আমির খসরু সেলিম
প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০২৫ ১৩:৫০ পিএম
ছবিটি এঁকেছে মৃন্ময়ী রূপকথা। রূপকথা যখন প্রথম শ্রেণিতে পড়ত তখনই এ ছবি এঁকেছিল। ছোট্ট রূপকথা এবার ঢাকার ধানমন্ডির নালন্দা স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষা দেবে
রূপাই তখন একটু-আধটু বুঝতে শিখেছে। দেখে, ‘বাবা’ থাকে ফোনের ভেতরে, ভিডিওকলে। আরেকটু বড় হয়ে সে জেনেছে, বাবা গিয়েছেন জাপান নামের একটা দেশে।
ওখানে গিয়ে কাজ করছেন আর অপেক্ষা করছেন, কবে রূপাই বড় হবে!
মা বলেছেন, যেদিন রূপাই বড় হবে, সবগুলো অক্ষর পড়তে পারবে, সেদিনই বাবা ফিরে আসবেন। ওকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেবেন।
তারপর ওর বয়স যখন চার, বাবা ফিরে এলেন। রূপাইয়ের খুশি আর ধরে না। এখন সে স্কুলে যেতে পারবে। পাশের বাসার টুনু আপু যখন স্কুলের ইউনিফর্ম পরে, বেণি দুলিয়ে স্কুলে যায়, কী সুন্দর লাগে দেখতে।
ওরও খুব শখ, ওরকম সুন্দর পোশাক পরে স্কুলে যাবে। নতুন বই হাতে পাবে, নতুন বন্ধুদের সঙ্গে খেলবে।
একটা সুন্দর সকালে রূপাই গিয়ে হাজির হয় বাবার সামনে। বলে, বাবা, আমাকে স্কুলে নিয়ে চলো।
বাবা একটু হেসে বলেন, স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগে শিশুদের বর্ণপরিচয় থাকা দরকার...।
বাবার কথা শেষ না হতেই রূপাই বলে ওঠে, অ আ ই ঈ..., বলতে বলতে স্বরবর্ণ শেষ।
তারপর, ক খ গ ঘ ঙ চ..., বলতে বলতে ব্যঞ্জনবর্ণ বলা শেষ।
তারপর, আলিফ বা তা ছা..., বলতে বলতে আরবি বর্ণমালাও শুনিয়ে দেয় সে। এ বি সি ডি ই এফ..., বলতে বলতে ইংরেজি বর্ণমালাও খুব চেনা গানের মতোই সুরেলা গলায় বলে ফেলে রূপাই।
এরপর একটু চুপ করে সে। বড় বড় নিঃশ্বাস নিতে থাকে। ওর কাণ্ড দেখে বাবা অবাক! কোনোমতে বলেন, বেশ বেশ, দুয়েকটা ছড়া মুখস্থ থাকলেই এখন হয়ে যাবে।
এইবার রূপাই লঅঅমবা করে একবার শ্বাস টানে। তারপর বলতে শুরু করেÑ
‘বাবুদের তাল পুকুরে
হাবুদের ডাল কুকুরে
সে কী বাস করলে তাড়া
বলি থাম একটু দাঁড়া।...
ব্যস, এক নিঃশ্বাসে কাজী নজরুল ইসলামের লিচু চোর কবিতাটা বলে ফেলে সে।
বাবাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই সে এবার শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরÑ
‘আজি হতে শতবর্ষ পরে
কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি
কৌতূহল ভরে।...
বাবা এবার ছোটদের মতো লাফিয়ে ওঠেন। বলেন, আশ্চর্য ব্যাপার। আমি সারপ্রাইজড। তুমি এইটুকুন বয়সে এত কিছু জেনে ফেলেছ, এটা খুব ভালো ব্যাপার। কিন্তু এই কবিতা কি তুমি বুঝেছ?
না বাবা, রূপাই স্বীকার করে, পুরোপুরি বুঝিনি। কিন্তু এটা বুঝেছি, একজন কবির কবিতা একশ বছর পরও নতুনই থাকে।
বাবা মুগ্ধচোখে রূপাইয়ের দিকে তাকান। ভাবেন, এ রকম শিশুদের জন্য সারা জীবন উৎসর্গ করে দিতে ইচ্ছে করে।
এদিকে রূপাই বলে চলছেÑ চলো, এখনই স্কুলে যাই।
বাবা বলে, ঠিক আছে আমি গাড়ি বের করছি।
না বাবা, গাড়ি নয়। গাড়ি পরিবেশদূষণ করে। তুমি সাইকেল নিয়ে এসো। তুমি চালাবে, আমি পেছনে বসব। তা ছাড়া আমাদের সঙ্গে ভোলা আর ইতু-তিতু-মিতুও যাবে।
রূপাইয়ের আবদার শুনে বাবা আবার অবাক। বলেন, টিয়াপাখি আর কুকুর কেন স্কুলে নিতে হবে? ওরাও কি লেখাপড়া শিখবে!!
শিখবে কি বাবা, ওরা এরই মধ্যে খানিকটা শিখে ফেলেছে। এই শোনোÑ
রূপাইয়ের পোষা তিন-তিনটা টিয়েপাখি তখন এক থেকে ১০ পর্যন্ত গড়গড় করে শুনিয়ে দিল। তারপর রূপাই বলল, এক।
ভোলা বলল, ভৌ।
দুই.
ভৌ ভৌ।
তিন.
ভৌ ভৌ ভৌ।
চার.
ভৌ ভৌ ভৌ ভৌ। এভাবে ভোলাও এক থেকে দশ পর্যন্ত শুনিয়ে দিল।
এরপর বাবা আর একটা কথাও বলেননি। সোজা গিয়ে একটা সাইকেল কিনে এনেছে। মা একজোড়া বেলুন ফুলিয়ে দিয়েছে। ওগুলো হাতে নিয়ে সাইকেলের পেছনে চড়ে বসে রূপাই। বাবা হাসিমুখে সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দেন। ওরা রওনা দেয় স্কুলের দিকে। পিছু নেয় ভোলা। মাথার ওপর উড়তে থাকে ইতু-তিতু-মিতু।
তোমরা লেখার সঙ্গে যে ছবিটা দেখছো, ওটা রূপাইয়ের প্রথম দিন স্কুলে যাওয়ার একটা ড্রইং। সুন্দর না!