আনিসুর রহমান
প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০২৫ ১২:৪৯ পিএম
আদিবাসী শিল্পী আর্নিশ মান্দা। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ বেতারে গান রেকর্ডের সময় তোলা ছবি
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বাসিন্দা আর্নিশ মান্দা (৫০)। স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে তার সংসার। তার প্রয়াত বাবা অবিনাশ বাজি ছিলেন একজন সংগীতশিল্পী। নিয়মিত বেতার-টেলিভিশনে গান করতেন। তিন ভাই-বোনের মধ্যে আর্নিশ মান্দা দ্বিতীয়। আর্নিশ ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার ধাইরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। ১৯৬৯ সালে উপজেলার সাপমারি গ্রামে জন্ম তার। তিনি গারো ভাষায় ‘ও আচিক মান্দিরাং, আফসানংবো নাসিমাং’ এ জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা। এটি মূলত গারো জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষায় রচিত জাগরণের গান। সময়ের সঙ্গে নিজস্ব কৃষ্টি-কালচার নিয়ে টিকে থাকার জন্য সবাইকে এক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে গানটি লিখেছেন শিল্পী আর্নিশ মান্দা। কিন্তু গান মনে রাখলেও তাকে মনে রাখেনি কেউ। নির্মম বাস্তবতায় প্রতিভাবান এ শিল্পী এখন দিনমজুর। একচালা ছাপরাঘরে জসীমউদ্দীনের ‘আসমানী’র মতো জীবনযাপন করছেন শিল্পী আর্নিশ মান্দা। সমতলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে লেখা গানটি বেশ সমাদৃত। ঐতিহ্যবাহী ‘ওয়ানগালা’ উৎসব থেকে শুরু করে যেকোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে জাগরণের সে গানটি শোনা যায়। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ভারতের আসাম-মেঘালয়ের গারোদের কাছেও বেশ জনপ্রিয়।
আর্নিশ মান্দা বাল্যকালে পাশের হালুয়াঘাট উপজেলার চরবাঙ্গালিয়া গ্রামে আত্মীয়ের বাড়িতে লজিং থেকে পড়াশোনা করতেন। ১৯৯৩ সালে চরবাঙ্গালিয়া মনীন্দ্র রেমা নাইট মেমোরিয়াল হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। দরিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করে বিএসএস সম্পূর্ণ করেন। এরপর জীবিকার প্রয়োজনে পাড়ি জমিয়েছেন গাজীপুরে, কাজ করেছেন বেশ কয়েকটি ওষুধ এবং পোশাক কারখানায়।
বাবা একজন সংগীতশিল্পী হওয়ায় ছোটকাল থেকেই গানের প্রতি অনুরাগ ছিল মান্দার। বাবা অবিনাশ বাজিও তাকে কোলে নিয়ে তবলা-হারমোনিয়ামসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান করতেন। তখন থেকেই গান পছন্দ আর্নিশ মান্দার। কিন্তু আর্থিক দৈন্যদশায় কোনো পেশাদার সংগীতশিল্পীর কাছ থেকে তালিম নিতে পারেননি। তার পরও দমে যাননি। ধীরে ধীরে নিজেকে মেলে ধরতে শুরু করেন আর্নিশ মান্দা। নিজেই গান লিখে নিজেই সুর দিয়ে গাইতে থাকেন। এ পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার গান লিখেছেন তিনি। টাকার অভাবে লেখা গানগুলো বই আকারে প্রকাশ করতে পারেননি। সে ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালে বাংলাদেশ বেতারে লোকগানের নিয়মিত শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন আর্নিশ মান্দা। কিন্তু পাননি কোনো ভাতা। গারো জনগোষ্ঠীর জন্য নির্মিত ‘সাল গিতাল’ অনুষ্ঠানে প্রথম ‘ও আচিক মান্দিরাং, আফসানংবো নাসিমাং’ শিরোনামের গানটি পরিবেশন করেন। আর্নিশ মান্দার কণ্ঠে ও আচিক মান্দিরাং গানটি বেতারে প্রচারের পর ‘ও আচিক মান্দিরাং’ নামে একটি অ্যালবাম প্রকাশের উদ্যোগ নেন প্রয়াত শিল্পী মাইকেল মৃত্যুঞ্জয় রেমা এবং লেখক-কলামিস্ট সঞ্জীব দ্রং। ২০১১ সালে অ্যালবামটি প্রকাশ করে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম। ২০১২ সালের ওয়ানগালা উৎসবে অ্যালবামটি প্রকাশ পায়। এরপর স্বল্পসময়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে গানটি। ছড়িয়ে পড়ে ইউটিউব-ফেসবুকসহ সমাজমাধ্যমে। গত এক যুগে গারো জনগোষ্ঠীর কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে ‘নাচের গান’ হিসেবে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে নাচ বা গান পরিবেশনের সময় গানটির শিল্পী হিসেবে আর্নিশ মান্দার নাম উল্লেখ করা হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে গানটির শিল্পী হিসেবে অন্য শিল্পীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাই গান জনপ্রিয় হলেও শিল্পীর নাম সেভাবে ছড়ায়নি। বরং সময়ের ব্যবধানে হারিয়ে গেছেন লোকচক্ষুর অন্তরালে। ১৯৯৫ সালে ঢাকায় একটি বিদেশি দূতাবাসে কর্মরত স্মৃতি খকসীর সঙ্গে শিল্পী আর্নিশ মান্দার বিয়ে হয়। এরপর স্ত্রী-সন্তান আর গান নিয়ে নব্বইয়ের দশকে শিল্পীর দিনগুলো বেশ ভালোই কেটেছে। ২০১৭ সালে হঠাৎ চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েন আর্নিশ মান্দা। নির্ভরশীল হয়ে পড়েন স্ত্রীর ওপর। ২০১৯ সালে স্ত্রী স্মৃতি খকসীও প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন। পরিবারের সবাইকে নিয়ে ফিরে আসেন ধোবাউড়ার ধাইরপাড়া গ্রামে। এরপর দুর্ভাগ্যের থাবা নিয়ে হাজির হয় মহামারি করোনা। অর্থনৈতিক সংকটে বড় ছেলে এবং মেয়ে পড়াশোনা বন্ধ করে ফের ঢাকা পাড়ি জমান। পরিবারের বাকি সদস্যদের খরচ বহন করতে শিল্পী আর্নিশ মান্দা দিনমজুরি শুরু করেন। জীবন সংসারের মায়ায় বন্ধ হয়ে যায় গান লেখা ও গাওয়া।
বর্তমানে শিল্পী আর্নিশ মান্দা অসুস্থ স্ত্রী ও পুত্র-কন্যাকে নিয়ে পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের কবিতার ‘আসমানী’র মতো দুঃসহ দিন যাপন করছেন। মাথা গোঁজার ঠাঁই ছোট্ট একটি একচালা ঘর। যার বেড়া দেওয়ার সামর্থ্যও নেই শিল্পীর। তবু ভাগ্যে জোটেনি সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর। রহস্য কারণে তিনি সরকারি কোনো সুযোগসুবিধা পাননি। নিয়মিত গান লিখলেও গান করার মতো বাদ্যযন্ত্রও নেই এ শিল্পীর।
