ফরিদুর রেজা সাগর
প্রকাশ : ২৭ মার্চ ২০২৫ ১২:৩৮ পিএম
অলংকরণ : রজত
ছেলেবেলা লুকিয়ে থাকে ছেলেবেলাতেই। বড়বেলাতেও সবার জীবনেই ছেলেবেলা থাকে। ছেলেবেলার আনন্দের কোনো তুলনা নেই। বিশেষ করে ঈদের আনন্দ তো অন্যরকম। আমি এখনও এই বয়সে অনেক ব্যস্ততার মধ্যেও ছেলেবেলার সেই আনন্দ খুঁজে পাই। ছোটদের জন্য লিখি, টেলিভিশনে ছোটদের অনুষ্ঠান বানাই বলেই হয়তো মাঝে মাঝে শিশু হয়ে যাই। যখন একা থাকি তখন ভাবি, আঃ! ছেলেবেলা যদি চিরদিন থাকত তাহলে কত মজাই না হতো। আমাদের ছেলেবেলায় ঈদ শুরু হতো অনেক আগেই মানে রোজার পহেলাতেই। কারণ তখন রোজার আগেই স্কুল ছুটি হয়ে যেত। টানা এক মাসের ছুটি। লেখাপড়ার চাপ নেই তাই ঈদের আনন্দ শুরু হতো ঈদের অনেক আগেই।
আমরা চার ভাইবোন। ঈদের অনেক আগে থেকেই খোঁজ করতাম কোন জামাটা নতুন এলো। কোন জুতাটা কেনা যেতে পারে। ঘুরে ঘুরে দেখে আসতাম নতুন মডেল এসেছে কি না। নিউমার্কেট তখন অভিজাত মার্কেট। মার্কেটে সেই নতুন চায়নিজ জুতা এলো। এটাকে ম্যাজিক জুতাও বলা যায়। দুই ফিতাওয়ালা স্যান্ডেল এটা। এ স্যান্ডেল পরার কিছুক্ষণ পর দেখা যেত ফিতা অদৃশ্য হয়ে গেছে। ব্যাপারটা দারুণ তাই না!
আমাদের ছেলেবেলায় তখন এ স্যান্ডেল খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। মধ্যবিত্ত পরিবারে আমরা চার ভাইবোন। আমি, কেকা মানে এখনকার বিখ্যাত রন্ধনবিদ কেকা ফেরদৌসী, প্রবাল আর কাকলি। চারজনেরই ভিন্ন ভিন্ন পছন্দ থাকত। ইচ্ছে হতো আমি এ জামাটা নেব। কেকার অন্যটা পছন্দ হতো। কিন্তু আব্বা-আম্মার পক্ষে হয়তো সবার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হতো না। তখন চার ভাইবোনকে ডেকে বলতেন, তোমরা কে কী নিতে চাও এ ঈদে?
আমরা আমাদের চাহিদার কথা বলতাম বা জানাতাম। আব্বা-আম্মা তখন আমাদের বলতেন, এবার ঈদে সবাই একটা করে না-ও, পরের ঈদে বেশি করে নিও। মনটা প্রথমে একটু খারাপ হতো কিন্তু পরক্ষণেই তা আর মনে থাকত না। ঈদ আমেজে মন টইটম্বুর হয়ে উঠত। আমাদের বাসার কাছাকাছি একটা বড় মাঠ ছিল, সেখানে হতো ঈদের জামাত। আমরা দলবেঁধে ঈদের জামাতে অংশ নিতাম।
নামাজ শেষে কোলাকুলি ছিল আরেক আনন্দ। কোলাকুলি শেষে ঈদের সালামির জন্য ছুটে যেতাম চাচা-ফুপিদের বাসায়। পায়ে হাত দিয়ে সালাম করার রেওয়াজ ছিল তখন। সালাম করার পর ছোট ছোট নোটের সালামি পেতাম। এক বা দুই টাকার সেই সালামি তখন অনেক টাকা মনে হতো। সালামির টাকা জোগাড় হলে বিকালবেলা সবাই মিলে ঘোরাঘুরি করতাম। সালামিতে টাকা পেতাম তাই দিয়েই খাবার খেতাম, রঙিন রঙিন বেলুন আর হাওয়াই মিঠাই কিনতাম। ঈদের ছয়-সাত দিন পর স্কুল খুলত। ঈদের সেই নতুন জামাকাপড় পরেই স্কুলে যেতাম। কে কেমন জামা পরেছি এই উচ্ছ্বাস ভাগাভাগি করতাম বন্ধুরা মিলে। ছেলেবেলার সেই আনন্দ এখনও উপভোগ করি। ঈদ এলে শিশু হয়ে যাই। মায়রা-মায়রন আমার আদরের নাতিনাতনি। তাদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করি আর মনে মনে বলি, আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে। আর ভাবি, ছোটবেলার ঈদের আনন্দের রেশ লুকিয়ে থাকে বড়বেলার মনের কোনো এক কোণে; এবং তা একেবারেই নিভৃতে...