ইসরাত জাহান পাপিয়া
প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০২৫ ১৪:১৯ পিএম
আঁকা : ইমরুল কায়েস রাফসান, নবম শ্রেণি, এসওএস হারম্যান মেইনার কলেজ, মিরপুর, ঢাকা
এনায়েতপুর বেশ বড় গ্রাম। এ গ্রামের পশ্চিম দিকটাই ঘন জঙ্গল। রহমত মিয়ার ছেলে আজিজের বয়স পঁচিশের কাছাকাছি। মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। আজিজ ও অন্য মুক্তিযোদ্ধারা সেই পশ্চিমের জঙ্গলটাতেই ঘাঁটি গেড়েছেন। বেশ ভালোই চলছে তাদের প্রতিটি অপারেশন। এ গ্রাম থেকে বেশ কয়েকজন মিলিটারি বিদায় করেছেন তারা। তবে গ্রামের স্কুলে ক্যাম্প করে আছে একটি মিলিটারি দল। এ দলে বাবর শাহ নামে একজন মেজর আছেন। এ লোকের কুখ্যাতি গ্রামের সবার জানা।
আজ ১০ দিন হয়ে গেল আজিজের কোনো খোঁজ নেই। আজিজ প্রায়ই লুকিয়ে এসে রহমত মিয়ার সঙ্গে দেখা করে যেত বা খবর পাঠাত। কিন্তু গত ১০ দিনে তার কোনো খবর পাওয়া যায়নি। রহমত মিয়ার দুশ্চিন্তা হচ্ছে। জায়নামাজে বসে আছেন। আল্লাহর দরবারে হাত তুলে বলছেন, ‘ইয়া মাবুদ। আজিজরে হেফাজতে রাইখো। ওই ছাড়া দুনিয়াডাই আমার কেউ নাই।’
তিনি মোনাজাত করছিলেন এমন সময় একটা ছেলে তার ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। ছেলেটার পরনে লুঙ্গি আর রক্তে মাখা একটি শার্ট। মাথায় লাল গামছা বাঁধা। কাঁধে একটি রাইফেল। দেখেই বোঝা যায় আজিজের মতোই একজন মুক্তিযোদ্ধা। সে হাঁপাচ্ছে। তার শরীর ঘামছে। বেশ জোরে দৌড়িয়ে এসেছে বোঝা যায়। তাকে দেখে রহমত মিয়া মোনাজাত শেষ করে তার কাছে গেলেন। তিনি তাকে কান্না জড়ানো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বাপ, তুমি আমার আজিজের কোনো খোঁজ জানো?’
মুক্তিযোদ্ধা রহমত মিয়ার চোখের দিকে তাকানোর সাহস পেলেন না। তিনি মাথা নিচু করে বললেন, ‘চাচা, আজিজরে ওই জানোয়ার বাবর শাহ মাইরা ফেলছে।’
কথাটি শুনে রহমত মিয়ার বুক কেঁপে উঠল। তিনি মুক্তিযোদ্ধার হাত ধরে বললেন, ‘কী কও তুমি। আমার বাপজান কই! আমি আজিজরে দেখবার চাই। আমি তোমার কথা বিশ্বাস করি না। আমার আজিজের ওপর আমার দোয়া আছে। সে মরবার পারে না।’
এ কথা বলেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়লেন। মুক্তিযোদ্ধা তাকে বললেন, ‘চাচা, নিজেরে সামলান। আজিজের লাশ সকালে নদীতে ভাইসা ছিল। আমরা সেই লাশ দাফনের ব্যবস্থা করছি। আপনি চলেন আমার সঙ্গে।’
ওই মুক্তিযোদ্ধা রহমত মিয়াকে নিয়ে গেলেন তাদের ঘাঁটিতে। রহমত মিয়ার মুখে কোনো কথা নেই। আজিজের লাশের সামনে যেতেই তার শরীর কেঁপে উঠল। কী নির্মমভাবে খুন করা হয়েছে তাকে।
রহমত মিয়া লাশ দেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। তিনি বলতে থাকলেন, ‘জানোয়ারের দল। তোদের বিচার হইব। তোরা আমার আজিজরে আমার থাইকা কাইরা নিছোস। তোদের আল্লাহ মাফ করব না। তোদের শাস্তি হইব। আমার আজিজ..! তোদের এই বাপের অভিশাপ লাগব। তোদের বিচার হইব। হইব। ঠিকই হইব একদিন।’
আশপাশে মুক্তিযোদ্ধারা রহমত মিয়ার দিকে তাকিয়ে আছেন। তাদের চোখেও জল। রহমত মিয়াকে সান্ত্বনা দেওয়ার কোনো ভাষা নেই তাদের।
যে মুক্তিযোদ্ধা রহমত মিয়াকে ডাকতে গিয়েছিলেন তিনি রহমত মিয়ার পাশে বসে তার হাত ধরে বললেন, ‘আজিজ আমার ভাইয়ের মতোন ছিল। আমি আপনারে কথা দিতাছি যে জানোয়ারের দল তার এ অবস্থা করছে তাদের শাস্তি আমরা দেবই। আমি আমার ভাইয়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেব। দেশ মুক্ত করব।’ রহমত মিয়া তার কথা শুনে তাকে জড়িয়ে ধরে আবার হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন।
নবম শ্রেণি, সরকারি প্রমথনাথ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, রাজশাহী