গারো জাতিসত্তার স্বনামখ্যাত কবি মতেন্দ্র মানখিন বলেন, ‘আমাদের সমাজে অনেক শিল্পী আছেন যারা নিজেদের চেষ্টায় গান লিখছেন। কিন্তু ইউটিউবে বা অ্যালবামে গীতিকার-সুরকারের নাম উল্লেখ করা হয় না। বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য শিল্পীর অনুমতি নেন না। যে কারণে প্রকৃত গীতিকার-সুরকার ও শিল্পীরা লোকচক্ষুর অন্তরালেই থেকে যান। এটা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। যারা আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখছেন তাদের প্রাপ্য সম্মান দেওয়া উচিত।’
আর্নিশ মান্দার স্ত্রী স্মৃতি খকসী বলেন, ‘মান্দা নিজে গান লিখে নিজেই সুর দিয়ে গান গায়। সবাই তার গান পছন্দ করে, এটা ভালো লাগে। ফেসবুক-ইউটিউবে অনেকে নিজের মতো করে গানটি প্রচার করে কিন্তু তারা শিল্পীর নাম উল্লেখ করে না তখন খুব কষ্ট লাগে। আমি দরিদ্র আমার কেউ খোঁজ নেয় না। আমি এতটাই গরিব যে আমার থাকার একটা ঘর নেই। দুই সন্তান পড়ালেখা করে, কিন্তু তারা কোনো শিক্ষাবৃত্তি পায়নি। ছেলেমেয়ের পরীক্ষার ফি দিতে পারি না। তবু সরকারি এবং ট্রাইবাল থেকে কোনো সুযোগসুবিধা পাই না।’ কষ্টে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘তবু আক্ষেপ নাই, শুধু মান্দার স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন চাই।’
মেয়ে তৃতীয়া খকসি জানান, ‘আমি স্কুল এবং কলেজে কোনো উপবৃত্তি পাইনি। ট্রাইবাল থেকে আমার অন্য বন্ধুরা শিক্ষাবৃত্তি পেলেও আমি পাই না। আমার বাবা গরিব বলে কেউ আমাদের মূল্যায়ন করে না। আমার বাবা শিল্পী এটা আমাদের জন্য গর্বের। তবে লোকজন বাবার গানকে স্বীকৃতি দেয় না, এতে খুব কষ্ট লাগে। অর্থসম্পদ চাই না শুধু বাবার পরিচিতি এবং কাজের স্বীকৃতি চাই।’
শিল্পী আর্নিশ মান্দা বলেন, ‘আমি এবং স্ত্রী যখন চাকরি করতাম তখন কোনো টেনশন ছিল না। নিয়মিত গান এবং কবিতা লিখতাম। স্ত্রীর অসুস্থতা এবং আমার চাকরি হারানোর পর থেকে দুর্ভাগ্য হানা দিয়েছে। হয়েছি পথের ভিখারি। দিনমজুরের কাজ করে পরিবার চালাতে হিমশিম খাচ্ছি। দারিদ্র্যের জাঁতাকলে আমি আজ পিষ্ট। চর্চা করতে পারিনি লেখালেখি। বন্ধ গান গাওয়া। যা আমাকে সব সমই পীড়া দেয়। সবচেয়ে বেশি কষ্ট লাগে যখন দেখি আমার গান অন্য জনের নামে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে আমি ১ হাজার গান লিখেছি। টাকার জন্য বই আকারে প্রকাশ করতে পারিনি। সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা পেলে পুনরায় আগের মতো গান চর্চা করতে চাই।’
ট্রাইবাল চেয়ারম্যান এডুওয়ার্ড নাপাক বলেন, ‘আনির্শ মান্দা আমাদের গারো ভাষায় নিজে গান লিখে নিজে গায়। সে গানের মাধ্যমে আমাদের কৃষ্টি-কালচার ধরে রাখার চেষ্টা করছে। আমি শুনেছি সে অর্থনৈতিকভাবে খারাপ অবস্থায় আছে। আমাদের কোনো ফান্ড নাই। থাকলে সহযোগিতা করতাম।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিশাত শারমিন বলেন, ‘শিল্পীর অর্থনৈতিক দৈন্যদশার বিষয়টি অবগত ছিলাম না, সামনে কোনো সুযোগ এলে আমি ওনার জন্য কিছু করার চেষ্টা করব।’