আরাফাত হোসাইন
প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০২৫ ১৬:২৬ পিএম
পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়া মানুষের কাছে জুমঘর যেন শান্তির নীড়
পাহাড়ের বুকে একটি জুমঘরে বসে প্রকৃতি উপভোগ করতে কার না মন চায়? চারদিকে পাহাড়, মাঝে জুমঘরে শুয়ে-বসে দুদিন। শেষ রাতে দারুণ উজ্জ্বল আকাশগঙ্গা দেখে বিস্ময়ে ডুবে যাওয়ার এমন সুযোগ জীবনে কমই আসবে। লিখেছেন আরাফাত হোসাইন

আলীকদম শহর থেকে বেশ কাছেই আমতলী ঘাট, অটো নিয়ে চলে গেলাম সেই ঘাটে এবং সেখান থেকে ট্রলার নিয়ে আমরা চলে এলাম দুসরি বাজার। মূলত বলতে গেলে এখান থেকেই আমাদের ট্রেকিং শুরু। তৈন খাল ধরে আমাদের ট্রেকিং চলছে, বর্ষাকাল ছিল বিধায় খালে পানি টইটম্বুর বেশ কিছু জায়গায় খাল ক্রসিং করতে আমাদের কোমরপানিতে নামতে হয়েছিল। সঙ্গে রশি থাকায় বেশ নিরাপদে আমরা খাল অতিক্রম করে এগিয়ে যাই। আমাদের প্রথম লোকেশন ছিল থানকোয়াইন ঝরনা, যেটা রাইতুমনিপাড়ার একটু সামনে অবস্থিত। বেশ সুন্দর এই জলধারার পানি আনুমানিক ৩০ ফুট উঁচু থেকে পড়ে এবং নিচে একটা ছোট পুকুরের মতো ছিল। সেখানে আমরা কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ফ্রেশ হয়ে ঝরনার ঠিক পাশ দিয়েই ওপরে উঠতে শুরু করি।

আমাদের এবারের গন্তব্য হাজিরামপাড়া। যেহেতু আমাদের জুমঘর আগে থেকে ঠিক করা নেই, তাই আমরা আশপাশের উপস্থিতি, বেশ কিছু জুমঘরের ভিউ, কাছাকাছি পানির উৎস এবং পাড়া থেকে কতটুক দূরে অবস্থিত এসব বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে একটি চমৎকার ঘর নির্ধারণ করলাম। জুমঘরটি একটু উঁচু টিলার ওপরে অবস্থিত। এর উত্তর দিকের ভিউ ছিল রুংরাং পাহাড় আর উত্তর-পূর্বে দেখা যাচ্ছি ক্রিসতং পাহাড়, তার ঠিক নিচ দিয়ে বয়ে চলা সাইংপ্রা ঝিরি। যেহেতু মূল রাস্তা থেকে আলাদা একটি টিলার ওপরে অবস্থিত এই জুমঘর, তাই বেশ নিরিবিলি পরিবেশে ছিল, পাশাপাশি পানির উৎস খুব কাছেই ছিল। প্রথমেই পাড়া থেকে দেশি মুরগির ব্যবস্থা করা হলো।

ঝিরি থেকে হাঁড়ি-পাতিল পাশাপাশি চাল-ডাল এবং মাংস ধুয়ে রান্নার জন্য প্রস্তুত করা হলো। একটি চুলায় তরকারি রান্নার পাশাপাশি চা বসানো হলো। ঘরে বসে কেউ কেউ ছবি-ভিডিও তুলতে ব্যস্ত হয় পড়ল। তখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে, আকাশে কুয়াশার মতো মেঘ উড়ে যাচ্ছে, ঘন সবুজ রুংরাং পাহাড়ের নর্থ ফেস দেখতে দারুণ লাগছিল। সাধারণত দিনের এই সময় অন্য পাহাড় ট্রিপে ট্রেকিং করতে হলেও বসে বসে সবুজ পাহাড়ের অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করতে খারাপ লাগছিল না। আসলে তখন উপলব্ধি করতে পারলাম যে মাঝেমধ্যে এই গতিশীল জীবনকে একটু বিরতি দিয়ে সময় উপভোগ করা মন্দ কিছু না।

দুপুর গড়িয়ে তখন বিকাল। জুমঘরে বসে আড্ডা চলছে, চুলায় মুরগি চাপানো, মুড়ি-চানাচুর সরিষার তেল দিয়ে মাখানো শেষ, কারও মোবাইলে বেজে চলছে গান, একদম স্বপ্নের মতো সময় যাচ্ছিল। আমরা সবাইকে দুপুরের খাবার শেষ করে পাহাড়ের বুকে শেষ বিকালের ক্যাবিক রূপ দেখে বিমোহিত হলাম। সত্যি আমাদের প্রকৃতি কত সুন্দর, সময়ের অভাবে আমাদের কত কিছুই অদেখা! নিস্তব্ধ পাহাড়ের বুকে মাঝে মাঝে ভেসে আসছিল নাম না জানা পাখির ডাক আর মেঘেদের গর্জন। আর এমন পরিবেশেই আপনি নিজের সঙ্গে একান্ত সময় পাবেন, আত্ম উপলব্ধি করতে পারবেন।
-67f3a81865924.jpg)
দিন গড়িয়ে রাত এলে পাহাড়ের এক অন্যরকম সৌন্দর্য দেখতে পেলাম। সেদিন আকাশে চাঁদ ছিল না, আকাশে হাজারো তারার হাট, নিচে বহমান তৈন খাল তখন তীব্র শব্দ করে বয়ে চলছে। কারণ দিনব্যাপী বৃষ্টি হয়ে খালের পানি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ছোট আকারে হয়ে গেল গানের আসর, বলতে গেলে প্রিয় শিল্পীর গান মোবাইলে ছেড়ে তার সঙ্গে সুর মেলানো। রাতের খাবারের জন্য তরকারি দুপুরেই তৈরি করা ছিল, অতিরিক্ত বলতে গেলে ভাত এবং ডালের রান্না করা হলো। এ ছাড়া আমাদের শুকনো খাবার যেমন চিড়ে ভাজা ও বিস্কুট আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে খাচ্ছিলাম। নেটওয়ার্কবিহীন এক দারুণ জীবনে মগ্ন সবাই। রাতে ঘুমাতে আমাদের বেশ দেরি হলো, তার কারণ ছিল ছবি তোলা এবং অসমাপ্ত আড্ডা।
পরদিন ভোরে আবারও ট্রেকিং শুরু, লক্ষ্য দুসরি বাজার। ফিরে আসার সময় বরাবরই মন খারাপ থাকে। বারবার পেছনে ফিরে তাকানো কিংবা বসে বসে সবুজ পাহাড়ের দিকে এক নজরে চেয়ে থাকা। দেখতে দেখতে পাঁচ ঘণ্টা ট্রেক শেষ করে আমরা চলি দুসরি বাজার। সেখানে আগে থেকেই বোট আমাদের অপেক্ষা করছিল। এক ঘণ্টার মধ্যেই আমরা বোট নিয়ে চলে এলাম আমতলী ঘাট। সেখান থেকে বাসস্ট্যান্ড, পরে ঢাকার পথ ধরলাম। এই সময় জুমঘর বিলাস করতে বিস্তারিত জানতে কল করুন ০১৭৮৮৪৯৯২৮৩ বা যোগাযোগ করতে পারেন বেঙ্গল ট্রেকার্সের অফিসে।
-67f3a834e6d93.jpg)
সঙ্গে যা নেবেন
ছবি : লেখক