শরীফ উদ্দিন সবুজ
প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০২৫ ১৩:৩৪ পিএম
আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৫ ১৩:৪১ পিএম
অলংকরণ : জয়ন্ত সরকার
একবার সারা পৃথিবীতে খরা দেখা দিল। খরা বলতে বৃষ্টির অভাব। টানা কয়েক মাস বৃষ্টি হচ্ছিল না। সবাই স্রষ্টার কাছে খরা থেকে মুক্তি পেতে প্রার্থনা করতে লাগল। স্রষ্টা তাদের প্রার্থনা মনজুর করলেন।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সাধকরা স্বপ্নে দেখলেন স্রষ্টা তাদের শাম দেশে যেতে বলছেন। সঙ্গে নিতে হবে একটি করে বস্তা। সে বস্তায় থাকবে ওই দেশের সব মিথ্যা কথা। সাধকরা সকালে ঘুম থেকে উঠে যার যার দেশের মিথ্যা কথা বস্তায় ভরতে লাগলেন। বস্তাগুলো অনেক ভারী হয়ে উঠল। কাঁধে করে নেওয়া সম্ভব না। তারা সে বস্তা তুললেন গাড়িতে। ঘোড়া বা গরু বা উট টেনে নিয়ে চলল সেসব গাড়ি। একদিন তারা পৌঁছালেন শাম দেশে।
শাম দেশে পৌঁছে সাধকরা নিজেদের মধ্যে পরিচিত হলেন। পরিচিত হয়ে নিজেদের মধ্যে জ্ঞানবিনিময় করলেন। কিন্তু পৃথিবীর খরার সমাধান তাদের মাথায় এলো না। একদিন রাতে তারা সবাই একই স্বপ্ন দেখলেন। তারা স্বপ্নে দেখলেন স্রষ্টা তাদের বলছেন সাহারা মরুভূমিতে যেতে। তারা সাহারা মরুভূমিতে রওনা হলেন।
চলতে চলতে সাহারা মরুভূমিতে পৌঁছে তারা মরুর ঝড়ের কবলে পড়লেন। ঝড় থামলে দেখতে পেলেন একজন সাধক পুরুষ ধ্যানে মগ্ন। তার মাথা ছাড়া শরীরের বাকি অংশ দেখা যাচ্ছে না। বাকি অংশ বালুতে ঢেকে রয়েছে। সে অবস্থায় সাধক পুরুষ তাদের সবাইকে ইশারায় ডাকলেন। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অন্য সাধকরা গিয়ে তার শরীর থেকে বালু সরিয়ে দিলেন।
তখন সেই সাধক পুরুষ বললেন, ‘আমি জানি তোমরা কেন এখানে এসেছ। তোমরা পৃথিবীর অনাবৃষ্টির সমাধান চাও। স্রষ্টা আমাকে অনাবৃষ্টির সমাধান শিখিয়ে দিয়েছেন। আর তোমাদের জানাতে বলেছেন। তাই আমি খরার শুরু থেকে এখানে অপেক্ষা করছি। স্রষ্টা বলেছিলেন আমাকে এখানে অপেক্ষা করতে। ঝড়বৃষ্টি যা-ই হোক না কেন এখান থেকে চলে না যেতে। কারণ এখানে তোমরা আসবে।
বিভিন্ন দেশ থেকে আসা সাধকরা তার কথা শুনে বিস্মিত হলেন।
মরুভূমির সাধক তাদের বললেন একটি করে মিথ্যা কথার বস্তা তার কাছে জমা দিতে। বিনিময়ে একটি করে জয়তুন ফল তার কাছ থেকে নিতে।
বিভিন্ন দেশ থেকে আসা সাধকরা তা-ই করতে লাগলেন। কিন্তু সবাই নিজ নিজ মিথ্যা কথার বস্তা জমা দেওয়ার আগেই আবারও মরুঝড় শুরু হয়ে গেল। মরুর সাধক বালুতে ডুবে যেতে লাগলেন। বালুতে ঢেকে যেতে যেতে তিনি বললেন, ‘তোমরা যে কজন পারো মিথ্যা কথার বস্তা জমা দিয়ে জয়তুন ফল নাও। যারা পারবে না তারা এমনি ফিরে যাও। সমস্যা নেই। পৃথিবীতে স্রষ্টার আদেশে কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টি শুরু হবে। স্রষ্টা তোমাদের ওপরে সন্তুষ্ট। কারণ তোমরা তার আদেশ পালন করেছো।’
মরুঝড়ে সবকিছু তছনছ হয়ে গেল। একসময় ঝড় থামল। কিন্তু সেই মরুর সাধককে আর খুঁজে পাওয়া গেল না।
সাধকরা নিজ নিজ দেশে ফেরা শুরু করলেন। ফিরে যেতে যেতে তারা দেখলেন পৃথিবীতে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। চারদিক সবুজ হয়ে উঠছে। মাঠজুড়ে ফসলের ঢেউ ছেয়ে যাচ্ছে। পাখিরা আনন্দে বনভূমিতে নাচছে।
সাধকরা যার যার দেশে ফিরে গেলেন। যেসব সাধক মিথ্যা কথার বস্তা মরুভূমির সাধকের কাছে জমা দিতে পেরেছিলেন তাদের দেশে লোকে মিথ্যা কথা ভুলে গেল। কোনো মিথ্যা বলা দেশ থেকে মানুষ এসে তাদের মধ্যে থাকলে তারা কিছুটা মিথ্যা কথা বলে। আবার মিথ্যা বলা দেশের মানুষ চলে গেলে তারা মিথ্যা কথা ভুলে যায়। আর যেসব সাধক মিথ্যা কথার বস্তা জমা দিয়ে আসতে পারেননি তাদের দেশে মানুষ আগের মতোই মিথ্যা বলতে লাগল।
সেই থেকে এভাবেই চলছে পৃথিবী।