দেশে ফিরবেন কবে- এ প্রশ্নের উত্তরে ইতিহাস গড়া এ পর্বতারোহী বলেন, সব ঠিক থাকলে ১৫ এপ্রিল দেশে ফিরব। সামাজিক মাধ্যমে অন্নপূর্ণা সামিট করার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাবর আলী স্মিত হেসে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, অন্নপূর্ণা সামিটের যে ভিডিওটি ভাইরাল হয়েছে সেখানে তিনি নেই। আদতে এটি তার ভিডিও নয়। আসলে ওই ভিডিওটি পোস্ট করা হয়েছিল এটি বোঝাতে যে, অন্নপূর্ণা অভিযান কতটা কঠিন!